নিজের মতো থাকতে ভয় লাগে? সম্পর্ক বাঁচাতে এরকম ‘মাস্ক’ পরছেন না তো!
শেয়ার করুন
ফলো করুন

থেরাপিস্ট জেফ্রি মেল্টজারের মতে, মাস্কিং হলো অন্য মানুষের সামনে নিজের প্রকৃত অনুভূতি বা আচরণ আড়াল করা। দীর্ঘদিন ধরে এটি করতে করতে একজন মানুষ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন, যেখানে আশপাশের মানুষ তাঁকে চেনেন বলেই মনে হলেও বাস্তবে তাঁর ভেতরের মানুষটির সঙ্গে তাঁদের খুব একটা পরিচয় থাকে না।

মাস্কিং কেন করি?

মাস্কিং সবসময় ইচ্ছাকৃত কোনো অভিনয় নয়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি তৈরি হয় নিরাপদ থাকার প্রয়োজন থেকে।

জেফ্রি মেল্টজারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কেউ হয়তো ছোটবেলা থেকেই শিখেছেন যে নিজের কিছু অনুভূতি প্রকাশ করলে অন্যরা অস্বস্তিতে পড়েন। আবার কারও মনে তৈরি হতে পারে, নিজের সত্যিকারের স্বভাব প্রকাশ করলে তাঁকে বিচার করা হবে, প্রত্যাখ্যাত হতে হবে কিংবা সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে।

তাই ধীরে ধীরে মানুষ শিখে যায় কখন হাসতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে, কোন কথা বলা যাবে আর কোন অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে হবে।

সমস্যা হলো, এই কৌশলটি শুরুতে কাজও করে। নিজের অনুভূতি গোপন করলে সমালোচনা এড়ানো যায়, অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য থাকা যায় এবং কিছুটা নিরাপদও মনে হয়। ফলে মস্তিষ্ক এটিকে একটি কার্যকর উপায় হিসেবে মনে রাখতে শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

যে অভ্যাস একসময় রক্ষাকবচ ছিল

মাস্কিংয়ের সবচেয়ে জটিল দিক হলো, এটি সবসময় খারাপ কিছু দিয়ে শুরু হয় না। বরং কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করার জন্যই এটি তৈরি হতে পারে।
ধরা যাক, কোনো মানুষ একবার নিজের মতামত প্রকাশ করে অপমানিত হয়েছেন। এরপর থেকে তিনি হয়তো নিজের কথা বলা কমিয়ে দিলেন। আবার কেউ অনুভূতি প্রকাশ করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি হয়তো আবেগ প্রকাশ করতেই ভয় পেতে শুরু করলেন।

এভাবে একসময় নিজের স্বাভাবিক আচরণটাই অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।
থেরাপিস্টের মতে, যে কপিং স্ট্রাটেজি বারবার ভয় বা অস্বস্তি থেকে কাউকে রক্ষা করে, মস্তিষ্ক সেটি ধরে রাখতে চায়। তাই কাউকে শুধু ‘মাস্কিং বন্ধ করো’ বললে সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ মাস্কের আড়ালে যে ভয়টি রয়েছে, সেটি তখনও থেকে যায়।

মাস্কিংয়ের ক্লান্তি কোথায়?

নিজেকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করে রাখা সহজ নয়। কী বলছি, কীভাবে বলছি, মুখের অভিব্যক্তি কেমন, অন্যরা আমাকে কীভাবে দেখছে, এসব নিয়ে সারাক্ষণ সচেতন থাকতে হলে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়া স্বাভাবিক।

সবচেয়ে বড় বিষয়, দীর্ঘদিন নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে রাখতে একজন মানুষ মনে করতে পারেন, ‘আসলে আমাকে কেউই চেনে না।’

বাইরের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও নিজের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারার কারণে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তখন মানুষ অনেকের মাঝেও নিজেকে একা মনে করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে ধীরে ধীরে ‘মাস্ক’ খুলবেন?

এখানে তাড়াহুড়োর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া একটি অভ্যাস এক দিনে বদলে ফেলা সম্ভব নয়।

জেফ্রি মেল্টজারের মতে, প্রথম প্রয়োজন এমন কিছু অভিজ্ঞতা তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ বুঝতে পারবেন। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা সবসময় বিপজ্জনক নয়।

অর্থাৎ শুরুতেই সবার সামনে নিজের সব কথা খুলে বলার দরকার নেই। বরং এমন একজন মানুষের সঙ্গে ছোট কোনো অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে, যাঁর কাছে নিজেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে হয়।

আজ হয়তো শুধু বলা হলো, ‘এই বিষয়টি আমাকে কষ্ট দিয়েছে।’ আগামী দিন হয়তো বলা গেল, ‘আমি এই পরিস্থিতিতে স্বচ্ছন্দ নই।’
এভাবেই ধীরে ধীরে নিজের সত্যিকারের অনুভূতির সঙ্গে আবার পরিচিত হওয়া সম্ভব।

অস্বস্তিটাও অনুভব করতে হবে

মাস্ক খুলতে গেলে অস্বস্তি হবেই। কেউ কী ভাববে, ভুল বোঝাবে কি না, বিব্রত হতে হবে কি না এসব ভয় ফিরে আসতে পারে।

কিন্তু নিজের অনুভূতি প্রকাশের পর সেই অস্বস্তিকে সহ্য করার অভিজ্ঞতাটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তখন ধীরে ধীরে বোঝা যায়, অন্যের বিচার সবসময় আমাদের সামলাতে না-পারা কোনো বিপর্যয় নয়।

বরং কেউ যখন এমন সম্পর্কের অভিজ্ঞতা পান, যেখানে তাঁর দুর্বলতা বা আবেগ যত্নের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, তখন ধীরে ধীরে মাস্কের প্রয়োজন কমে আসে।

সম্পর্কেই শুরু হতে পারে পরিবর্তন

মাস্কিং থেকে বেরিয়ে আসার পথে নিরাপদ সম্পর্কের ভূমিকা অনেক বড়। এমন মানুষ প্রয়োজন, যাঁদের সামনে সবসময় নিখুঁত, হাসিখুশি বা শক্ত থাকার প্রয়োজন হবে না।
কারও সামনে কাঁদলে যদি নিজেকে ছোট মনে না হয়, ‘না’ বললে যদি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ভয় না থাকে, কিংবা নিজের মতামত জানালে যদি সঙ্গে সঙ্গে বিচার না করা হয়। তাহলে ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শেখেন, নিজের মতো থাকাও নিরাপদ হতে পারে।
আর তখনই হয়তো সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে। নিজেকে লুকিয়ে রাখার জন্য আর অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় না।

আমরা সবাই কখনো না কখনো সামাজিক পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের আচরণ বদলাই। সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু যখন নিজের আসল অনুভূতি, মতামত বা স্বভাবকে প্রায় সবসময় আড়াল করে রাখতে হয়, তখন বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবা দরকার।

সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় নয়, কখনো কখনো নিজের দুর্বলতাকেও জায়গা দেওয়া জরুরি। কারণ মানুষকে খুশি রাখার জন্য তৈরি করা একটি ‘মাস্ক’ হয়তো আপনাকে কিছু সময় নিরাপদ রাখে, কিন্তু সত্যিকারের স্বস্তি আসে তখনই, যখন প্রিয় মানুষদের সামনে নিজেকে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন আর থাকে না।

ছবি: এআই

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ০০
বিজ্ঞাপন