
স্পেনের ঐতিহাসিক ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের উচ্ছ্বাসে যখন মাঠজুড়ে কনফেটি উড়ছিল, তখন জয়ের অন্যতম রূপকার ২৪ বছর বয়সী উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটির জন্ম দেন। মাঠের সেলিব্রেশনে যোগ দেওয়ার আগে তিনি সোজা গ্যালারিতে উঠে যান।


নিজের গলায় থাকা সোনার বিশ্বকাপজয়ী পদক খুলে মায়ের, মারিয়া আর্থুয়েরের হাতে দেন। মুহূর্তটি দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এটি শুধু জয়ের আনন্দ ভাগাভাগি নয়, বরং সেই মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, যিনি একসময় সন্তানের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে জীবন বাজি রেখেছিলেন।
সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে মৃত্যুকে হারানোর গল্প
উইলিয়ামস পরিবারের গল্পের শুরু ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি। চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে মারিয়া ও তাঁর স্বামী ফেলিক্স ঘানা ছেড়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে মানবপাচারকারীরা তাঁদের প্রতারণা করে মাঝপথে ফেলে রেখে যায়। এরপর বাধ্য হয়ে তাঁদের সাহারা মরুভূমি পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রখর রোদের মধ্যে তাঁদের জুতা পর্যন্ত খুলে নেওয়া হয়। খালি পায়ে তাঁরা প্রায় দুই হাজার মাইল মরুভূমির পথ অতিক্রম করেন। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, তখন মারিয়া তাঁর বড় ছেলে ইনিয়াকি উইলিয়ামসকে সাত মাসের গর্ভে ধারণ করেছিলেন। পথে তাঁরা তীব্র ক্ষুধা ও পানিশূন্যতার সঙ্গে লড়েছেন। তাঁদের চোখের সামনেই অনেক সহযাত্রী মারা যান। এমনকি পথেই তাঁদের কবর দিতে হয়েছে।

অবশেষে উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল মেলিয়ায় পৌঁছে তাঁরা কাঁটাতারের সীমান্তবেড়া টপকে প্রবেশ করেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আটক হন। দেশছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে এক ক্যাথলিক মানবাধিকার আইনজীবী ও স্থানীয় এক যাজকের সহায়তায় তাঁরা রাজনৈতিক আশ্রয় পান। পরে পরিবারটি স্পেনের উত্তরাঞ্চলে বসবাস শুরু করে।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠা
নিকো উইলিয়ামসের জন্ম পাম্পলোনায়। তবে বৈধভাবে স্পেনে বসবাসের সুযোগ পেলেও পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা কাটেনি। সংসার চালাতে মারিয়াকে একসঙ্গে তিনটি কঠিন কাজ করতে হয়েছে। অন্যদিকে বেশি আয়ের আশায় ফেলিক্স লন্ডনে চলে যান। সেখানে তিনি বছরের পর বছর রান্নাঘর পরিষ্কারের কাজ করেছেন, স্ট্যামফোর্ড ব্রিজেও কাজ করেছেন। নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে বাকি প্রায় সব অর্থই পরিবারের কাছে পাঠিয়েছেন।

মা-বাবা যখন সারাক্ষণ কাজ নিয়ে ব্যস্ত, তখন বড় ভাই ইনিয়াকি ছোট নিকোর কাছে বাবার ভূমিকাই পালন করেন। তিনি নিকোর জন্য রান্না করতেন, স্কুলে নিয়ে যেতেন এবং আশপাশের অপরাধপ্রবণ পরিবেশ ও কিশোর গ্যাং থেকে দূরে রাখতেন। ফুটবলই হয়ে ওঠে দুই ভাইয়ের মুক্তির পথ। তাঁরা একই জোড়া বুট ভাগাভাগি করে পরতেন, স্থানীয় কংক্রিটের মাঠে অনুশীলন করতেন। একসময় তাঁদের প্রতিভা নজরে পড়ে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিখ্যাত যুব একাডেমির।
মায়ের ত্যাগের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান
স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী অভিযানে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিকো উইলিয়ামস বিশ্ব ফুটবলে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন। কিন্তু পরিবারের অতীতের সংগ্রাম তিনি কখনো ভুলে যাননি।

নিকো একবার বলেছিলেন, মাঠে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি অসাধারণ গতি। কিন্তু তিনি যত দ্রুতই দৌড়াতে পারেন না কেন, মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচতে সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে ছুটে চলা তাঁর মায়ের গতির সঙ্গে কখনোই তুলনা করতে পারবেন না।
বিশ্বজয়ের সেই সোনার পদক যখন মারিয়া আর্থুয়েরের গলায় শোভা পেল, তখন যেন একটি সংগ্রামী জীবনের পূর্ণতা এল। পদকটি শুধু একজন ফুটবলারের অর্জনের প্রতীক নয়; এটি সেই মায়ের প্রাপ্য সম্মান, যিনি সাহারার উত্তপ্ত বালুকাবেলা পেরিয়ে সন্তানের জন্য এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছিলেন, যেখানে সে একদিন বিশ্বমঞ্চ জয় করতে পারে।
সূত্র: গালফ নিউজ, ইয়াহু স্পোর্টস
ছবি: ইন্সটাগ্রাম