
একসময় কোয়ায়েট কুইটিং শব্দটি ছিল কর্পোরেট দুনিয়ার আলোচিত একটি ট্রেন্ড। এর অর্থ চাকরি না ছেড়ে, নীরবে দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়া—শুধু ন্যূনতম কাজটুকু করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা আর অফিসকক্ষেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন তা ঢুকে পড়ছে ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ বিয়ে ও দাম্পত্য সম্পর্কে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক দাম্পত্য জীবনে এক ধরনের নীরব সরে যাওয়া বা মানসিক বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা বাড়ছে, যাকে অনেকে আখ্যা দিচ্ছেন ম্যারিটাল কোয়ায়েট কুইটিং।

কী এই ম্যারিটাল কোয়ায়েট কুইটিং
এটি সরাসরি বিচ্ছেদ নয়, আবার সম্পর্কের পূর্ণ উপস্থিতিও নয়। একই ছাদের নিচে থেকেও আবেগগতভাবে অনুপস্থিত থাকা। এই হলো এর মূল বৈশিষ্ট্য।
কীভাবে চিনবেন কোয়ায়েট কুইটিং
ঝগড়া নেই, কিন্তু কথাবার্তাও নেই
দায়িত্ব পালন আছে, ভালোবাসার প্রকাশ নেই
সামাজিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে যাওয়া হয়, কিন্তু সংযোগ নেই
সংসার চলছে, সম্পর্ক নয়
অনেক দম্পতি আলাদা হওয়ার ঝামেলা, সামাজিক চাপ বা সন্তানের কথা ভেবে সম্পর্কে টিকে থাকেন, কিন্তু সম্পর্কে আর বিনিয়োগ করেন না।

কেন বাড়ছে এই প্রবণতা
১. অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সংঘাত:
সোশ্যাল মিডিয়া, রিলস আর রোমান্টিক কনটেন্ট বিয়ে নিয়ে অবাস্তব ছবি তৈরি করছে। বাস্তব জীবনে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে হতাশা জন্মায়।
২. মানসিক ক্লান্তি ও বার্নআউট:
চাকরি, পরিবার, আর্থিক চাপ এই সব মিলিয়ে অনেকেই মানসিকভাবে এতটাই ক্লান্ত যে সম্পর্কে আলাদা করে এফোর্ট দেওয়ার শক্তি থাকে না।
৩. যোগাযোগের অভাব:
কথা বলার সংস্কৃতি কমে যাচ্ছে। সমস্যা জমে জমে একসময় মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়—আর বলেই বা কী লাভ?
৪. বিচ্ছেদের ভয় ও সামাজিক চাপ:
বিশেষ করে আমাদের সমাজে ডিভোর্স এখনো শেষ অপশন। তাই অনেকে বিচ্ছেদের বদলে নীরব সহাবস্থান বেছে নেন।
নারীরা বেশি কোয়ায়েট কুইট করছেন কেন
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রবণতায় নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। কারণ:
আবেগের দিক থেকে সকল এফোর্ট বেশির ভাগ সময় নারীকেই দিতে হয়
বারবার অবহেলার শিকার হয়ে তারা একসময় অনুভূতি গুটিয়ে নেন
সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে চুপচাপ সরে যান। তবে পুরুষরাও এই ট্রেন্ডের বাইরে নন। অনেক পুরুষ দায়িত্ব পালনকে ভালোবাসার বিকল্প মনে করে ধীরে ধীরে আবেগ থেকে সরে যান।

এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ
নীরবতা অনেক সময় চিৎকার বা ঝগড়ার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।
সম্পর্ক ভেঙে না গেলেও ভেতরে ফাঁপা হয়ে যায়
সন্তানরা আবেগহীন সম্পর্কের মধ্যে বড় হয়
দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে
হঠাৎ করে সম্পর্ক ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়
অনেকে বলেন, কোয়ায়েট কুইটিং হলো বিচ্ছেদের আগের দীর্ঘ নীরব অধ্যায়।
সমাধান কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান এখনো সম্ভব, যদি নীরবতা ভাঙা যায়। এর জন্য যা যা করতে হবে তা হলো:
নিয়মিত খোলামেলা কথা বলা
পেশাদার কাউন্সেলিং নেওয়া
সম্পর্ককে চলমান প্রজেক্ট হিসেবে দেখা
আবেগকে দুর্বলতা না ভেবে প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া
সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা জরুরি নয়, কিন্তু নীরবে মরে যাওয়া কোনো সম্পর্কই সুস্থ নয়।

চাকরির মতো বিয়েতেও কোয়ায়েট কুইটিং আমাদের সময়ের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, আজকের মানুষ সম্পর্ক ছাড়তে ভয় পায়, আবার লড়তেও ক্লান্ত। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু দায়িত্বে টিকে থাকব, নাকি সম্পর্কেও বাঁচব? কারণ শেষ পর্যন্ত, নীরব উপস্থিতি নয় সচেতন অংশগ্রহণই সম্পর্ককে জীবিত রাখে।
সূত্র: মিডিয়াম
ছবি: এ আই