
'সম্পর্কে আছ?' এই প্রশ্নটা শুনে জেন জিদের অনেকেই হয়তো সরাসরি হ্যাঁ বা না বলবেন না। কেউ বলবেন, 'দেখা যাক', কেউ বলবেন, 'এখন এসবের সময় নেই', আবার কেউ হয়তো হেসে এড়িয়ে যাবেন। প্রেম বা সম্পর্কের প্রতি অনাগ্রহ নয়, বরং সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত সচেতনতা; এটাই জেন জির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
ডেটিং অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গোস্টিং, সিচুয়েশনশিপ, রেড ফ্ল্যাগ। সম্পর্কের অভিধানে যুক্ত হয়েছে নতুন অনেক শব্দ। একই সঙ্গে বেড়েছে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা, আত্মসচেতনতা ও মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব। ফলে নতুন সম্পর্কে যাওয়ার আগে জেন জির অনেকেই ভাবছেন, এই সম্পর্ক কি সত্যিই আমার জন্য ভালো হবে?
ভালোবাসা নয়, ভুল মানুষটাকে ভয়
একসময় প্রেমে পড়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল হয়তো পরিবারের আপত্তি কিংবা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কষ্ট। এখন সেই তালিকায় যোগ হয়েছে মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ভয়।

প্রতারণা, গ্যাসলাইটিং, ম্যানিপুলেশন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কিংবা হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া—এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনা হয়। ফলে তরুণেরা সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমস্যাগুলো সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। একবার খারাপ সম্পর্কে জড়িয়ে কষ্ট পাওয়া কেউ নতুন সম্পর্কে যাওয়ার আগে তাই ভাবতেই পারেন, ‘আবার যদি একই ঘটনা ঘটে?’
‘রেড ফ্ল্যাগ’ খুঁজতে খুঁজতেই সম্পর্কের শুরু
জেন জির ডেটিং সংস্কৃতিতে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ এখন পরিচিত শব্দ। প্রথম কয়েকটি কথোপকথনেই অনেকে খেয়াল করেন—সামনের মানুষটি কীভাবে কথা বলছেন, অন্যকে কীভাবে সম্মান করছেন, তাঁর সীমারেখা সম্পর্কে ধারণা কেমন।

এই সচেতনতা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু কখনো কখনো এর বিপরীত প্রভাবও দেখা যায়। একটি ছোট ভুল, একটি অস্বস্তিকর মন্তব্য বা ভিন্ন মতকেও কেউ কেউ সম্ভাব্য বড় সমস্যার সংকেত হিসেবে দেখতে পারেন। ফলে সম্পর্ক গভীর হওয়ার আগেই দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
‘নিজেকে হারাতে চাই না’
জেন জির কাছে সম্পর্ক মানেই নিজের জীবনকে পুরোপুরি সঙ্গীর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া নয়। ক্যারিয়ার, বন্ধু, পরিবার, ব্যক্তিগত সময় কিংবা নিজের পছন্দ—এসবের জন্য আলাদা জায়গা রাখতে চান অনেকেই।

আগের প্রজন্মের সম্পর্কের ধারণায় যেখানে ‘দুজন মানেই এক জীবন’ ধরনের প্রত্যাশা ছিল, সেখানে নতুন প্রজন্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘দুজন মানুষ, কিন্তু দুজনেরই নিজস্ব জীবন’। তাই এমন সম্পর্কই তাদের কাছে আকর্ষণীয়, যেখানে ভালোবাসার পাশাপাশি থাকবে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
ক্যারিয়ার আগে, প্রেম পরে?
প্রেমের সঙ্গে বাস্তব জীবনও জড়িয়ে আছে। পড়াশোনা শেষ করা, ক্যারিয়ার তৈরি, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া—সব মিলিয়ে অনেক তরুণের জীবনেই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বা বিয়ের কথা মাথায় এলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি সামনে চলে আসে। তাই কেউ কেউ মনে করেন, ‘আগে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিই, তারপর সম্পর্কে যাওয়া যাবে।’ এটি প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করা নয়; বরং সম্পর্কের দায়িত্ব নেওয়ার আগে নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘পারফেক্ট কাপল’
ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে চোখ রাখলেই দেখা যায় সুখী দম্পতি, সারপ্রাইজ ডেট, দামি উপহার, ভ্রমণ আর রোমান্টিক মুহূর্তের ছবি। বাস্তব সম্পর্কের ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝি, একঘেয়েমি কিংবা অনিশ্চয়তা সেখানে সাধারণত দেখা যায় না।

ফলে সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হতে পারে অবাস্তব প্রত্যাশা। বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক ওঠানামা তখন অনেকের কাছেই মনে হতে পারে, ‘সম্পর্কটা বুঝি ঠিক নেই। অন্যের সাজানো সুখের সঙ্গে নিজের বাস্তব সম্পর্কের তুলনাও তৈরি করতে পারে অনিশ্চয়তা।
গোস্টিংয়ের ভয়
আজ কাউকে পছন্দ করা যেমন সহজ, সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়াও অনেক সময় তেমন সহজ। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই মেসেজের উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া, ফোন না ধরা বা হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াকে বলা হয় ‘গোস্টিং’। এ ধরনের অভিজ্ঞতা মানুষকে নতুন সম্পর্কের ব্যাপারে আরও সতর্ক করে। কারণ সম্পর্কটি কোথায় যাচ্ছে, আদৌ দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, এসব প্রশ্ন শুরুতেই মাথায় আসে।

সিচুয়েশনশিপ: সম্পর্ক আছে, নাম নেই
জেন জির সম্পর্কের আলোচনায় ‘সিচুয়েশনশিপ’ শব্দটিও বেশ পরিচিত। দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা আছে, নিয়মিত যোগাযোগ আছে, আবেগও আছে। কিন্তু সম্পর্কটির কোনো স্পষ্ট পরিচয় নেই। এই অনিশ্চয়তা অনেককে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে। ফলে এমন অভিজ্ঞতার পর কেউ নতুন সম্পর্কে যাওয়ার আগে আরও স্পষ্টতা চান। ‘আমরা আসলে কী?’এই প্রশ্নটির উত্তর তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মানসিক শান্তির মূল্য বেশি
জেন জির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো মানসিক সুস্থতা নিয়ে তুলনামূলক খোলামেলা আলোচনা। নিজের মানসিক অবস্থা, সীমারেখা, প্রয়োজন ও আবেগ নিয়ে কথা বলা এখন অনেক বেশি স্বাভাবিক।

তাই অনেকেই নিজেকে প্রশ্ন করেন, ‘আমি কি সত্যিই এই মানুষটিকে চাই, নাকি শুধু একাকিত্ব থেকে বের হতে চাই?’ এই প্রশ্নটি সম্পর্কের প্রতি ভয় নয়; বরং নিজের প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা।
তাহলে কি জেন জি প্রেমবিমুখ?
একেবারেই নয়। বরং বলা যায়, তারা প্রেমের ব্যাপারে বেছে নিতে চাইছে বেশি। তারা এমন সম্পর্ক চায় যেখানে থাকবে ভালোবাসা, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে সম্মান; ঘনিষ্ঠতা, কিন্তু ব্যক্তিগত পরিসরও; প্রতিশ্রুতি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নয়; একসঙ্গে থাকা, কিন্তু নিজের পরিচয় হারিয়ে নয়।

তাই নতুন সম্পর্কে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ধীরগতি অনেক সময় ‘কমিটমেন্টে ভয়’ নয়। বরং আগের অভিজ্ঞতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, মানসিক সুস্থতা নিয়ে সচেতনতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার ফল। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি হয়তো এক বাক্যেই বলা যায়, জেন জি ভালোবাসাকে ভয় পায় না, তারা ভুল ভালোবাসার মূল্য দিতে ভয় পায়। আর সেই কারণেই হয়তো তারা দ্রুত প্রেমে পড়ার চেয়ে এমন একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা করতে বেশি আগ্রহী, যার সঙ্গে সম্পর্ক মানে শুধু ‘একসঙ্গে থাকা’ নয়, বরং নিরাপদে, স্বচ্ছন্দে এবং নিজের মতো করে একসঙ্গে থাকা।
সূত্র: থট ক্যাটালগ
ছবি: পেকজেলস ও এআই