
ড্যাকোটা জনসন ও কলিন ফারেলের অভিনয়ে টেলর সুইফটের নতুন গানটির মিউজিক ভিডিওতেও উঠে এসেছে এমন এক সম্পর্কের গল্প, যেখানে পুরোনো আচরণের একই প্যাটার্ন নতুন সম্পর্কেও ফিরে আসে।
গানটির গল্পে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী তার সাবেক সঙ্গীর নতুন প্রেমিকার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান, তিনিও কি একই ধরনের আচরণের মুখোমুখি হয়েছেন। অর্থাৎ, অনেক সময় অন্য কারও অভিজ্ঞতা নিজের সম্পর্কের কিছু অস্বস্তিকর বিষয়কে নতুন করে চিনতে সাহায্য করতে পারে।

তবে আত্মকেন্দ্রিক বা কঠিন আচরণ করলেই কাউকে নার্সিসিস্ট বলা যায় না। নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বা এনপিডি নির্ণয় করতে পারেন কেবল যোগ্য মোনবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী। তাই এখানে কোনো রোগ নির্ণয়ের কথা নয়, বরং সম্পর্কে বারবার দেখা দেওয়া কিছু সতর্ক সংকেতের কথা বলা হচ্ছে।
আপনি দিনের কথা বলতে শুরু করেছেন, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই কথোপকথন ঘুরে গেল তার জীবনের দিকে। আপনার সাফল্য, আনন্দ বা সমস্যার জায়গাটিও যেন তার গল্পের কাছে গুরুত্ব হারায়। এমন সঙ্গী বারবার প্রশংসা, মনোযোগ বা স্বীকৃতি চাইতে পারেন।
সম্পর্কে দুজনেরই কথা বলার জায়গা থাকা জরুরি। কিন্তু যদি নিয়মিত এমন হয় যে আপনাকে শুধু শুনেই যেতে হচ্ছে, আর আপনার অভিজ্ঞতার জন্য জায়গা নেই, তাহলে বিষয়টি খেয়াল করার মতো।

কোনো কথা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, এটা জানালে উত্তর আসে, ‘তুমি বেশি ভাবছ’, ‘এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে’ কিংবা ‘তুমি অতিরিক্ত রিঅ্যাক্ট করছ।’
একবার-দুবার মতের অমিল হতেই পারে। কিন্তু আপনার অনুভূতিকে নিয়মিত ছোট করা, আপনার কষ্টকে অস্বীকার করা বা বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সুযোগ না দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হতে পারে। সহানুভূতির অভাব নার্সিসিস্টিক আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, বিশেষ করে যখন একজন সঙ্গী বারবার অন্যজনের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করেন।

সম্পর্কে ঝামেলা হয়েছে? শেষ পর্যন্ত দায়ী কে, আপনিই। তিনি ভুল করলেও ব্যাখ্যা, অজুহাত বা পাল্টা অভিযোগের মাধ্যমে আলোচনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারেন, যেন শেষ পর্যন্ত আপনাকেই ক্ষমা চাইতে হচ্ছে।
সব মানুষই ভুল করেন। কিন্তু নিজের আচরণের জন্য নিয়মিত দায় এড়িয়ে গেলে সমস্যা তৈরি হয়। কারণ বিশ্বাস তৈরি করতে হলে নিজের ভুল স্বীকার করার সক্ষমতাও প্রয়োজন।

আপনি স্পষ্ট মনে করতে পারছেন একটি ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু সঙ্গী বলছেন, ‘এমন কিছুই হয়নি।’ আপনি কোনো কষ্টের কথা তুললে তিনি বলেন, আপনি অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা সবকিছু বানিয়ে বলছেন।
এ ধরনের আচরণ বারবার ঘটতে থাকলে সেটি গ্যাসলাইটিংয়ের দিকে যেতে পারে। এতে ধীরে ধীরে একজন মানুষ নিজের স্মৃতি, উপলব্ধি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেন। সাধারণ মতবিরোধ আর গ্যাসলাইটিং এক নয়; এখানে মূল বিষয় হলো বারবার প্রতিটি আলাপকে এমনভাবে প্রভাবিত করা, যাতে আপনি নিজের বিচারবুদ্ধিকেই বিশ্বাস করতে না পারেন।

কোথায় খেতে যাবেন, সপ্তাহান্তে কী করবেন অথবা যে কোন বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সবকিছুতেই তার পছন্দ যেন অগ্রাধিকার পায়। আপনার প্রয়োজনকে হয়তো কখনও কখনও গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু তার নিজের চাহিদার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
শুরুতে বিষয়টি খুব ছোট মনে হতে পারে। যেমন, সবসময় তিনিই ঠিক করছেন কোথায় ডিনার হবে। কিন্তু ধীরে ধীরে একই মানসিকতা যদি বড় সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রেও চলে আসে, তখন সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। সুস্থ সম্পর্কে দুজনের প্রয়োজন ও মতামতের জন্যই জায়গা থাকে।

একটি সাধারণ পরামর্শও যদি তীব্র রাগ, অপমান, দূরত্ব তৈরি করা বা পাল্টা আক্রমণের কারণ হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি খেয়াল করা জরুরি।
নার্সিসিস্টিক বৈশিষ্ট্য থাকা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সমালোচনা তাদের আত্মপরিচয় বা আত্মমর্যাদার জন্য হুমকি মনে হতে পারে। এক্ষেত্রে মূল সতর্ক সংকেত হলো একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন, আপনি কথা বলতে গেলেই যদি বারবার নিজেকে দোষী, ছোট বা অপরাধী মনে করেন, তাহলে সেটিকে হালকাভাবে না দেখাই ভালো।

কোনো সম্পর্কের কিছু আচরণ নার্সিসিস্টিক মনে হলেই সঙ্গীকে কোনো মানসিক রোগের লেবেল দেওয়া ঠিক নয়। বরং নিজেকে কিছু প্রশ্ন করা জরুরি, এই সম্পর্কে কি আমি কথা বলার সুযোগ পাই? আমার সীমাবদ্ধতাকে কি সম্মান করা হয়? আমি কি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে নিরাপদ বোধ করি? মতের অমিল হলে কি আমাকে ছোট করা হয়?
কোনো সম্পর্ক যদি আপনাকে বারবার নিজের ওপর সন্দেহ করতে বাধ্য করে, তাহলে বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে কথা বলা বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া উপকারী হতে পারে। আর যদি কখনো নিজেকে অনিরাপদ মনে হয়, তাহলে নিজের নিরাপত্তাকেই সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে।
পেশেন্ট জিরো-এর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো এখানেই। কখনো কখনো অন্য একজনের অভিজ্ঞতা নিজের জীবনের বিভ্রান্ত মুহূর্তগুলোকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করে। কোনো আচরণের নাম জানা মানেই কাউকে বিচার করা নয়; বরং নিজের অনুভূতি ও সীমারেখাকে আরও স্পষ্টভাবে চিনে নেওয়ার প্রথম ধাপ হতে পারে।

পেশেন্ট জিরোর বিশেষত্ব শুধু গল্পে নয়, এর ভিজ্যুয়াল ভাষাতেও। টেলর সুইফট ও ড্যাকোটা জনসনের চরিত্রকে বারবার একই ধরনের পোশাকে দেখা যায়। শুরুতেই দুজনের গায়ে কালো লেদার কোট, প্রশস্ত প্যান্ট ও বুট—একই লুকে দুজন নারীকে পাশাপাশি দেখানোর মাধ্যমে ভিডিওটি যেন ইঙ্গিত দেয়, তাদের জীবনও ধীরে ধীরে একই জায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে। পরে গ্রে সিল্ক টপ ও কালো সাটিন শর্টস, আবার দুজনের একই ধরনের কালো ড্রেসের এই মিলই তাদের সম্পর্কের অভিজ্ঞতার মিলকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।

ভিডিওর মাঝামাঝি ‘টুইনিং’ আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। একই ধরনের বাটার-ইয়েলো ভ্যালেন্টিনো গাউন, গোল্ড এমব্রয়ডারি এবং একই স্টাইলিংয়ে পার্টিতে হাজির হন সুইফট ও জনসন। বাইরে থেকে দৃশ্যটি বিলাসবহুল ও গ্ল্যামারাস হলেও দর্শক জানেন, এই চকচকে আবরণের আড়ালেই তৈরি হচ্ছে অস্বস্তিকর এক সম্পর্কের গল্প। অর্থাৎ, সুন্দর পোশাক এখানে সুখের প্রতীক হয়ে ওঠে না; বরং নিখুঁত দেখানো একটি সম্পর্কের ভেতরের অন্ধকারকে আরও তীব্র করে তোলে।

মেকআপেও রয়েছে একই ‘মিররিং’। ভিডিওর শুরুতে সুইফটকে তার পরিচিত গ্ল্যামারাস লুক থেকে অনেকটাই দূরে, প্রায় মেকআপহীন ও অশ্রুসিক্ত মুখে দেখা যায়। পরে গল্প এগোতে থাকলে ড্যাকোটা জনসনের চরিত্রও সুইফটের মতো করে লাল লিপস্টিক পরেন। অর্থাৎ দুজনের চেহারাও যেন একে অন্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই একই লুক শুধু সৌন্দর্যের খেলা নয়, একজন যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, অন্যজনও যে ধীরে ধীরে সেই একই পথে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই বার্তাটিকেই আরও স্পষ্ট করে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো লাল লিপস্টিকের ব্যবহার। ভিডিওতে সুইফট ও জনসন দুজনকেই একই লাল লিপস্টিক ব্যবহার করতে দেখা যায়। এই বিউটি ডিটেইল তাদের চেহারাকে এক করে দেওয়ার পাশাপাশি গল্পের কেন্দ্রীয় ‘মিরর’ ধারণাটিকেও জোরালো করে। শুরুতে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়, দুই নারী আসলে একই ধরনের সম্পর্কে আটকে পড়েছেন।

এরপর আসে সুইফটের চরিত্রের আরও ব্যক্তিগত কিছু লুক। সিলভার, লেস-ট্রিমড পাজামা সেট কিংবা গাঢ় কালো পোশাক। ঝলমলে পার্টি লুক থেকে এই অপেক্ষাকৃত ব্যক্তিগত ও নিঃসঙ্গ মূহুর্ত গুলোতে পোশাকের বদলে যাওয়া গল্পটির আবহকেও আরও গভীর করে। ভিডিওটির সামগ্রিক ধূসর, সংযত ও বিষণ্ন রঙের সঙ্গে এই পোশাকগুলো মিলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সম্পর্কের বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে ভেতরের অস্বস্তিটাই বেশি চোখে পড়ে।

সবশেষে ‘পেশেন্ট জিরো’ তাই শুধু বিষাক্ত সম্পর্কের গল্প বলে না, সেটিকে পোশাক, মেকআপ, রং ও মিররিংয়ের মাধ্যমেও দেখায়। একই পোশাকে দুই নারী, একই লাল ঠোঁট, একের পর এক অস্বস্তিকর দৃশ্য। সবকিছু মিলিয়ে বার্তাটি খুব স্পষ্ট: অনেক সময় বিপদের সবচেয়ে বড় সংকেত বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু একই গল্প বারবার ঘটতে থাকলে তার প্যাটার্নটি ধরা পড়ে। আর সেই প্যাটার্ন চিনে ফেলা থেকেই শুরু হতে পারে নিজেকে রক্ষা করার পথ।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, বিলবোর্ড
ছবি: টেলর সুইফটের ইনস্টাগ্রাম