
প্রেম ও বিয়ের ক্ষেত্রে বয়স এখন আর বড় বাধা নয়। এমন ধারণাই আধুনিক সমাজে ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু যখন একটি সম্পর্কে দুই প্রান্তের প্রজন্ম অর্থাৎ জেন-এক্স (১৯৬৫–১৯৮০) ও জেন জি (১৯৯৭–২০১২) একসঙ্গে আসে, তখন শুধু বয়স নয়, জীবনদর্শন, মানসিকতা ও অভ্যাসের ব্যবধানও সামনে এসে দাঁড়ায়। এই ব্যবধান কখনো সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করে, আবার অনেক সময় নানা জটিলতারও জন্ম দেয়। জেন-এক্স আর জেনজি-র বিয়ে হলে আজকাল অনেক ধরনের সমস্যার কথা জানা যাচ্ছে। ব্যাপারটা বিচ্ছেদের দিকেও গড়াচ্ছে।

প্রজন্মগত ব্যবধান কেন গুরুত্বপূর্ণ
জেন এক্স বেড়ে উঠেছে শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি কমিটমেন্টের সংস্কৃতিতে। অন্যদিকে জেন-জি বড় হয়েছে দ্রুতগতির ডিজিটাল দুনিয়া, আত্মপরিচয় ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ভেতর দিয়ে। এই দুই ভিন্ন মানসিকতা একত্র হলে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
১. মানসিকতা ও জীবনের লক্ষ্য নিয়ে ভিন্নতা
জেন-এক্স সাধারণত স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সঞ্চয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। বিপরীতে জেন-জি বেশি গুরুত্ব দেয় আত্মতৃপ্তি, কাজ–জীবনের ভারসাম্য ও মানসিক স্বাস্থ্যে। ফলে ক্যারিয়ার, সন্তান নেওয়ার সময় কিংবা জীবনযাপনের লক্ষ্য নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।

২. যোগাযোগের ধরন ও ভাষাগত ব্যবধান
জেন-এক্স সরাসরি কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, যেখানে জেন-জি আবেগ, অনুভূতি ও ডিজিটাল এক্সপ্রেশন—ইমোজি, মেসেজ, নীরবতা—সবকিছুর মাধ্যমেই যোগাযোগ করেন। এতে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।
৩. প্রযুক্তি ব্যবহারে দ্বন্দ্ব
যদিও জেন-এক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানে, তবু জেন-জির মতো সারাক্ষণ অনলাইন থাকা তাদের কাছে বিরক্তিকর লাগতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করা নিয়েও টানাপোড়েন দেখা দেয়।
৪. ক্ষমতার ভারসাম্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
বয়সের ব্যবধানের কারণে সম্পর্কে ‘অভিভাবক–সন্তান’ ধরনের ডায়নামিক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে জেন-জি নিজেকে নিয়ন্ত্রিত মনে করতে পারে, আর জেন-এক্স নিজেকে দায়িত্বভারাক্রান্ত ভাবতে পারে।
৫. সামাজিক চাপ ও পারিবারিক প্রত্যাশা
বাংলাদেশের মতো সমাজে এই ধরনের বিয়েকে এখনো অনেক পরিবার সহজভাবে নেয় না। আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, সমালোচনা ও তুলনা সম্পর্কে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

৬. শক্তি ও জীবনযাত্রার পার্থক্য
জেন-জি যেখানে ঘুরে বেড়ানো, নতুন অভিজ্ঞতা ও দ্রুত পরিবর্তন পছন্দ করে, সেখানে জেন-এক্স তুলনামূলক শান্ত ও পরিকল্পিত জীবনযাপন চান। দৈনন্দিন অভ্যাসেও এর প্রভাব পড়ে।
৭. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দ্বন্দ্ব
বয়সের ব্যবধানের কারণে অবসর, স্বাস্থ্য, সন্তান প্রতিপালন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে পারে।
তবে কি এই বিয়ে টেকসই নয়?
একেবারেই তা নয়। সঠিক বোঝাপড়া, সম্মান ও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে এই ব্যবধান অনেক সময় শক্তিতে রূপ নেয়। জেন-এক্সের অভিজ্ঞতা ও জেন-জির নতুন দৃষ্টিভঙ্গি একে অন্যকে সমৃদ্ধ করতে পারে।

কীভাবে সমস্যা কমানো যায়
প্রত্যাশা শুরুতেই পরিষ্কার করা
বয়স নয়, ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া
সিদ্ধান্তে সমতা বজায় রাখা
পরস্পরের স্বাধীনতাকে সম্মান করা
প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়া
জেন-এক্স ও জেন-জির বিয়ে মানে শুধু দুই মানুষের মিলন নয়, বরং দুই সময়ের, দুই মানসিকতার সংযোগ। এই সম্পর্ক চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া থাকলে প্রজন্মের ব্যবধানও ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে
ছবি: এআই