
বাবা–ছেলে বিশ্বকাপ খেলার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু এই ঘটনা কাকতালীয় ও নজিরবিহীন। ৩২ বছর পর বাবাদের মতো একই দেশের হয়ে, একই স্বাগতিক দেশে খেলছেন পাঁচ ফুটবলার।

১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফিফা বিশ্বকাপের ১৫তম আসর। সেবার খেলেছিলেন পাঁচ ফুটবলার, যাঁদের কারও সন্তান তখনো জন্মায়নি, কারও সন্তান একেবারেই শিশু। তিন দশকের বেশি সময় পর আবার উত্তর আমেরিকার মাটিতেই বিশ্বকাপ। আর এবার সেই বাবাদের উত্তরসূরিরাই দেশের জার্সি গায়ে নেমেছেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
ফুটবলের ইতিহাসে কিছু গল্প পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি চমৎকার। গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ডের বাইরেও সেসব গল্প দাগ কেটে যায় সবার হৃদয়ে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ তেমনই এক বিরল অধ্যায়ের সাক্ষী।

আর্জেন্টিনার জুলিয়ানো সিমিওনে, ইউএসএর জিওভানি রেয়না আর নরওয়ের আর্লিং হলান্ড, ক্রিস্টিয়ান থোর্স্টভেট ও আলেক্সান্দার সরলথ—তাঁদের গল্প এসে মিলে যায় এক জায়গায়। বাবারা একদিন যে স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে খেলেছিলেন, আজ সেই স্বপ্নের ধারক তাঁদের সন্তানেরা।
এই ৫ ‘বাপ কা বেটা’র ৩ জনই নরওয়ের। একেই বলা হচ্ছে নরওয়ের জেনারেশন নাইন্টিফোর। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে নরওয়ের হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছিলেন আলফ-ইঙ্গে হলান্ড, গোরান সরলথ ও এরিক থোর্স্টভেট। ঠিক ৩২ বছর পর ইতিহাস অবিকল পুনরাবৃত্তি করেছে। সেই তিন সতীর্থের ছেলেরাও এখন আবার সতীর্থ। তাঁরাই বর্তমান নরওয়ে জাতীয় দলের মূল চালিকা শক্তি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

ভাইকিংসদের জার্সি গায়ে মার্কিন মুলুকেই খেলছেন আর্লিং হলান্ড, ক্রিস্টিয়ান থোর্স্টভেট ও আলেক্সান্দার সরলথ। তাঁদের হাত ধরেই ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছে এই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ। অনেকের কাছেই বর্তমান নরওয়ে দল যেন ১৯৯৪ সালের সেই দলেরই নতুন সংস্করণ।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে নরওয়ের মিডফিল্ডে ছিলেন আলফ-ইঙ্গে হলান্ড। পরিশ্রমী, ভার্সাটাইল ও নির্ভরযোগ্য এই ফুটবলার ছিলেন সে সময়ের দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

এখন তাঁর ছেলে আর্লিং হলান্ড বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত ভয়ংকর গোলদাতাদের একজন। অসাধারণ ফিনিশিং, শারীরিক শক্তি ও বিস্ময়কর গোল করার ক্ষমতায় তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। বাবার বিশ্বকাপ স্মৃতির সঙ্গে ছেলের বিশ্বকাপ অভিযানের যোগসূত্র হলান্ড পরিবারকে স্থান দিয়েছে ইতিহাসের বিশেষ এক জায়গায়।
৯৪–এর সেই বিশ্বকাপে লোবিন অর্থাৎ দ্য লাইনসদের গোলবার সামলেছিলেন এরিক থোর্স্টভেট। ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারের সাবেক এই গোলরক্ষক ছিলেন নরওয়ের ফুটবলের এক নির্ভরতার নাম।

তাঁর ছেলে ক্রিস্টিয়ান অবশ্য বাবার মতো গোলরক্ষক হননি। তিনি খেলেন মাঝমাঠে। খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ গড়ে তোলা ও রক্ষণে ভারসাম্য আনা—এই দায়িত্বই পালন করেন তিনি।

বাবা গোরান সরলথের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আলেক্সান্দার সরলথও খেলছেন আক্রমণভাগে। দেশের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই স্ট্রাইকারের ছেলে আলেক্সান্দার সরলথ এখন নরওয়ের আক্রমণের অন্যতম ভরসা। আর্লিং হলান্ডের সঙ্গে তাঁর জুটি নিয়ে সমর্থকদের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া।
নরওয়ের বাইরে সবচেয়ে আলোচিত বাবা-ছেলের জুটি নিঃসন্দেহে আর্জেন্টিনার সিমিওনে পরিবার।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডে খেলেছিলেন দিয়েগো সিমিওনে। পরে তিনি বিশ্বের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এমনকি লা লিগার সর্বোচ্চ বেতনপ্রাপ্ত কোচদের একজন তিনি।

এই বিশ্বকাপে তাঁর ছেলে জুলিয়ানো সিমিওনে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে খেলছেন। গতি, লড়াকু মানসিকতা ও প্রতিপক্ষের ওপর অবিরাম চাপ সৃষ্টি করে খেলার ধরন তাঁর বাবার কথা মনে করিয়ে দেয়। খেলার অবস্থান আলাদা হলেও জয়ের জন্য আপসহীন মানসিকতা যেন রক্তের সঙ্গেই উত্তরাধিকার হয়ে এসেছে।
এই বাবা–ছেলের গল্পটাও খুব কাছাকাছি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থেকেও চোটের কারণে মাঠে নামতে পারেননি মার্কিন মিডফিল্ডার ক্লদিও রেয়না। বিশ্বকাপের স্বপ্ন তখন থেমে গিয়েছিল সাইডলাইনে। পরের বিশ্বকাপগুলোয় অবশ্য নিজেকে সেরা প্রমাণ করেছেন ক্লদিও।

তিন দশকের বেশি সময় পর সেই গল্পের নতুন অধ্যায় লিখছেন তাঁর ছেলে জিওভানি রেয়না। নিজ দেশের হয়ে খেলছেন ২০২৬ বিশ্বকাপে।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এখানেই। কারণ, সময় বদলায়, নায়ক বদলায়, গ্যালারির মুখ বদলায়। বদলে যায় প্রজন্মও; কিন্তু প্রজন্মান্তরে থেকে যায় একই স্বপ্ন।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম