একটা স্ট্রবেরি জ্যামের বোতল থেকে যে সন্দেহের জন্ম
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটা কখনো কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রেম, সবচেয়ে গভীর বিশ্বাস এবং সবচেয়ে নির্মম বিশ্বাসঘাতকতারও গল্প। স্টেডিয়ামের আলো নিভে গেলে, লাখো দর্শকের করতালি থেমে গেলে, ফুটবল তারকাদের জীবনও ফিরে যায় খুব সাধারণ কিছু অনুভূতির কাছে—ভালোবাসা, পরিবার, আশা আর ভাঙনের কাছে।
এটা তেমনই এক গল্প।

একজন নারী, যার কণ্ঠে অনুরণিত হয়েছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগীতগুলোর একটি। একজন পুরুষ, যিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের ডিফেন্ডার। আর তাদের মাঝখানে আছে প্রেম, খ্যাতি, পরিবার, বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুনর্জন্মের এক অবিশ্বাস্য কাহিনি।

বিজ্ঞাপন

২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ। পৃথিবী তখন নেচেছে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানের তালে। এই গানের শিল্পী ছিলেন বিশ্বসংগীতের উজ্জ্বলতম তারকাদের একজন, শাকিরা। সেই গানের মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়েই প্রথম দেখা স্পেনের সুদর্শন ফুটবলার জেরার্ড পিকের সঙ্গে। ফুটবল আর সঙ্গীত—দুই ভিন্ন জগত যেন হঠাৎ অদৃশ্য এক সুতোয় বাঁধা পড়ে যায়।

এই সম্পর্ককেই একসময় বলা হয়েছে নিখুঁত রূপকথা
এই সম্পর্ককেই একসময় বলা হয়েছে নিখুঁত রূপকথা

প্রথম দেখার আকর্ষণ দ্রুতই রূপ নেয় গভীর সম্পর্কে। বিশ্বমিডিয়া তাদের প্রেমকে দেখেছে মুগ্ধ হয়ে। লাল গালিচা, পুরস্কার বিতরণী, ফুটবল স্টেডিয়াম কিংবা পারিবারিক অবকাশ—সব জায়গাতেই তাঁরা ছিলেন আলোচিত এক জুটি।

মনে করা হতো এই সম্পর্ককে পূর্ণতা দিয়েছে  দুই সন্তান
মনে করা হতো এই সম্পর্ককে পূর্ণতা দিয়েছে দুই সন্তান

তাদের দুই সন্তান মিলান ও সাশার জন্ম সেই সম্পর্ককে আরও পূর্ণতা দেয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, এ যেন আধুনিক সময়ের এক নিখুঁত রূপকথা।

কিন্তু রূপকথারও কখনো কখনো অন্ধকার অধ্যায় থাকে।

বিজ্ঞাপন

শাকিরা প্রায়ই কাজের প্রয়োজনে দেশ-বিদেশে সফরে থাকতেন। এমনই এক সফর শেষে বাড়ি ফিরে তিনি লক্ষ্য করেন অদ্ভুত এক বিষয়। ফ্রিজে রাখা তার প্রিয় স্ট্রবেরি জ্যামের বোতল প্রায় খালি। অথচ তিনি জানতেন, পিকে কিংবা তাদের সন্তানদের কেউই স্ট্রবেরি জ্যাম পছন্দ করে না। একটি সাধারণ জ্যামের বোতল তার মনে সন্দেহের জন্ম দেয়।

এই রূপকথা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি
এই রূপকথা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি

কখনো কখনো জীবনের বড় সত্যগুলো খুব ছোট সূত্র থেকেই ধরা পড়ে।
সেই ছোট্ট সন্দেহই পরে উন্মোচন করে এক বড় বাস্তবতা। স্পষ্ট হয়, শাকিরার অনুপস্থিতিতে পিকের জীবনে অন্য একজন নারীর উপস্থিতি। ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে নতুন সম্পর্কের খবর। যে সংসারকে শাকিরা নিজের পৃথিবী মনে করেছেন, সেই পৃথিবীর ভেতরেই নীরবে তৈরি হয়েছে দূরত্বের দেয়াল।

প্রথমে তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি। অনেক মানুষের মতো তিনিও ভেবেছিলেন, ভুল মানুষ করে, ভুল শুধরেও নেয়। পরিবারের কথা ভেবে, সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি সম্পর্কটিকে আরেকটি সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন বিশ্বাসঘাতকতা অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন ক্ষমাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

অবশেষে ২০২২ সালে দীর্ঘ বারো বছরের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে। পৃথিবীর কোটি মানুষের সামনে হাসিমুখে থাকা সেই নারীকে তখন ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

স্বপ্নভঙঙ্গ সত্ত্বেও ভেঙে পড়েননি
স্বপ্নভঙঙ্গ সত্ত্বেও ভেঙে পড়েননি

তবে এখানেই গল্পের শেষ নয়।

অনেকেই বিচ্ছেদের পর নিজেকে গুটিয়ে নেন। কেউ হারিয়ে যান স্মৃতির অন্ধকারে। কিন্তু শাকিরা অন্য পথ বেছে নেন। তিনি তাঁর ব্যথাকে শক্তিতে, অপমানকে শিল্পে এবং ভাঙনকে সৃষ্টিতে রূপান্তর করেন।

তার প্রকাশিত গান “BZRP Music Sessions, Vol. 53” শুধু একটি গান ছিল না; ছিল আহত আত্মসম্মানের জবাব। সেখানে তিনি রূপকের ভাষায় বলেছেন, “তুমি একটি ফেরারি ছেড়ে রেনোঁ বেছে নিয়েছ, রোলেক্স ছেড়ে ক্যাসিও।” কথাগুলো মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে। গানটি কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন রেকর্ড গড়ে।

শাকিরা গুছিয়ে নিয়েছেন নিজেকে
শাকিরা গুছিয়ে নিয়েছেন নিজেকে

এই কারণেই হয়তো শাকিরার গল্প শুধু একজন তারকা শিল্পীর গল্প নয়। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন—বিশ্বাস ভাঙতে পারে, সম্পর্ক শেষ হতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের সম্ভাবনা কখনো শেষ হয় না।

বিশ্বকাপের মঞ্চে শুরু হয়েছিল যে প্রেম, তার পরিণতি ছিল বেদনাময়। কিন্তু সেই বেদনাকেও তিনি পরাজিত হতে দেননি। বরং সেটাকেই রূপান্তর করেছেন নিজের সবচেয়ে বড় বিজয়ে।

বিশ্বকাপেই ফিরেছেন আবার স্বমহিমায়
বিশ্বকাপেই ফিরেছেন আবার স্বমহিমায়

কারণ জীবন মাঝে মাঝে আমাদের ফেরারি কেড়ে নেয়। কিন্তু সেই হারানোর ভেতর থেকেই কেউ কেউ নতুন করে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। আর শাকিরা সেই বিরল মানুষদের একজন।

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১৩: ০০
বিজ্ঞাপন