
নভেম্বরের শেষ দিক থেকে শীতজুড়ে বহু সিঙ্গেল মানুষ নতুন সম্পর্কে জড়াতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ডেটিং অ্যাপের পরিসংখ্যান, সামাজিক আচরণ ও অনলাইন আলোচনায় তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি নিছক সামাজিক ট্রেন্ড, নাকি এর পেছনে কাজ করে মানুষের মন, শরীর ও বিবর্তনের গভীর কোনো প্রভাব?

‘কাফিং সিজন’ শব্দ দুটির উৎপত্তি নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না; তবে ধারণা করা হয়, ২০০৯ সালের দিকে এটি জনপ্রিয় হয়। তখন ‘গেটিং কাফড (getting cuffed)’ বলতে বোঝানো হতো কাউকে নিয়ে সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। গ্রীষ্মের স্বাধীনতা ও হালকা সম্পর্কের পর শরৎ ও শীতে এসে অনেকেই যেন স্থিরতা খোঁজেন, এই পর্যবেক্ষণ থেকেই শব্দটি ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু সত্যিই কি মানুষ শীত এলেই সচেতনভাবে সঙ্গী খোঁজে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মনোবিজ্ঞানের দিকেই তাকান গবেষকেরা। ক্যালিফোর্নিয়ার সান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. ক্রিস্টিন মা-কেলামস বলেন, ‘মানুষের মিলন বা ডেটিং আচরণ নাকি মৌসুমি; কাফিং সিজন বলতে মূলত এই ধারণাকেই বোঝায়; কিন্তু কেন এটা ঘটে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঐকমত্য নেই।’
ক্রিস্টিন মা-কেলামস আরও জানান, আধুনিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যৌনতা ও ডেটিং–সম্পর্কিত অনলাইন অনুসন্ধান বছরে দুবার বেড়ে যায়—একবার শীতে, আরেকবার গ্রীষ্মে। ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটে যৌনতা–সম্পর্কিত শব্দের সার্চে প্রতি ছয় মাস অন্তর একটি চক্রাকার বৃদ্ধি ঘটে।
এ থেকে স্পষ্ট হয় ডেটিংয়ের আগ্রহ শুধু শীতেই সীমাবদ্ধ নয়।

১৯৯০-এর দশকে করা আরেকটি গবেষণায় গবেষকেরা বিবাহবহির্ভূত জন্মহার, গর্ভপাত, যৌনবাহিত রোগ ও কনডম বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করেন। সেখানে দেখা যায়, ক্রিসমাসের সময় যৌন কার্যকলাপ (এবং ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ) কিছুটা বেড়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা অব্যাহত আছে কি না—এ বিষয়ে নতুন গবেষণা নেই।
ডেটিং অ্যাপগুলোর তথ্য অবশ্য কাফিং সিজনের ধারণাকে কিছুটা সমর্থন করে। ডেটিং অ্যাপ বাম্বলের গবেষণা অনুযায়ী, নভেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ই ডেটিং অ্যাপে সবচেয়ে বেশি সোয়াইপ ও ম্যাচ হয়। এই ধারা ভালোবাসা দিবসের ঠিক আগপর্যন্ত চলতে থাকে। যাকে অনেক গবেষক মজা করে বলেন, ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডের আগে বা পরে ব্রেকআপের উপযুক্ত সময়।’
ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির দ্য কিনসি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও সম্পর্ক গবেষক ড. জাস্টিন গার্সিয়া বলেন, ‘সারা বছরই অনলাইন ডেটিং চলে, প্রতিদিনই লাখ লাখ সোয়াইপ হয়। কিন্তু শীতের মাসগুলোতে এর সংখ্যা স্পষ্টভাবে বেড়ে যায়। মানুষ তখন ঘরের ভেতরে বেশি থাকে, পরিবার বা নিজের শহরে সময় কাটায়—ফলে নতুন মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে ফোন।’

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা প্রাণিজগতের দিকেও তাকিয়েছেন। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট গবেষক ড. সু কার্টার বলেন, ‘অনেক প্রাণী আছে যারা নির্দিষ্ট মৌসুমে প্রজনন করে—যেমন গরু বা পাখি। কিন্তু মানুষ তেমন নয়। মানুষ সুযোগসন্ধানী। সুযোগ থাকলে যেকোনো সময়েই সম্পর্ক ও যৌনতায় জড়াতে পারে।’
এই গবেষকের মতে, মানুষের যৌন আচরণ কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর মধ্যে আটকে নেই।
এ বিষয়ে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্স গবেষক ও অধ্যাপক ড. র্যান্ডি নেলসন যোগ করেন, ‘মানুষের জন্মহারের মধ্যে যে মৌসুমি ওঠানামা দেখা যায়, তার পেছনে প্রায় সব সময় সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কারণ কাজ করে, জৈবিক নয়।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘কিছু কৃষিনির্ভর আদিবাসী সমাজে ফসল কাটার ৯ মাস পর জন্মহার বাড়ে। কারণ, সেটি সামাজিকভাবে সচ্ছল সময়।’

তবে শীত যে মানুষের মানসিক অবস্থায় প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে বিজ্ঞান একমত। সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার নামের শীতকালীন বিষণ্নতা বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশে ১ থেকে ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ককে প্রভাবিত করে এবং নারীদের মধ্যে এটা বেশি দেখা যায়।
ড. র্যান্ডি নেলসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘শীতে আমরা প্রায় গুহাবাসীর মতো জীবনযাপন করি। অন্ধকারে ঘর থেকে বের হই, কৃত্রিম আলোতে কাজ করি, আবার অন্ধকারেই ফিরি। পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো না পেলে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম ঠিকমতো কাজ করে না।’
এর ফলে সেরোটোনিন, ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মতো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। যেগুলো আমাদের ভালো লাগা, সংযুক্তি ও আনন্দের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
ড. সু কার্টার বলেন, ‘মানুষ অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। সমাজ গড়তে, সম্পর্ক ধরে রাখতে আমাদের শরীরেই রয়েছে প্রয়োজনীয় রসায়ন। অক্সিটোসিন আমাদের কাছে টানে, আবার একসঙ্গে থাকতে সাহায্য করে।’
আলিঙ্গন, ঘনিষ্ঠতা ও যৌন সম্পর্কের সময় এই হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মানসিক নিরাপত্তা তৈরি করে। বিশেষ করে নতুন সম্পর্কের শুরুতে, যাকে ‘হানিমুন ফেজ’ বলা হয়। এই বন্ধন আরও গভীর হয়।

ড. নেলসনের মতে, ‘শীতকালে শরীরের উষ্ণতার বিষয়টিও অবচেতনে কাজ করতে পারে। নারীদের শরীরে তাপ বণ্টনের ধরন আলাদা। শীতে হাত-পা ঠান্ডা হওয়া স্বাভাবিক। তখন অজান্তেই মনে হতে পারে, কেউ থাকলে ভালো হতো, যে উষ্ণতা দেবে।’
ড. জাস্টিন গার্সিয়া মনে করেন, কাফিং সিজনের পেছনে পরিবারের ভূমিকা বড়। তিনি বলেন, ‘মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রজাতির মধ্যে পরিবার এভাবে সঙ্গী নির্বাচনে জড়িত নয়। উৎসবের সময় পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে থাকলে সম্পর্ক নিয়ে ভাবনাটা স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আসে।’

আজকের তরুণ প্রজন্ম সম্পর্কে ঢোকার আগে নিজেকে অনেক বেশি বুঝতে চায়। কাজ, মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মপরিচয়, সবকিছুর মধ্যে সম্পর্ক এখন আর তাড়াহুড়োর বিষয় নয়। এর ফলেই ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারেও দেখা যাচ্ছে ক্লান্তি। ২০২৫ সালে ফোর্বসের একটি জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৭৮ শতাংশ ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারী ‘ডেটিং বার্নআউট’ অনুভব করছেন।
তবু ড. গার্সিয়ার মতে, ‘সম্পর্ক থেকেই মানুষ শেখে, ভুল করে, পরিণত হয়। সম্পর্কই সেই মাধ্যম, যার ভেতর দিয়ে আমরা নিজেকে আবিষ্কার করি।’
বিজ্ঞান বলছে, মানুষ মৌসুমি প্রেমিক নয়। কিন্তু সমাজ, সংস্কৃতি, আলো–আঁধারি, হরমোন আর উৎসবের আবহ মিলিয়ে শীত হয়তো আমাদের একটু বেশি সংযোগ খুঁজতে শেখায়।
শীত যদি প্রেমের ঋতু না-ও হয়, অন্তত উষ্ণতার খোঁজে মানুষকে আরও মানবিক করে তোলে এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
সূত্র: বিবিসি লাইফস্টাইল, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি জার্নাল ও ফোর্বস
ছবি: এআই