ডেটে বিল কে দেবেন? এই ছোট সিদ্ধান্তেই ধরা পড়ে সম্পর্কের আসল সমীকরণ!
শেয়ার করুন
ফলো করুন

প্রথম ডেট হোক কিংবা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, রেস্তোরাঁয় খাওয়া শেষে বিল আসার মুহূর্তটা অনেক সময় অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কে বিল দেবেন? সমান ভাগে দেওয়া উচিত, নাকি একজনই দেবেন? আসলে এই ছোট্ট অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে সম্পর্কের ভাবনা, যত্ন ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার অনেক ইঙ্গিত।

বিল কি সব সময় সমান ভাগে দেওয়া উচিত?

বর্তমান সময়ে নারীরা নিজেরা আয় করেন, ক্যারিয়ার গড়েন, ব্যবসা চালান এবং নিজের খরচ নিজেই বহন করতে পারেন। তাই ‘শুধুমাত্র পুরুষকে বিল দিতে হবে’ এমন ধারণা আগের মতো প্রাসঙ্গিক নয়।

সম্পর্কবিষয়ক গবেষক ড. জন গটম্যানের মতে, কোনো পুরুষ সঙ্গিনীর খাবারের বিল দিলে সেটিকে শুধু নারীর আর্থিক অক্ষমতার সঙ্গে দেখা ঠিক নয়। তাঁর কাছে এটি হতে পারে যত্ন নেওয়ার একটি ছোট্ট ইঙ্গিত। অর্থাৎ, ‘কে বিল দিলেন’ প্রশ্নটি কখনো কখনো আসলে ‘কে কতটা দায়িত্ব নিচ্ছেন’ বা ‘সম্পর্কে আমার অবদান কতটা মূল্য পাচ্ছে’ এই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। গটম্যান আরও বলেন, দীর্ঘদিনের সম্পর্কে যদি অর্থ নিয়ে আগে থেকে স্পষ্টভাবে কথা না বলেন। কোন খরচ কে দেবেন, যৌথ না আলাদা অর্থব্যবস্থা হবে, ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনা কী। তাহলে ছোটখাটো বিষয়ও পরে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধে পরিণত হতে পারে।  

অর্থাৎ, ডেটে বিল কে দিচ্ছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে কেন দিচ্ছেন।

যত্ন মানেই বড় অঙ্কের খরচ নয়

কারও প্রতি যত্ন দেখাতে দামি রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে মোটা অঙ্কের বিল দেওয়া জরুরি নয়। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে একটি ছোট ক্যাফে বেছে নিয়ে খাবারের বিল দেওয়া থেকেও প্রকাশ পেতে পারে একই আন্তরিকতা। ড. জন গটম্যানের ব্যাখ্যায়, ‘রেস্তোরাঁর বিল হয়তো কয়েক হাজার টাকার, কিন্তু সেটি নিয়ে অস্বস্তির পেছনে থাকতে পারে সম্পর্কের দায়িত্ব, যত্ন ও সমতার বড় প্রশ্ন।’ এখানে মূল বিষয় টাকা নয়, বরং মনোভাবই প্রাধান্য পায়।

বিজ্ঞাপন

‘সমান’ মানেই কি সবকিছু অর্ধেক-অর্ধেক?

আধুনিক সম্পর্কে সমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমতা মানেই প্রতিটি বিষয়কে একেবারে অর্ধেক করে ভাগ করে নেওয়া, এমনটা নয়। একজন হয়তো ডিনারের বিল দিচ্ছেন, অন্যজন হয়তো পরের দিন সিনেমার টিকিট কিনছেন। কেউ হয়তো ছুটির পরিকল্পনা করছেন, অন্যজন সামলাচ্ছেন যাতায়াত বা অন্য কোনো খরচ।
সম্পর্কে অবদান সব সময় একইভাবে মাপা যায় না। তাই শুধু কে কত টাকা দিলেন, সেটি দিয়ে সম্পর্কের ভারসাম্য বিচার করা অনেক সময় ভুল হতে পারে।

টাকার বাইরেও থাকে অনেক ‘অদৃশ্য’ অবদান

একটি সম্পর্কে কে বেশি টাকা দিলেন, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে কে সম্পর্কটিকে ধরে রাখার জন্য কতটা মানসিক শ্রম দিচ্ছেন। কে গুরুত্বপূর্ণ তারিখ মনে রাখছেন, কে পরিকল্পনা করছেন, কার মাথায় সঙ্গীর প্রয়োজনগুলো আগে আসছে, কে পরিবার ও সম্পর্কের নানা বিষয় সামলাচ্ছেন, এসব কাজের কোনো বিল তৈরি হয় না।

বিশেষ করে নারীরা অনেক সম্পর্কেই এই ধরনের মানসিক ও অদৃশ্য দায়িত্বের বড় অংশ বহন করেন। ফলে শুধুই টাকার হিসাবে সম্পর্কের অবদান মাপা কখনোই পুরো ছবিটা দেখায় না।

দীর্ঘ সম্পর্কে অর্থের নিয়মটা হতে পারে দুজনের মতো

প্রথম ডেট আর দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক, দুই জায়গায় অর্থের সমীকরণ এক হওয়া জরুরি নয়। বাড়িভাড়া, ঋণের কিস্তি, সন্তান, সঞ্চয়, বিনিয়োগ কিংবা সংসারের খরচ এসব ক্ষেত্রে প্রত্যেক দম্পতির নিজেদের জন্য সুবিধাজনক আর্থিক ব্যবস্থা ঠিক করা দরকার। কেউ সমান ভাগে খরচ করতে পারেন, কেউ আয় অনুযায়ী ভাগ করতে পারেন।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিদ্ধান্তটি যেন দুজনের সম্মতিতে হয় এবং কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রথম ডেটে তাহলে কে বিল দেবেন?

আপনি কাউকে ডেটে আমন্ত্রণ জানালে নিজের সামর্থ্যের মধ্যে জায়গা বেছে নিয়ে বিল দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন। এর অর্থ এই নয় যে অপর ব্যক্তি নিজে টাকা দিতে পারেন না। বরং এটি হতে পারে আতিথেয়তার একটি স্বাভাবিক প্রকাশ। একই সঙ্গে, বিল দেওয়ার বিনিময়ে কোনো প্রত্যাশা তৈরি করাও উচিত নয়। কারণ কাউকে খাওয়ানো কখনোই কোনো কিছু পাওয়ার ‘দাম’ হতে পারে না।

২০২৫ সালের জার্নাল অব প্র্যাগমেটিকস-এ প্রকাশিত অ্যান ব্যরন-এর গবেষণায় যুক্তরাজ্য ও জার্মানির ‘ফার্স্ট ডেট’ অনুষ্ঠানগুলোর প্রথম ডেটের বিল পরিশোধের কথোপকথন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ‘আমি বিলটা দিচ্ছি’ ধরনের সরাসরি প্রস্তাব এবং ‘খরচ ভাগ করি’ ধরনের প্রস্তাবের মধ্যেও লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক পরিচয় ও প্রত্যাশার ছাপ দেখা যায়।

অর্থাৎ, বিল দেওয়ার মুহূর্তটি নিছক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; কে আগে অফার করছেন, কে ভাগ করার কথা বলছেন সেই কথোপকথনও সামাজিক ভূমিকা প্রকাশ করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত আসল বিষয়টা টাকা নয়

একটি সম্পর্কের সৌন্দর্য অনেক সময় বড় বড় ঘোষণায় নয়, ছোট ছোট আচরণে প্রকাশ পায়। রেস্তোরাঁর বিলও তেমনই একটি মুহূর্ত। কেউ পুরো বিল দিলেন, কেউ অর্ধেক দিলেন, আবার কোনো দিন একজন আর কোনো দিন অন্যজন সবই স্বাভাবিক হতে পারে, যতক্ষণ সেখানে থাকে সম্মান, স্বাচ্ছন্দ্য এবং পারস্পরিক ইচ্ছা।

কারণ সুস্থ সম্পর্কে সমতা মানে সবকিছু হুবহু সমান ভাগে ভাগ করা নয়। কখনো একজন একটু বেশি দেবেন, অন্যজন অন্যভাবে অবদান রাখবেন তবুও দুজনই সমান গুরুত্বপূর্ণ থাকবেন।

সূত্র: হেলথ লাইন ডটকম

ছবি: এআই

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ৩৬
বিজ্ঞাপন