
রিসের মা জানতেন, তাঁর ছেলে সাধারণ কোনো শিশু নয়। সে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, যার জীবনে একসঙ্গে এসেছে অটিজম, এপিলেপসি, টুরেটস সিনড্রোম, ভার্বাল টিকস, সেন্সরি সমস্যা, হে ফিভার ও লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি বা শেখার অসুবিধা। তবু এত কিছুর মধ্যেও রিস নিজের জীবনকে যতটা সম্ভব ইতিবাচক ও আনন্দময় করে বাঁচতে চায়।


রিসের বয়স এখন ১৬। সে একজন শিশুলেখক, তার প্রকাশিত বই আছে বেশ কয়েকটা। মূলধারার কলেজে সে পড়ে। গান শেখে, কারাতে শেখে, টি-শার্ট ডিজাইন করে। গেল বছর সে ইন্সপিরেশনাল হিরো ক্যাটাগরিতে ট্রু লিটল হিরো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। অথচ এই সাফল্যের পথ মোটেই সহজ ছিল না।
রিস যখন মাত্র আড়াই বছর বয়সী, তখন অটিজমের কারণে সে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ নন-ভার্বাল, নিজেকে গুটিয়ে নেয় নিজের ভেতরে। ৩ থেকে ১০ বছরের মধ্যে একের পর এক রোগ নির্ণয় হতে থাকে। চিকিৎসকেরা তখন রিসের মাকে বলেছিলেন, কোনো আশা নেই। এত রোগ নিয়ে সে আদৌ কত দিন বাঁচবে, সেটাও নিশ্চিত নয়।
একজন শিক্ষক তো বলেই বসেছিলেন, রিসের কাছ থেকে কিছুই আশা না করতে, বাড়িতে তাকে ‘পোষা কুকুরের মতো’ রাখতে। এই কথাগুলো রিসের মাকে ভেঙে দিয়েছিল।

সেই সময় তিনি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে কাজ করতেন। নিজের একটি প্রাইভেট নিউট্রিশন প্র্যাকটিস ছিল। পাশাপাশি পিএইচডি করছিলেন। অটিজম সম্পর্কে তাঁর তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু খুব দ্রুত সবকিছু বদলে গেল।
রিসের সেন্সরি সমস্যা ছিল ভয়াবহ। সে কাপড় পরতে পারত না। জুতা পরা অসম্ভব ছিল। ঠিকমতো খেতে পারত না। রাতে ঘুম হতো না। প্রতি এক ঘণ্টা ১৮ মিনিট পরপর ঘুম ভেঙে যেত। সে অনেক সময় বাড়ি থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেত। এরপর তাকে খুঁজে পেতে বহুবার পুলিশের সাহায্য নিতে হয়েছে। টয়লেট ট্রেনিং করাতেই লেগে গিয়েছিল বছরের পর বছর। প্রতিটি দিন ছিল একেকটা যুদ্ধ।
২০২০ সালে কোভিড লকডাউনের সময় রিসের জন্মদিনে কেউ আসতে পারেনি। কোনো বন্ধু না, কোনো অতিথি না—শুধু নিঃশব্দতা। সেই দিন রিস আরও ভেঙে পড়ে। সে ছোট বয়সেই বিষণ্ন হয়ে পড়ে, এমনকি নিজেকে আঘাত করার চেষ্টাও করেছিল। সেই মুহূর্তে রিসের মা সিদ্ধান্ত নেন—কিছু একটা বদলাতে হবে।

এরপর তিনি রিসকে নিজের অনুভূতি লিখতে উৎসাহ দেন। কিন্তু রিসের ডিজপ্রাক্সিয়া থাকায় লেখা ছিল তার জন্য ভীষণ কষ্টকর। কলম ধরা যেন পাহাড় টানার মতো। তাই তাঁরা নিজেদের মতো করে একটি পথ খুঁজে নেন। রিস যখন লিখত, তার মা বারবার একই গান গাইতেন—নরমভাবে, ছন্দে। তারপর আরেকটা গান।
সেখান থেকেই জন্ম নেয় হেনরি। হেনরি একটি নন-ভার্বাল অটিস্টিক ছেলে, যার কোনো বন্ধু নেই—শুধু দুজন সঙ্গী আছে: মিস্টার স্পাইডার আর জেফি দ্য ক্যাট। হেনরির গল্পের ভেতর দিয়েই রিস নিজের কথা বলতে শুরু করে। লেখা হয়ে ওঠে তার নিরাপদ জায়গা। তার ভালোবাসা। তার শক্তি।

রিস এখন প্রায় প্রতিদিনই লেখে। তার প্রথম বই ‘হেনরি’জ নিউ ফ্রেন্ড মিস্টার স্পাইডার প্রকাশ করে অ্যামাজন। এরপর আসে ‘হেনরি’জ ক্রিসমাস উইথ ফ্রেন্ডস’ এই ধারায় এসেছে আরও দুটি বই: ‘হেনরি দ্য সুপার হিরো’ এবং ‘হেনরি অ্যান্ড হিজ ফ্রেন্ডস আর অন সামার হলিডে’।
সে ইতিমধ্যে হেনরি সিরিজের পঞ্চম বইটিও লেখা শেষ করেছে। এই গল্পগুলো শুধুই কল্পনা নয়। এগুলো রিসের নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি।
এ ছাড়া রিস একটি বই লিখেছে কম্পিউটার ভাইরাস ও তা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় নিয়ে। আরেকটি বই ‘রিস’জ ল্যান্ড’, যেখানে সে এমন এক স্বপ্নের জগৎ কল্পনা করেছে—যেখানে শিশুরাই দেশটি শাসন করে।

নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সে পিয়ানো বাজায়, রান্না করতে পারে, কারাতে শেখে। এমন নানা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকে রিস যে বার্তাটি সবাইকে দেয়, তা খুব সহজ কিন্তু শক্তিশালী—‘আমি যেমন আছি, তেমনই যথেষ্ট।’ সে অনেকগুলো পডকাস্ট ইন্টারভিউও দিয়েছে।

রিস পড়াশোনা করেছে ইংল্যান্ডের একটি স্পেশাল নিডস স্কুলে। এখন সে একটি মূলধারার কলেজে পড়ছে। রিসের শিক্ষকেরা তার অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা সম্পর্কে জেনে তাকে ট্রু লিটল হিরো অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত করেন।
২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর রিস এই পুরস্কার গ্রহণ করে। এই খবর যুক্তরাজ্যের মূলধারার খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে।
রিস তার মায়ের সঙ্গেই থাকে। ভবিষ্যতে সে কম্পিউটার অ্যানিমেশন পড়তে চায়।
এই গল্প এখন ইতিবাচক শোনালেও পথটা ছিল ভয়ংকর কঠিন। রিসের ব্যবহারের কারণে তার বাবার সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্ক ভেঙে যায়। একসময় তাঁরা গৃহহীন হয়ে পড়েন এবং ১৬ মাস একটি উইমেনস রেফিউজে থাকতে বাধ্য হন।

তার মা চাকরি ও পিএইচডির পড়াশোনা—সবকিছু ছেড়ে দেন। চরম মানসিক চাপের মধ্যে তিনি একবার নিজের জীবন শেষ করার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু তিনি মারা যাননি। বরং সেই মুহূর্তে তিনি এক অদ্ভুত শক্তি অনুভব করেন—যা তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে।
তিনি নিজের পরিচয় বদলে নেন। উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী থেকে তিনি হয়ে ওঠেন—শুধু রিসের মা। আর সেটাই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
তিনি রিসের খাবার পুরোপুরি বদলে দেন—সব ঘরে তৈরি। নিজের মতো করে অঙ্ক, হিসাব-নিকাশ, রান্না করা, পরিষ্কার করা শেখান। আজ রিস এখন সবকিছুই পারে। শুধু এপিলেপসি অ্যাটাক করলে সে সময় সে অসহায় হয়ে পড়ে। তখন তার মা থেরাপির মাধ্যমে তাকে আবার শান্ত করেন।

রিসের জন্য তিনি নিজেও প্রশিক্ষণ নেন নিউট্রিশন, কাইনেসিওলজি, ট্রমা রিলিজ, আয়ুর্বেদিক লাইফস্টাইল ও মার্মা ম্যাসাজ। তিনি নিজেও একজন লেখক। অটিজম ও গাট হেলথ নিয়ে একটি বই লিখেছেন। লেখালেখি যেন তাঁদের রক্তে—তাঁর মায়ের প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকার বইমেলায়, যখন তার বয়স মাত্র ১৭। এই মা ও ছেলে তাদের সবচেয়ে অন্ধকার সময়কে পেছনে ফেলে জীবনে আলোকিত করতে সক্ষম হয়েছে।

এই গল্প সবাইকে জানানোর কারণ আর কিছুই নয়, হয়তো কোনো মা আশা পাবেন। কোনো অভিভাবক হয়তো আর কোনো দিন কোনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে অবহেলা করবেন না।
লেখক: রিসের মা’ এছাড়া তিনি একাধারে নেচারোপ্যাথিক ডাক্তার, পুষ্টিবিদ, কিনেজিওলজিস্ট, ট্রমা রিলিজ থেরাপিস্ট, অটিজম স্পেশালিস্ট, মাইন্ড সেট ট্রেইনার।
ছবি: লেখক