
বাংলাদেশের ৭০০ কেজি ওজনের অ্যালবিনো মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ভাইরাল হয়ে উঠেছে। অ্যালবিনো মানে আসলে কী? এর অর্থ, মহিষটির শরীরে মেলানিনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে এর ত্বক গোলাপি আভাযুক্ত, শরীরের লোম সোনালি ব্লন্ড এবং শিংয়ের মাঝখানে রয়েছে উজ্জ্বল সোনালি-স্বর্ণাভ লম্বা চুলের মতো একটি বিশেষ গুচ্ছ আছে। এই স্বতন্ত্র সোনালি চুলের কারণেই মালিকেরা মজা করে মহিষটির নাম দেন “ডোনাল্ড ট্রাম্প”, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচিত হেয়ারস্টাইলের সঙ্গে মিল রয়েছে বলে মনে করা হয়।

মহিষটির ভিডিও টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। লাখো মানুষ এর চেহারার সঙ্গে মার্কিন রাজনীতিক ডোনাল্ড ট্রাম্পের অদ্ভুত মিল খুঁজে পান। ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জের রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে বড় হওয়া মহিষটিকে দেখতে প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী, পরিবার ও কনটেন্ট নির্মাতা ভিড় জমাতেন। অনেকে শুধু এর সঙ্গে সেলফি তুলতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেখানে যান। এবার ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য মহিষটিকে প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে ব্যাপক জনআগ্রহ ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকার এর বিক্রি ও কোরবানি বন্ধ করে দেয় এবং পরে স্থায়ীভাবে জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা করে।
অ্যালবিনো মহিষ কি বিশ্বজুড়ে পালন করা হয়?
সাধারণভাবে, অ্যালবিনিজম অত্যন্ত বিরল একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য হওয়ায় এসব প্রাণীর জন্ম সত্যিকার অর্থে আকস্মিকভাবেই ঘটে, ইচ্ছাকৃত প্রজননের মাধ্যমে নয়। অ্যালবিনো বাছুর প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতে হলে বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকেই পরিবর্তিত রিসেসিভ জিন পেতে হয়। ন্যাশনাল বাফেলো অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, স্বাভাবিকভাবে একটি অ্যালবিনো বা সম্পূর্ণ সাদা গবাদি পশুর জন্মের সম্ভাবনা ১ কোটিতে ১টিরও কম হতে পারে। তবে গোলাপি বা সাদা রং ও ব্লন্ড লোমের কারণে এর প্রতি আলাদা আগ্রহ থাকে ক্রেতাদের। তাই বেশ কিছুদিন ধরেই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অ্যালবিনো মহিষ ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রিড করা হয় ও পালন করা হয় কিছু কিছু খামারে। বিশেষ করে কোরবানির সময়ই এগুলোর চাহিদা থাকে।

বলা হয়ে থাকে, এগুলো আমেরিকান ব্রিড। তবে অ্যালবিনো প্রাণীকে সুস্থ রাখতে বিশেষ যত্ন লাগে। যেমন বাংলাদেশে ভাইরাল হওয়া অ্যালবিনো মহিষটিকে গরম থেকে রক্ষা করতে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখা, বিশেষ খাবার দেওয়া এবং দিনে কয়েকবার ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করানো হতো। এ ধরনের ব্যয়বহুল পরিচর্যা সাধারণ খামারের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। কিছু সংস্কৃতিতে সাদা বা অ্যালবিনো গবাদিপশুকে পবিত্র মনে করা হয়। উদাহরণ হিসেবে, নেটিভ আমেরিকানদের কাছে “হোয়াইট বাফেলো” শান্তি সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। থাইল্যান্ডসহ কিছু অঞ্চলে “পিঙ্ক বাফেলো” তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
অ্যালবিনিজম আসলে কী? মানুষ কি অ্যালবিনো হয়?
অ্যালবিনিজম হলো একটি বিরল, বংশগত ও সংক্রামক নয় এমন জিনগত অবস্থা, যেখানে শরীরে মেলানিন নামের রঞ্জক পদার্থের ঘাটতি বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি থাকে। মেলানিনই মানুষের ত্বক, চুল ও চোখের রং নির্ধারণ করে। বিশ্বজুড়ে প্রতি প্রায় ২০ হাজার মানুষের মধ্যে একজন এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়। এটি যেকোনো জাতি, বর্ণ বা অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই দেখা যেতে পারে।

অ্যালবিনিজমের ধরন
অকুলোকিউটেনিয়াস অ্যালবিনিজম (OCA):
সবচেয়ে সাধারণ ধরন, যা ত্বক, চুল ও চোখকে প্রভাবিত করে।
অকুলার অ্যালবিনিজম (OA):
এটি তুলনামূলক বিরল এবং প্রধানত চোখকে প্রভাবিত করে।

দৃষ্টিজনিত সমস্যা
অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় সবারই কমবেশি দৃষ্টিসমস্যা থাকে। চোখ দ্রুত নড়াচড়া করা (নিস্ট্যাগমাস), তীব্র আলোতে সমস্যা (ফটোফোবিয়া), দূরের বা কাছের জিনিস ঝাপসা দেখা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
ত্বকের ঝুঁকি
মেলানিন না থাকায় ত্বক সহজেই রোদে পুড়ে যায় এবং ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এজন্য নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার, সুরক্ষামূলক পোশাক পরা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
চিকিৎসাগত সমস্যার পাশাপাশি অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত মানুষকে অনেক সময় সামাজিক কুসংস্কার, বৈষম্য ও ভুল ধারণার মুখোমুখি হতে হয়। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতা ও ইতিবাচক পরিবর্তন
বর্তমানে শিক্ষা, সচেতনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সংগীত, ফ্যাশন, আইনসহ নানা ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করছেন। যেমন চাইনিজ ফ্যাশন মডেল কনি চিউ একজন অ্যালবিনো মানুষ। আবার মার্কিন মডেল ডিয়ান্ড্রা ফরেস্ট অ্যালবিনো মানুষদের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে কাজ করেন। এদিকে আমেরিকান অভিনেতা শন রসের মতো অ্যালবিনো তারকারা এখন ইনক্লুসিভিটির বার্তা দিচ্ছেন। তাঁদের সাফল্য উদযাপন সমাজকে আরও মানবিক ও সচেতন হতে সাহায্য করছে।
সূত্র: উইকিপিডিয়া, হেলথলাইন
ছবি: ইন্সটাগ্রাম