
২৩ মে শনিবার সকাল। জ্যৈষ্ঠের রোদ তখনো পুরোপুরি তীব্র হয়ে ওঠেনি, কিন্তু হাতিরঝিলের বাতাসে ছিল ক্লান্তি আর অর্জনের এক অদ্ভুত মিশেল। ২১ কিলোমিটার হাফ ম্যারাথন শেষ করে আমরা তখন অ্যাম্ফিথিয়েটারের সিঁড়িতে বসে আছি। ঘামে ভেজা টি-শার্ট, ক্লান্ত পা, হাতে মেডেল — তবু সবার চোখে একধরনের উচ্ছ্বাস। কারণ, সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আসছেন প্রধানমন্ত্রী কন্যা জাইমা রহমান।

এটা কোনো রাজনৈতিক আয়োজন ছিল না। বিশ্বের ৩৮টি দেশে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া 'ওয়ান রান' ইভেন্টের অংশ ছিল ঢাকার এ আয়োজন। রাশিয়ান ফেডারেশনের উদ্যোগে গতকাল এই দৌড়ে অংশ নিয়েছিলেন ৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সী দৌড়বিদেরা। কেউ ৫, কেউ ১০, কেউবা ২১ কিলোমিটারব্যাপী দৌড়েছেন। আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত।
সকাল পৌনে নয়টার দিকে এলেন জাইমা রহমান। সাধারণত ক্ষমতার খুব কাছে থাকা মানুষদের চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল থাকে— কড়া নিরাপত্তা, দূরত্ব, নিয়ন্ত্রিত আচরণ। কিন্তু এদিনের দৃশ্যটা ছিল একেবারেই অন্য রকম।

মঞ্চে বিশেষ অতিথিদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা ছিল; কিন্তু তিনি সোজা নেমে এলেন রানারদের মাঝে। সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে এসে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কত কিলো রান করেছেন? – আমি বললাম, ২১ কিলোমিটার। জাইমা রহমান অবাক হয়ে হেসে বললেন, —আমার সর্বোচ্চ দৌড় পাঁচ কিলো! তারপর জানতে চাইলেন, 'এটার জন্য কয় রাউন্ড দিতে হয়?'
বললাম, পুরো হাতিরঝিল তিন চক্কর। সেখান থেকেই শুরু হলো গল্প।
সিএসএফের নিরাপত্তা সদস্যরা চারপাশে থাকলেও জাইমা রহমান এসে ঠিক আমাদের পাশেই বসলেন। খুব মনোযোগ নিয়ে শুনছিলেন রানিংয়ের গল্প। আলট্রা রান কী, পাহাড়ি ট্রেইল কেমন, বান্দরবান বা কক্সবাজারে লং ডিস্ট্যান্স রান কীভাবে হয়—সবকিছু নিয়েই তাঁর আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
যখন বললাম বিদেশ থেকেও অনেকে বাংলাদেশে ট্রেইল রান করতে আসে, তখন তাঁর চোখে সত্যিকারের উচ্ছ্বাস দেখা গেল।

জাইমা রহমান বললেন, 'ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তো পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ দৌড়াতে যায়। আমরাও কিন্তু বাংলাদেশে এমন কিছু করতে পারি।'
তারপর হাসতে হাসতেই বললেন, 'আমি দৌড়াব আপনাদের সঙ্গে। দরকার হলে এখানেই প্র্যাকটিস করব।'
কথাগুলো ছিল একদম স্বাভাবিক আড্ডার মতো। তিনি শুধু কথা বলেন না, শোনেনও। আশপাশের মানুষদের কাছ থেকে তথ্য নেন, মতামত জানতে চান, আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করেন।
গল্পের এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করি, আপনি কি ওয়ার্কআউট করেন?
তিনি বললেন, স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করেন, সঙ্গে সাঁতারও। খাবারের ব্যাপারে ক্লিন ফুড পছন্দ করেন। ভাজাপোড়া খুব একটা ভালো লাগে না, ফল খেতে বেশি পছন্দ।
কথা বলতে বলতেই একসময় উঠে এল মানসিক চাপের প্রসঙ্গ। খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, 'রামিসার ঘটনার পর আমি তো দুই রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। বাবা ওদের বাসায় গিয়েছিল। এ ঘটনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।'
জাইমা পুরো সময়টায় একবারও রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেননি। কোনো স্লোগান নয়, কোনো কৌশলী বক্তব্য নয়। বরং আর পাঁচজন সচেতন মানুষের মতোই কথা বলছিলেন।

সাদা পোশাক পরে এসেছিলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলাম, 'সাদা কি আপনার প্রিয় রং?'
হেসে বললেন, 'ঠিক তা নয়। কিছুদিন আগে একজন বলেছিলেন যে আমি নীল জামা বেশি পরি। আসলে সব রংই পরি, তবে হালকা শেড ভালো লাগে।'
মানুষের সঙ্গে এত সহজে মিশে যাওয়ার রহস্য জানতে চাইলে বললেন, 'আমার গল্প করতে ভালো লাগে। মানুষের কথা শুনতে ভালো লাগে।'
এটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে এখনো মেয়েদের এন্ডিওরেন্স স্পোর্টস নিয়ে নানা সামাজিক ট্যাবু আছে। অনেক শিক্ষিত পরিবারেও মেয়েদের লং ডিস্ট্যান্স রান, ট্রেইল রান বা আলট্রা রানকে 'বাহুল্য' হিসেবে দেখা হয়। সেই প্রসঙ্গে তিনি বললেন, 'আমি এই সোশ্যাল ট্যাবুগুলো নিয়ে কাজ করতে চাই। মানুষের ভ্রান্ত ধারণা বদলানো জরুরি।'

কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, তিনি শুধু একজন পরিচিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য নন; বরং সমাজের পরিবর্তন নিয়ে ভাবেন, এমন একজন তরুণী।
আরেকটা বিষয় খুব চোখে পড়ল, ভারী মেকআপ, কৃত্রিমতা বা অতিরিক্ত প্রটোকলে নিজেকে ঢেকে রাখার কোনো চেষ্টা ছিল না তাঁর মধ্যে। বরং পুরো ব্যাপারটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
শিশুদের ক্যাটাগরিতে যারা পুরস্কার পেয়েছে, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। কেউ এগিয়ে এলে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানালেন। জাইমা বললেন, সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার শিক্ষাটা পরিবার থেকেই পেয়েছেন।
আড্ডার ফাঁকে ছবি তুলতে চাইলে হাসিমুখে আমাদের সঙ্গে সেলফি তুললেন।
এর মধ্যে সূর্য অনেকটা ওপরে উঠে গেছে। জ্যৈষ্ঠের রোদ তখন মাথার ওপর আগুন ঢালছে। পেছন থেকে নিরাপত্তা দলের একজন বললেন, 'ম্যাডাম, ক্যাপটা পরবেন? অনেক রোদ।'
জাইমা রহমান হেসে বললেন, 'আমার রোদ ভালো লাগে।'
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন, 'লন্ডনে সব সময় গ্লুমি ওয়েদারে ছিলাম। বাংলাদেশের এই রোদটা আমার খুব ভালো লাগে।'
সেই মুহূর্তটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল। কারণ, এ দেশে আমরা প্রায়ই নারীদের নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক সংকীর্ণতা আর মানসিক নিপীড়নের গল্প শুনি। সেখানে একজন তরুণ নারীকে দেখা গেল – যিনি স্পোর্টস নিয়ে কথা বলেন, মানুষের পাশে বসেন, মন দিয়ে শোনেন, সমাজ বদলানোর কথা ভাবেন।
হয়তো পরিবর্তন খুব দ্রুত আসে না; কিন্তু কোনো কোনো মানুষকে দেখে মনে হয় — আশা এখনো বেঁচে আছে।
জাইমা রহমানকে দেখে সেটাই মনে হয়েছিল।
ছবি: লেখক