
বিবাহবিচ্ছেদ কখনোই শুধু দুটি মানুষের সম্পর্কের সমাপ্তি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘদিনের আবেগ-অভিমান। সম্পর্ক ভাঙার পর অনেকেই মানসিক ও আর্থিক চাপে পড়েন। আইনজীবীর খরচ, আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়া কিংবা আইনি বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতা তাঁদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে। এই জায়গায় সহজলভ্য সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
কয়েকটি প্রশ্ন লিখে দিলেই চ্যাটবট সাজিয়ে দিচ্ছে আইনি ব্যাখ্যা, সম্ভাব্য যুক্তি ও করণীয়। কেউ জানতে চাইছেন, বিচ্ছেদের পর কত টাকা খোরপোষ দিতে হবে; কেউ জানতে চাইছেন, সন্তান কার কাছে থাকবে; আবার কেউ নিজের আইনজীবীর পরামর্শ যাচাই করতেও এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, ব্যবহারকারীর বলা ঘটনাকেই সম্পূর্ণ সত্য ধরে নিয়ে উত্তর তৈরি করে এআই। ফলে আইনের প্রকৃত অবস্থান, বিপক্ষের বক্তব্য কিংবা মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যের আইন সংস্কারবিষয়ক সংস্থা জাস্টিস ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ফেয়ারনেস ল্যাবের ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই বছরে আইনি বিরোধে জড়ানো ১ হাজার ৪২৮ জনের মধ্যে ২৩৩ জন এআই চ্যাটবটের সাহায্য নিয়েছেন। জরিপে অংশ নিয়েছিলেন মোট ৩ হাজার ২৮৭ জন। তাঁরা শুধু আইনি পরামর্শই নয়, কঠিন আইনি ভাষা বোঝা, আইনজীবীর পরামর্শ যাচাই, অভিযোগপত্র বা ইমেইল তৈরি এবং মানসিক আশ্বাস পাওয়ার জন্যও এআই ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ, আইনি সহায়তার প্রয়োজন মেটাতে চ্যাটবটের ওপর নির্ভরতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পারিবারিক আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কর্ডেল অ্যান্ড কর্ডেলের ২০২৬ সালের একটি জরিপে অংশ নেন ১৩৩ জন আইনজীবী। তাঁদের ৮০ শতাংশ জানিয়েছেন, মক্কেলদের কাছ থেকে এআই দিয়ে তৈরি করা চিঠি, মামলার আবেদনের খসড়া কিংবা আইনি কৌশলসংক্রান্ত পরামর্শ পেয়েছেন। কারও কারও পাঠানো সংশোধনীর তালিকা এতটাই দীর্ঘ ও জটিল ছিল যে, সেগুলো নিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

কানাডার টরন্টোর পারিবারিক আইনজীবী স্টিভেন বেনমরের অভিজ্ঞতাও তেমন। সম্প্রতি এক মক্কেলের জন্য বিয়ের আগে করা চুক্তি বা প্রিনাপচুয়াল এগ্রিমেন্ট তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরে সেই মক্কেল এআইয়ের সাহায্যে তৈরি ১৩ দফা সংশোধনী পাঠান। সংশোধনীগুলোর কিছু বিষয় এতটাই জটিল ছিল যে, প্রতিটি ভুল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইনজীবীর বাড়তি সময় ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বেনমরের মতে, একজন মানব বিশেষজ্ঞকে বসিয়ে একটি রোবটের দেওয়া ভুল ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক করানো মানে মক্কেলের অযথা অর্থ খরচ করা। তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, এআইয়ের দেওয়া প্রতিটি পরামর্শ যে আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার লোগান বার্নসের অভিজ্ঞতা আরও চমকপ্রদ। গত বছর তাঁর বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হলে তিনি একজন আইনজীবীকে ২ হাজার ৫০০ ডলার অগ্রিম দিয়েছিলেন। পরে স্বামী-স্ত্রী আবার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। সেই সময় তাঁর স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে মন্টানায় পরিবারের কাছে চলে যান। পুনর্মিলনের চেষ্টা ব্যর্থ হলে সন্তানদের হেফাজত নিয়ে বিরোধ শুরু হয়।

এবার আইনজীবীর জন্য প্রয়োজনীয় ৭ হাজার ডলারের বদলে তিনি মাসে ১৯.৯৯ ডলার খরচ করে চ্যাটজিপিটির সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এআই তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নিয়ম সম্পর্কে জানায়। সাধারণত কোনো শিশু একটি রাজ্যে ছয় মাস বসবাস করলে সেই রাজ্য তার হেফাজতসংক্রান্ত মামলার বিচারিক এখতিয়ার পেতে পারে। বার্নসের সন্তানরা মন্টানায় ছয় মাসের কম সময় থাকায় তিনি মামলাটি জর্জিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি সাজান।
এআইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বিচারকের কাছে চিঠি পাঠান। শুনানিতে বিচারক তাঁর যুক্তির ভুল ধরিয়ে দেন। কারণ, ওই আইনে জরুরি পরিস্থিতিসহ কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। বিশেষ করে বার্নস নিজেই জরুরি ভিত্তিতে আবেদনের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত বিচারককে জানাতে হয়, চ্যাটজিপিটি তাঁকে আইনের প্রাথমিক ধারণা দিলেও আইনের ব্যাখ্যা ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার প্রয়োগ বোঝাতে পারেনি। অর্থাৎ, সাধারণ একটি আইনি নিয়ম জানা আর নিজের মামলায় সেই নিয়ম কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা বোঝা এক বিষয় নয়।
শুধু সন্তানের হেফাজত নয়, খোরপোষের হিসাবেও এআইয়ের পরামর্শ বিপদ ডেকে আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের একজন ব্যবসায়ীর ঘটনা তার উদাহরণ। বিবাহবিচ্ছেদের সময় নিজের প্রতিষ্ঠানের আয় বিবেচনায় তিনি সাবেক স্ত্রীকে বড় অঙ্কের খোরপোষ দিতে সম্মত হয়েছিলেন। কয়েক বছর পর ব্যবসা থেকে আয় কমে গেলে তিনি একটি চ্যাটবটকে জিজ্ঞাসা করেন, খোরপোষের পরিমাণ কমানোর আবেদন করলে আদালতে তাঁর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কেমন।

চ্যাটবট তাঁকে প্রায় নিশ্চিত জয়ের আশ্বাস দেয়। কিন্তু এআই তাঁর প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণী, ব্যক্তিগত ব্যয় কিংবা ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চায়নি। আয় কমলেও তাঁর ব্যক্তিগত ব্যয় আগের মতোই ছিল। সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়েই এআই তাঁর বক্তব্যকে সত্য ধরে নিয়ে পরামর্শ দিয়েছিল।
চ্যাটবটের কৌশল অনুসরণ করে তিনি একজন আইনজীবী নিয়োগ করেন। কিন্তু আদালতে জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের নথি ব্যবহার করেই বিপক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেখান, তাঁর প্রকৃত আয় ততটা কমেনি। প্রায় এক বছর পর বিচারকও সেই যুক্তির সঙ্গে একমত হন।
পরে নতুন আইনজীবী নিয়োগের পর একজন ফরেনসিক হিসাবরক্ষক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। তাতে দেখা যায়, ব্যবসার অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিক্রির অর্থের বড় অংশই পরিচালন ব্যয়ে চলে গেছে। সাম্প্রতিক শুনানিতে বিচারক প্রাথমিকভাবে তাঁর আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন মেনে নিয়ে আপাতত খোরপোষের অর্থ পরিশোধ স্থগিত রাখেন।
যে মামলাকে এআই সহজ জয় বলে দেখিয়েছিল, সেটি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত দুটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় দুই বছর সময় ব্যয় করতে হয়েছে।
এআইয়ের তৈরি আইনি নথি এখন শুধু আইনজীবীদের বিরক্তির কারণ নয়, বিচারকদের জন্যও বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক আইনসংক্রান্ত ১৪৮টি আদালতের রায় ও আদেশে বিচারকেরা ভুয়া আইনি সূত্র কিংবা এআইয়ের তৈরি অন্য ভুল তথ্যের বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন বলে জানিয়েছেন ইউসি ল স্কুল সান ফ্রান্সিসকোর সহযোগী অধ্যাপক ড্যামিয়েন শার্লোতাঁ। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে ১০০টির বেশি ঘটনা ঘটেছে ২০২৬ সালেই।

বিষয়টি শুধু পারিবারিক আদালতেই সীমাবদ্ধ নয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল আদালতের অন্তত ১ হাজার ৩৯৫টি মামলায় এআইয়ের তৈরি ভুল বা অস্তিত্বহীন তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। কোথাও ভুয়া মামলার রেফারেন্স, কোথাও ভুল উদ্ধৃতি, আবার কোথাও অস্তিত্বহীন সাক্ষ্য ও বক্তব্য আদালতে জমা পড়েছে। এসব ঘটনায় আইনজীবীদের সতর্ক করা থেকে শুরু করে জরিমানা পর্যন্ত করা হয়েছে।
কানাডাতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলায় এক আইনজীবী চ্যাটজিপিটি দিয়ে তৈরি দুটি অস্তিত্বহীন মামলার উদ্ধৃতি আদালতে জমা দিয়েছিলেন। বিষয়টি সামনে আসার পর আদালত জানায়, জেনারেটিভ এআই কখনোই বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয় পেশাদার অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে না।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বিবাহবিচ্ছেদের একটি মামলায় নিজেই নিজের প্রতিনিধিত্ব করা এক ব্যক্তি এআইয়ের সাহায্যে অন্তত ১৪৫টি আবেদন জমা দিয়েছিলেন। পরে আপিল আদালতে পাঠান এআই দিয়ে তৈরি ৪৫ পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা এবং ৮৬৩ পৃষ্ঠার সংযুক্তি। ২০২৬ সালের মে মাসে আদালত নির্দেশ দেন, ভবিষ্যতে তাঁর কোনো নথি জমা দিতে হলে তাতে আইনজীবীর স্বাক্ষর থাকতে হবে।
এআই চ্যাটবটের বড় শক্তি হলো দ্রুত ও সাবলীলভাবে উত্তর তৈরি করা। কিন্তু এই সাবলীলতাই অনেক সময় এর দুর্বলতা আড়াল করে রাখে। কোনো বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলেও চ্যাটবট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দিতে পারে। কখনো অস্তিত্বহীন আইনের ধারা, ভুল মামলার রেফারেন্স কিংবা অন্য দেশের আইনকে প্রযোজ্য বলে উপস্থাপন করতে পারে। প্রযুক্তির ভাষায় এ ধরনের ভুল তথ্য তৈরির প্রবণতাকে বলা হয় ‘এআই হ্যালুসিনেশন’।

এ ছাড়া এআই অনেক সময় ব্যবহারকারীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়ার প্রবণতা দেখায়। ফলে কেউ যদি তাঁর সাবেক সঙ্গীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে চান, আদালতে তিনি কতটা সুবিধা পাবেন, চ্যাটবট তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে শক্তিশালী যুক্তি সাজিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বিপক্ষের বক্তব্য, প্রমাণ, আর্থিক নথি কিংবা ঘটনার অন্য কোনো দিক সে নিজে থেকে যাচাই করে না।
যুক্তরাজ্যের নাফিল্ড ফ্যামিলি জাস্টিস অবজারভেটরির ২০২৬ সালের গবেষণা প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষকেরা বলছেন, সাধারণ এআই চ্যাটবটগুলো নির্দিষ্ট দেশের পারিবারিক আইন বা বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তৈরি নয়। ফলে এগুলো ভুল, অসম্পূর্ণ কিংবা সম্পূর্ণ কাল্পনিক আইনি পরামর্শ দিতে পারে। এ ছাড়া এআইয়ের তথ্যভান্ডারে পশ্চিমা ও ইংরেজিভাষী দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর প্রভাবও বেশি। ফলে এক দেশের আইন অন্য দেশের পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করার ঝুঁকি থাকে।
বিবাহবিচ্ছেদের মতো বিষয়ে এই সমস্যা আরও গুরুতর। কারণ, এখানে একটি নির্দিষ্ট আইন জানলেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। সন্তানের বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি, মা-বাবার আর্থিক সামর্থ্য, নিরাপত্তা, আগের আদালতের আদেশ—সবকিছু বিবেচনা করতে হয়। একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রেও দেশ, অঞ্চল ও বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে।
বিচ্ছেদের মামলা মানেই অনেক ব্যক্তিগত তথ্যের আদান-প্রদান। আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, সন্তানের তথ্য, ব্যক্তিগত বার্তা, চিকিৎসার নথি কিংবা পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ—সবই মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

এসব নথি যাচাইয়ের জন্য অনেকে সরাসরি চ্যাটবটে আপলোড করেন। কিন্তু সব এআই প্ল্যাটফর্মে তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা এক রকম নয়। কোনো পাবলিক চ্যাটবটে দেওয়া তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিংবা অন্য কারও কাছে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা ব্যবহারকারীর জানা নাও থাকতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার লিগ্যাল এইড এনএসডব্লিউ স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে, এআইয়ের তৈরি তথ্য ভুল বা কাল্পনিক হতে পারে। এমনকি অন্য দেশের আইনকে নিজের দেশের আইন হিসেবেও দেখাতে পারে। আদালতের নথি তৈরি করার আগে প্রতিটি তথ্য, আইনের ধারা ও মামলার রেফারেন্স যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে সন্তানের পরিচয়, সুরক্ষিত ঠিকানা, চিকিৎসার তথ্য কিংবা গোপনীয় আর্থিক নথি সাধারণ এআই প্ল্যাটফর্মে শেয়ার না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সার্কিট অ্যান্ড ফ্যামিলি কোর্ট ২০২৬ সালে এআই ব্যবহারের বিষয়ে আলাদা প্র্যাকটিস ডিরেকশনও জারি করেছে। সেখানে শুধু আইনজীবী নন, নিজের মামলা নিজে পরিচালনা করা ব্যক্তিদেরও এআইয়ের ব্যবহার ও আদালতে জমা দেওয়া নথির যথার্থতার জন্য দায়ী করা হয়েছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য, হয়রানিমূলক আবেদন কিংবা অন্য পক্ষকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সতর্ক করা হয়েছে।
এআইয়ের ব্যবহারকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি আইনি প্রক্রিয়ার কিছু কাজ সহজ করতে পারে। কঠিন আইনি ভাষাকে সাধারণ ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া, প্রয়োজনীয় নথির তালিকা তৈরি, মামলার ঘটনাগুলো তারিখ অনুযায়ী সাজানো কিংবা আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার আগে প্রশ্ন তৈরি করার কাজে চ্যাটবট সহায়ক হতে পারে।

নাফিল্ডের গবেষণাতেও পারিবারিক আদালতের নথি পর্যালোচনা, তথ্যের সারাংশ তৈরি, অনুবাদ ও সহজ ভাষায় জটিল বিষয় বোঝানোর ক্ষেত্রে এআইয়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে গবেষকেরা সাধারণ চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করে আইনি পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
তাই এআই ব্যবহার করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। প্রথমত, নিজের দেশের বা অঞ্চলের আইন সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, চ্যাটবটের দেওয়া আইনের ধারা, মামলার রেফারেন্স ও তারিখ সরকারি বা নির্ভরযোগ্য আইনি সূত্র থেকে যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত ও গোপনীয় নথি আপলোড করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর আদালতে কোনো আবেদন জমা দেওয়া কিংবা সন্তানের হেফাজত, খোরপোষ ও সম্পত্তি ভাগাভাগির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিতে হবে।
বিচ্ছেদ এমনিতেই কঠিন একটি অভিজ্ঞতা। সেখানে তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেতে এআইয়ের তৈরি উত্তরকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে। চ্যাটবট হয়তো কয়েক সেকেন্ডে আপনার পক্ষে যুক্তি সাজিয়ে দেবে, কিন্তু সেই যুক্তি আইনের চোখে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব তার নয়। কারণ, এআই তথ্য দিতে পারে, প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু মানুষের সম্পর্ক, প্রমাণের সত্যতা ও আইনের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা মিলিয়ে বিচার করার দায়িত্ব এখনো মানুষেরই।
তথ্যসূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন, কর্ডেল অ্যান্ড কর্ডেলের জরিপ, জাস্টিসের যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা, নাফিল্ডের পারিবারিক বিচারব্যবস্থায় এআইবিষয়ক গবেষণা, রয়টার্সের আদালতে এআইয়ের ভুল নিয়ে প্রতিবেদন, অস্ট্রেলিয়ার পারিবারিক আদালতের নির্দেশনা ও লিগ্যাল এইড এনএসডব্লিউর সতর্কতা।