
কোরবানির ঈদ ঘিরে বাংলাদেশের হাটে-বাজারে প্রতিবছরই নানা ধরনের গরু, ষাঁড় কিংবা মহিষকে ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়। কখনো বিশাল আকৃতির কারণে, কখনো অদ্ভুত রঙের জন্য, আবার কখনো আচরণ বা চেহারার কারণে কোনো প্রাণী হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তবে এবারের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে নারায়ণগঞ্জের একটি অ্যালবিনো মহিষ, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।

মাথাজুড়ে সোনালি ঢেউ খেলানো চুল, ভারী গঠন আর চেহারার বিশেষ এক অভিব্যক্তির কারণে খামারের মালিক ও আশপাশের মানুষদের কাছে মহিষটির চেহারার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মহিষটির ছবি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয় এই ‘তারকা’ মহিষ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে মানুষের সঙ্গে কোনো গরু, মহিষ বা ষাঁড়ের চেহারার মিল কি সত্যিই থাকতে পারে?

মানুষের মস্তিষ্ক আসলে মুখ খোঁজে। বিজ্ঞান বলছে, এই ধরনের মিল খুঁজে পাওয়ার পেছনে কাজ করে মানুষের মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। মনোবিজ্ঞানে এর নাম প্যারাইডোলিয়া ( Pareidolia). প্যারাইডোলিয়া হলো এমন এক মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষ এলোমেলো কোনো আকার বা বস্তুর মধ্যে পরিচিত মুখ বা চেহারা খুঁজে পায়।
এই কারণেই মানুষ মেঘের মধ্যে কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুল কিংবা কবিগুরুর দাড়ি খুঁজে পায়। গাড়ির হেডলাইটকে চোখ মনে করে। চাঁদে মুখের অবয়ব কল্পনা করে। আবার কোনো প্রাণীর মুখে মানুষের মতো অভিব্যক্তি খুঁজে পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত দ্রুত মুখ শনাক্ত করতে পারে। চোখ, নাক, চোয়াল বা ঠোঁটের গঠনে সামান্য মিল পেলেই মস্তিষ্ক সেটিকে পরিচিত কোনো মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে।
কেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’-এর সঙ্গে মিল খুঁজে পেল মানুষ?
নারায়ণগঞ্জের সেই অ্যালবিনো মহিষটির মাথার সোনালি ঢেউখেলানো লোম অনেকের কাছেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচিত চুলের স্টাইলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

মানুষ সাধারণত কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মুখের মিল খুঁজে পায়—
চুল বা লোমের ধরন
চোখের আকৃতি
মুখের অভিব্যক্তি
কপালের গঠন
মুখের ভঙ্গি
মহিষটির ক্ষেত্রেও মূলত সেই সোনালি লোম আর মুখের অভিব্যক্তিই মানুষের মনে পরিচিত একটি চেহারার অনুভূতি তৈরি করেছে। এটি আসলে জৈবিক মিল নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্কের প্যাটার্ন শনাক্ত করার ক্ষমতার ফল।
মানুষ ও গরুর মধ্যে কিছু মৌলিক মিল থাকেই। বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষ ও গরু দুটোই স্তন্যপায়ী প্রাণী।গরু ও ওয়াটার বাফেলো তাই মুখের কিছু মৌলিক কাঠামোতে স্বাভাবিকভাবেই মিল দেখা যায়। যেমন—
দুটি চোখ
মাঝে নাক
নিচে মুখ ও চোয়াল
এই গঠনগত মিল অনেক সময় মানুষের মনে পরিচিতির অনুভূতি তৈরি করে।
সংস্কৃতিতেও প্রাণীর সঙ্গে মানুষের তুলনা নতুন নয়।
বাংলার গ্রামীণ সমাজে গরু, মহিষ বা ষাঁড় শুধু গবাদিপশু নয় এগুলো মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও জীবনের অংশ। তাই ভাষাতেও আমরা প্রাণীর বৈশিষ্ট্য দিয়ে মানুষকে বর্ণনা করি—
“ষাঁড়ের মতো শক্তিশালী”
“গরুর মতো শান্ত”
“মহিষের মতো জেদি”
এই তুলনাগুলো বৈজ্ঞানিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক প্রতীক।

নারায়ণগঞ্জের খামারে থাকা প্রায় দেড় হাজার পাউন্ড ওজনের এই অ্যালবিনো মহিষটি এখন ক্রেতার বাড়িতে। ঢাকার জিনজিরায়। তাকে দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন কৌতূহলী মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ শুধু একনজর দেখতেই দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন। মহিষটির মালিক জিয়া উদ্দিন মৃধা জানিয়েছেন, তাঁর ভাই মজা করেই প্রথম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামটি দেন। পরে সেই নামই ছড়িয়ে পড়ে সবার মুখে মুখে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক দর্শনার্থীবলেছেন, “সত্যিই মহিষটির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিল আছে।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই জনপ্রিয় মহিষটির পরিণতিও অন্য কুরবানির পশুর মতোই।
বিজ্ঞানীরা স্পষ্টভাবেই বলছেন, মানুষের সঙ্গে কোনো প্রাণীর চেহারার মিল থাকা মানে তাদের মধ্যে রহস্যময় কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মূলত—
মানুষের মস্তিষ্কের মুখ শনাক্ত করার প্রবণতা
পরিচিত প্যাটার্ন খুঁজে বের করার অভ্যাস
সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা
ছবি: ইন্সটাগ্রাম