আন্তর্জাতিক মা দিবস: পরিবার চালানোর মানসিক চাপ সবচেয়ে বেশি বহন করেন মা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মা দিবস আসলেই ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার কথা অনেক বলা হয়। কিন্তু মায়েদের এই অদৃশ্য মানসিক পরিশ্রমের বিষয়টি এখনো অনেক ক্ষেত্রেই থেকে যায় আলোচনার বাইরে। ইতালির মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইলেনা ভেত্তরেত্ত–এর ভাষায়, মেন্টাল লোড শুধু মাল্টিটাস্কিং নয়। এটি এমন এক অবিরাম মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে একজন মা একই সঙ্গে পরিবারের প্রয়োজন, সবার সময়সূচি, আবেগ এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে থাকেন। ২০২৬ এর জানুয়ারি মাসে শেষ হওয়া ‘মাদারস মেন্টাল লোড’ নামের গবেষণা নিয়ে তিনি বলেন, মায়েদের মানসিক চাপের সবচেয়ে বড় অংশ আসে ‘কগনিটিভ লেবার’ থেকে। অর্থাৎ পরিবারের সবকিছু নিয়ে আগে থেকেই চিন্তা করা, প্রস্তুতি নেওয়া ও আবেগগতভাবে সজাগ থাকা। পরিবারে দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি তৈরি না হলে এই চাপ কখনওই কমবে না।

অস্ট্রেলিয়ার সমাজবিজ্ঞানী লে রুপানের চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলেছেন, পরিবারের মানসিক পরিকল্পনার বড় অংশ এখনও মায়েদের কাঁধেই থেকে যায়। এমনকি যখন তারা কর্মজীবী বা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হন তখনও। তিনি এই অবস্থাকে ‘জেন্ডার কগনেটিভ স্টিকনেস’ নামে ব্যাখ্যা করেছেন, অর্থাৎ মানসিক দায়িত্ব একবার মায়ের ওপর পড়লে তা সহজে আর সরে না। একজন মা হয়তো বাইরে থেকে শান্তভাবে তার সারা দিনের কাজ চালিয়ে যান, কিন্তু তাঁর মাথার ভেতরে তখন চলতে থাকে অসংখ্য হিসাব। সন্তানের টিকা দেওয়ার তারিখ, আগামীকালের খাবারের মেনু, স্কুলের প্রজেক্ট, পরিবারের কার কী প্রয়োজন সবকিছুই যেন তাঁর অদৃশ্য দায়িত্বের অংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্রমাগত মানসিক চাপের কারণে মস্তিষ্ক কখনও পুরোপুরি বিশ্রাম পায় না। শারীরিক কাজের যেমন শেষ আছে, মানসিক দায়িত্বের তেমন নির্দিষ্ট বিরতি নেই। ফলে ধীরে ধীরে বাড়তে পারে ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, মানসিক অবসাদ এমনকি বার্নআউটও।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান সময়ে এই চাপ আরও বেড়েছে সামাজিক প্রত্যাশার কারণে। এখনকার মায়েদের একসঙ্গে অনেক ভূমিকায় নিখুঁত হওয়ার চাপ নিতে হয়। যেমন ভালো মা, সফল পেশাজীবী, সামাজিকভাবে সক্রিয় মানুষ এবং নিজের যত্ন নেওয়া নারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘পারফেক্ট’ পরিবারের ছবি দেখেও অনেক মা অজান্তেই তুলনার চাপে পড়ে যান।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কাজগুলোর অনেকটাই দৃশ্যমান নয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা হয়তো কোনো একটি কাজ ভাগ করে নেন, কিন্তু সেই কাজের পরিকল্পনা ও মানসিক দায়িত্ব প্রায়ই মায়ের ওপরই থেকে যায়। যেমন বাজার যে কেউ করতে পারেন, কিন্তু কী কী লাগবে, কখন লাগবে সেই চিন্তাটিই করেন মা। এ বিশয়ে স্কটিশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এমা হেপবার্ন মনে করেন, মায়েদের “মেন্টাল লোড” কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক দায়িত্ব যার নির্দিষ্ট সীমানা নেই। সবসময়ই কিছু না কিছু ভাবতে হয়। আর এই অবিরাম মানসিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে স্ট্রেস, বার্নআউট তৈরির পাশাপাশি ‘আমি যথেষ্ট ভালো মা নই’ এমন অনুভূতি তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে পরিবারের ভেতরে দায়িত্ব ভাগাভাগির ধারণাটিও বদলাতে হবে। শুধু কাজ নয়, কাজের পরিকল্পনা এবং মানসিক দায়িত্বও সমানভাবে ভাগ করা জরুরি। শেয়ার করা ক্যালেন্ডার, লিখিত পরিকল্পনা বা দায়িত্বের নির্দিষ্ট ভাগ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, ‘সবকিছু একা সামলাতে হবে’ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই মাদার্স ডেতে হয়তো সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হতে পারে একটি ছোট্ট স্বীকৃতি। মায়ের অদৃশ্য পরিশ্রমকে সত্যিকারভাবে দেখা, বোঝা এবং ভাগ করে নেওয়া।

ছবি: এআই

বিজ্ঞাপন
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১৪: ৩৭
বিজ্ঞাপন