
একসময় একটি ভালো চাকরি, ধাপে ধাপে পদোন্নতি আর দীর্ঘ কর্মজীবনই ছিল সফলতার সবচেয়ে পরিচিত ছবি। কিন্তু সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন–জি, এখন শুধু একটি চাকরির ওপর নির্ভর করে থাকতে চায় না। তারা একসঙ্গে একাধিক কাজ করছেন, নতুন দক্ষতা শিখছেন, আবার নিজের ছোট ব্যবসা বা সৃজনশীল উদ্যোগও গড়ে তুলছেন।

বিশেষজ্ঞরা এই নতুন ধরনের কর্মজীবনকে বলছেন ‘পোর্টফোলিও ক্যারিয়ার’। যেখানে একজন মানুষ একই সময়ে একাধিক পেশা, প্রকল্প বা আয়ের উৎস নিয়ে এগিয়ে যান। শুধু বেশি আয় নয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করাও এই পরিবর্তনের বড় কারণ।

আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশবিষয়ক প্রতিষ্ঠান আইডব্লিউজি পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের জেন–জি পেশাজীবীদের এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত অন্য একটি কাজ করছেন বা করার পরিকল্পনা করছেন।
তাদের কাছে একটি চাকরি আর জীবনের একমাত্র পরিচয় নয়। বরং কেউ অফিসের কাজের পাশাপাশি অনলাইনে ব্যবসা করছেন, কেউ কনটেন্ট তৈরি করছেন, কেউ ফ্রিল্যান্সিং করছেন, আবার কেউ নিজের কোনো সৃজনশীল উদ্যোগে সময় দিচ্ছেন।
এই বহুমুখী কর্মজীবন তরুণদের কাছে শুধু অর্থ উপার্জনের পথ নয়, বরং নিজের সম্ভাবনাকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ।

জীবনযাত্রার ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সঞ্চয় সব মিলিয়ে একটি আয়ের ওপর নির্ভর করা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে উঠছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক তরুণ জানিয়েছেন, অতিরিক্ত আয় ও আর্থিক নিরাপত্তাই একাধিক পেশা বেছে নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।
তবে শুধু অর্থই নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও তাদের ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি অনেককেই নতুন দক্ষতা অর্জন এবং বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ তরুণ বিশ্বাস করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনে তাদের কর্মজীবনে বড় পরিবর্তন আনবে। এই কারণেই তারা একটি দক্ষতার ওপর নির্ভর না করে নতুন নতুন বিষয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছেন। কেউ ডিজিটাল বিপণন শিখছেন, কেউ ভিডিও নির্মাণ, কেউ আবার তথ্য বিশ্লেষণ বা নকশার মতো নতুন দক্ষতা আয়ত্ত করছেন।
তাদের বিশ্বাস, যত বেশি দক্ষতা থাকবে, ভবিষ্যতের কর্মজীবন তত বেশি নিরাপদ হবে।

আগের প্রজন্মের কাছে একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করাই ছিল সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু জেন–জিদের ভাবনা ভিন্ন। তারা প্রয়োজন হলে নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন শিল্প কিংবা নতুন প্রকল্পে চলে যেতে দ্বিধা করেন না। ভালো বেতন, নতুন অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকলেই তারা পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছেন।
জরিপে দেখা গেছে, গত তিন বছরে চাকরি বদলানো তরুণদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভালো বেতনের জন্য নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। আবার অনেকেই এই সময়ের মধ্যে দুই বা তিনবার পর্যন্ত চাকরি পরিবর্তন করেছেন।

বাসা থেকে কাজ কিংবা হাইব্রিড মেথডোলজি বা সংকর কর্মপদ্ধতি এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যানজটে কাটানোর পরিবর্তে অনেকেই সেই সময় নিজের ব্যবসা, অনলাইন প্রকল্প কিংবা নতুন দক্ষতা শেখার কাজে ব্যয় করছেন।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় এক-চতুর্থাংশ তরুণ জানিয়েছেন, হাইব্রিড মেথডোলজির কারণে তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশি সময় দিতে পারছেন। আবার বেশিরভাগই মনে করেন, প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অফিসে যেতে হলে তারা অতিরিক্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবতেই পারতেন না।

বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কিংবা তরুণ চাকরিজীবীদের অনেকেই এখন নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন উদ্যোক্তা হওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি, ছবি তোলা, ভিবিন্ন ধরনের ডিজাইন করা কিংবা ডিজিটাল সেবা দেওয়ার মতো কাজ করছেন।
একটি পরিচয়ের বদলে একাধিক দক্ষতা ও আয়ের উৎস তৈরি করাকেই তারা ভবিষ্যতের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।

জেন–জিদের কাছে ক্যারিয়ার এখন আর শুধু মাস শেষে বেতন পাওয়ার বিষয় নয়। এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, আর্থিক নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা এবং নিজের শর্তে জীবন গড়ে তোলার একটি পথ।
একটি চাকরির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে একাধিক দক্ষতা ও আয়ের উৎস তৈরি করার যে প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, তা হয়তো আগামী দিনের কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে উঠবে। আর সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে আজকের জেন–জি।
সূত্র: হিউম্যান রিসোর্স অনলাইন
ছবি: এআই