
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। হেমন্তের শীতল বাতাসে কাঁপছে চারপাশ, দিগন্তজোড়া সবুজ ধানখেতে পড়েছে হলুদের আভা। দূরে গ্রামের বাড়িঘর, পাখির ডাক আর উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া। এমন এক চেনা বাংলার সকালে বাংলাদেশের উত্তর প্রান্তের পঞ্চগড় থেকে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট! মাঝখানে শত শত কিলোমিটারের দূরত্ব, অথচ অনুকূল আবহাওয়ায় দিগন্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে হিমালয়ের বরফঢাকা শিখর।

দৃশ্যটি কল্পনার মতো শোনালেও আলোকচিত্রী ফিরোজ আল সাবাহর কাছে এটি দীর্ঘ আট বছরের অনুসন্ধানের বাস্তব ফল। ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর সকালে পঞ্চগড়ের একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাটিতে দাঁড়িয়ে ক্যামেরায় ধারণ করেছেন এভারেস্টের ছবি। শুধু তা-ই নয়, ড্রোনের সাহায্যে ধারণ করেছেন বিস্তৃত পর্বতশ্রেণির ভিডিও। তাঁর ভাষায়, এবারের দৃশ্যমানতা ছিল অসাধারণ। ২০২২ সালের পর এমন স্বচ্ছভাবে এভারেস্ট দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর আর হয়নি।
ফিরোজ আল সাবাহ পেশায় আলোকচিত্রী। আলোকচিত্রের পাশাপাশি বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিয়েও কাজ করেন তিনি। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, দূরবর্তী দৃশ্যের অনুসন্ধান আর ক্যামেরার চোখে অদেখাকে আবিষ্কার করার আগ্রহ থেকেই পঞ্চগড়ের আকাশসীমায় এভারেস্ট খুঁজতে শুরু করেন তিনি। ২০১৮ সালে তাঁর মনে একটি প্রশ্ন জাগে পঞ্চগড় থেকে যদি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, তাহলে মাউন্ট এভারেস্ট দেখা যাবে না কেন? প্রশ্নটি সাধারণ কৌতূহলে থেমে থাকেনি।

তিনি খোঁজ নিতে শুরু করেন পর্বতশৃঙ্গগুলোর উচ্চতা, পর্যবেক্ষকের অবস্থান থেকে সেগুলোর সম্ভাব্য দৃশ্যমান দূরত্ব এবং পৃথিবীর বক্রতার কারণে দৃষ্টিসীমার সীমাবদ্ধতা নিয়ে। হিসাব-নিকাশ করতে গিয়ে তাঁর ধারণা হয়, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে পঞ্চগড় থেকে এভারেস্ট দেখা সম্ভব।
ফিরোজ বলেন, ‘আমি ভাবলাম, কাঞ্চনজঙ্ঘা যদি দেখা যায়, তাহলে এভারেস্ট কেন নয়? পরে উচ্চতা আর দূরত্বের হিসাব করে দেখলাম, এভারেস্ট দেখার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এর জন্য খুব দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত পরিষ্কার দৃশ্যমানতা প্রয়োজন।’ এ অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল মাঝখানের অন্যান্য পর্বতশ্রেণি। পঞ্চগড় থেকে এভারেস্টের দূরত্ব ২৬০ থেকে ২৭০ কিলোমিটার।
এত দূরের পর্বতকে খালি চোখে বা ক্যামেরায় দেখতে হলে শুধু গন্তব্যের আকাশ পরিষ্কার থাকলেই চলে না; মাঝখানের পুরো দৃষ্টিপথও থাকতে হয় মেঘ, কুয়াশা ও ধুলাকণামুক্ত। নেপালের সামনের পাহাড়গুলোও অনেক সময় এভারেস্টকে আড়াল করে রাখে। প্রথম দিকে ড্রোনের সাহায্যে উঁচুতে উঠে এভারেস্ট খুঁজে দেখার চেষ্টা করেন তিনি। ২০১৯ সালে ড্রোনের মাধ্যমে শৃঙ্গটির সম্ভাব্য উপস্থিতি শনাক্তও করেন। কিন্তু সেই সময়ের ছবি এতটা স্পষ্ট ছিল না যে তা দিয়ে নিশ্চিতভাবে এভারেস্টকে চিহ্নিত করা যায়। অনুসন্ধান তাই চলতে থাকে।
২০১৯ সালের প্রাথমিক অনুসন্ধানের পরের বছরগুলোতেও পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থান থেকে এভারেস্ট দেখার চেষ্টা করেছেন ফিরোজ। ২০২২ সালে ড্রোনের পাশাপাশি মাটিতে দাঁড়িয়েও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যান তিনি। পঞ্চগড় সদরের এমন একটি স্থান খুঁজে পান, যেখান থেকে সামনের পাহাড়গুলোর মধ্যবর্তী ফাঁক দিয়ে এভারেস্ট দেখা সম্ভব। সেই বছর ছবি ধারণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি। কিন্তু প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়ার পাশাপাশি আসে সংশয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়াও। বাংলাদেশের কয়েকজন পর্বতারোহীও এভাবে এভারেস্ট দেখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেউ প্রশংসা করেন, কেউ হাসাহাসি করেন, আবার কেউ ব্যঙ্গও করেন।
তবে নিজের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সন্দিহান হননি ফিরোজ। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমি তো নিজের চোখে দেখছি। আমি যে জিনিসটা দেখছি, সেটাকে অন্য কেউ অস্বীকার করলেই তো আর সেটা মিথ্যা হয়ে যায় না।’ এরপর ২০২৩ সালে এভারেস্ট দেখা যায়নি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেখা মিললেও দৃশ্যমানতা ছিল তুলনামূলক কম। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৬ সালে প্রকৃতি যেন তাঁর অনুসন্ধানের সামনে খুলে দেয় এক অসাধারণ জানালা। ২৬ অক্টোবর সকালে প্রায় স্বচ্ছ আকাশে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এভারেস্ট ও আশপাশের পর্বতশৃঙ্গ। ফিরোজের ভাষায়, দুই দিন এমন দৃশ্যমানতা পেয়েছেন তিনি।
পঞ্চগড় থেকে এভারেস্ট দেখা যাওয়ার পেছনে রয়েছে বিরল আবহাওয়াগত পরিস্থিতি। সাধারণত বর্ষা বিদায় নেওয়া এবং শীতের আগমনের মধ্যবর্তী সময়ে বাতাসের ধুলাকণা, জলীয় বাষ্প ও অন্যান্য দূষণকণা কমে গেলে দূরের দৃশ্য দেখার সুযোগ বাড়ে। ফিরোজের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উত্তর দিক থেকে হিমালয় অঞ্চলের শুষ্ক বাতাস প্রবাহিত হলে বায়ুমণ্ডল তুলনামূলক পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তখন দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত দৃষ্টিসীমা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এভারেস্টের ক্ষেত্রে শর্তগুলো আরও কঠিন। কারণ, পঞ্চগড় থেকে শৃঙ্গটি দেখতে হলে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি দৃষ্টিপথ পরিষ্কার থাকতে হয়। পঞ্চগড়ে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও মাঝখানে নেপালের কোনো পাহাড়ে মেঘ জমলে দৃশ্যটি হারিয়ে যেতে পারে। আবার এভারেস্টের আশপাশে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও বাংলাদেশের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হলে দেখা মিলবে না।
এটা আগে থেকে নির্ভুলভাবে অনুমান করা খুব কঠিন। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ক্ষেত্রে আবহাওয়ার কিছু লক্ষণ ধরে ধারণা করা যায়। কিন্তু এভারেস্টের দূরত্ব অনেক বেশি। পুরো দৃষ্টিপথ পরিষ্কার থাকতে হয়, ব্যাখ্যা করেন ফিরোজ। তাঁর অভিজ্ঞতায়, বছরে বড়জোর দুই থেকে চার দিন এমন অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট দিনের নিশ্চয়তা নয়; আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে।
এভারেস্টের ছবি ধারণ করেই থেমে থাকতে চাননি ফিরোজ। তাঁর আগ্রহ ছিল হিমালয়ের বিস্তৃত পর্বতশ্রেণিকে একটি ধারাবাহিক দৃশ্যে তুলে ধরা। এ উদ্দেশ্যে তৈরি করেছেন ‘দ্য সিক্সটি-ডিগ্রি হিমালয়ান হরাইজন’ শিরোনামের একটি ভিডিও। সেখানে পঞ্চগড় থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘাসহ হিমালয়ের বিস্তৃত পর্বতশ্রেণির নানা শৃঙ্গ। চীন, ভুটান, নেপাল ও ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের পর্বতগুলো যেন এক বিশাল দৃশ্যপটে এসে মিলেছে।

ফিরোজের ভাষ্যে, পঞ্চগড়ের নির্দিষ্ট এই স্থান থেকে শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘাই নয়, দেখা মেলে পৃথিবীর আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার কয়েকটি পর্বতশৃঙ্গেরও। এর মধ্যে রয়েছে মাউন্ট এভারেস্ট, মাউন্ট মাকালু ও মাউন্ট লোৎসে। পাশাপাশি দৃশ্যমান হয় চামলাং ইস্ট ও চামলাং ওয়েস্টের মতো পর্বতশৃঙ্গ। দূর দিগন্তে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা এসব শৃঙ্গের সম্মিলিত দৃশ্য যেন হিমালয়ের এক রাজকীয় উপস্থিতি, যার বিশালতা বাংলাদেশের সমতল ভূমি থেকেও অনুভব করা যায়। এই বিস্তৃত পর্বতশ্রেণিকে ভিডিওতে ধারণ করাও ছিল বেশ কঠিন। সাধারণভাবে ক্যামেরা এক জায়গায় রেখে ঘুরিয়ে নিলেই পুরো দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব হতো।
কিন্তু তাতে তাঁর কাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা তৈরি হতো না। ফিরোজ চেয়েছিলেন, ক্যামেরার অবস্থান ক্রমাগত বদলাবে, যেন দর্শক হিমালয়ের বিশালতার মধ্যে প্রবেশ করছেন। সে জন্য ড্রোনকে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাঁকানো পথে উড়িয়ে ভিডিও ধারণ করেন তিনি। আকাশে ড্রোন চালানোর পাশাপাশি দীর্ঘ ফোকাল দৈর্ঘ্যের লেন্সের জুম নিয়ন্ত্রণ করে পর্বতমালার ফ্রেম ধরে রাখাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

ফিরোজের নিজের বর্ণনায়, ‘সারা বছর অপেক্ষার পর যখন এমন দৃশ্য চোখের সামনে আসে, তখন নিজের চোখকেও বিশ্বাস হয় না। এত বিশাল পর্বতমালা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে, অথচ আমি ক্যামেরায় ধারণ করছি। ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে ভিডিও করার সময় আমার আঙুল পর্যন্ত কাঁপছিল।’ ২৬ অক্টোবরের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে আরও বিশেষ। কারণ, সেদিন শুধু ড্রোনের ভিডিও নয়, মাটিতে দাঁড়িয়েও এভারেস্ট ও মাকালুর ছবি তুলেছেন তিনি। তাঁর ধারণ করা দৃশ্যগুলো আবারও সামনে এনেছে সেই প্রশ্ন বাংলাদেশের উত্তর প্রান্ত থেকে হিমালয়ের কতখানি দেখা সম্ভব, তা নিয়ে আমাদের অনুসন্ধান এখনো কতটা অসম্পূর্ণ।
পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অভিজ্ঞতা এখন অনেকের কাছেই পরিচিত। শরৎ ও হেমন্তে আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরের বরফঢাকা শৃঙ্গ দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সেখানে যান। কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় কোনো কোনো স্থানের পরিবেশও। ভিড়, অসচেতন আচরণ ও যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে আসার প্রবণতা প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণেই এভারেস্ট দেখার নির্দিষ্ট স্থানটি প্রকাশ করতে চান না ফিরোজ। তাঁর আশঙ্কা, স্থানটির পরিচয় ছড়িয়ে পড়লে সেখানে অপরিকল্পিত পর্যটকের ভিড় বাড়তে পারে, নষ্ট হতে পারে জায়গাটির স্বাভাবিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য।
প্রকৃতিকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তার সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়, সেই সৌন্দর্য অক্ষত রাখার দায়িত্বও নেওয়া। একটি জায়গাকে সবার কাছে পরিচিত করে তোলাই পর্যটনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। কোথায় যেতে হবে, কীভাবে যেতে হবে এবং গিয়ে পরিবেশের প্রতি কী দায়িত্ব পালন করতে হবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফিরোজের এ অবস্থান তাই কেবল একটি গোপন স্থান রক্ষার সিদ্ধান্ত নয়; বরং প্রকৃতিকে দেখার ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রাখার আহ্বান।

কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য পঞ্চগড়কে বহুদিন ধরেই আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু সেই পরিচিত দৃশ্যের বাইরে আরও একটি সম্ভাবনা যে অপেক্ষা করছিল, তা নিয়ে খুব কম মানুষই ভেবেছেন। ফিরোজ আল সাবাহর অনুসন্ধান সেই অদেখা সম্ভাবনার দিকেই দৃষ্টি ফেরায়। ২০১২ সাল থেকেই পঞ্চগড়ের পাহাড় দেখার সম্ভাবনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করতেন তিনি। সে সময় তাঁর এই আগ্রহকে অনেকে গুরুত্ব দেননি। অথচ বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ, হিসাব, পরীক্ষা এবং অপেক্ষার মধ্য দিয়ে সেই আগ্রহই তাঁকে নিয়ে এসেছে এক বিরল দৃশ্যের সামনে। এই গল্পের সৌন্দর্য শুধু এভারেস্ট দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার সাহস, প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে অনুসন্ধান করার ধৈর্য এবং প্রকৃতির অনুকূল মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করার ক্ষমতা।

পঞ্চগড়ের মাটি থেকে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার দূরের এভারেস্ট দেখা এ যেন ভূগোলের বইয়ের পরিচিত দূরত্বকে বাস্তবের এক বিস্ময়ে রূপান্তরিত করা। দিগন্তের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বরফঢাকা শৃঙ্গগুলো মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর অনেক বিস্ময় আমাদের খুব কাছেই থাকে, শুধু সেগুলো দেখার মতো প্রশ্নটি করতে হয়। ফিরোজ আল সাবাহ সেই প্রশ্ন করেছিলেন আট বছর আগে। আর ২০২৬ সালের এক হেমন্তের সকালে পঞ্চগড়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে তার উত্তর ধরা দিল ক্যামেরার ফ্রেমে।
ছবি: ফিরোজ আল সাবাহ