সাঁতার জানলেও কি পানিতে ডুবে মৃত্যু হতে পারে? অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে ৫টি বিষয়ে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সাঁতার জানা থাকলেই কি আপনি পানিতে পুরোপুরি নিরাপদ? বাস্তবতা বলছে উত্তর নাবোধক। সাম্প্রতিক কিছু দুর্ঘটনা আমাদের সেই কঠিন সত্যটা আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। বেড়াতে বা সাঁতার কাটতে গিয়ে পানিতে নেমে অনেক সময়ই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে জনপ্রিয় ভারতীয় গায়ক জুবিন গর্গ মারা যান পানিতে ডুবে
গত বছর সেপ্টেম্বরে জনপ্রিয় ভারতীয় গায়ক জুবিন গর্গ মারা যান পানিতে ডুবে
এর আগেও সাগরে স্যুট করেছেন, এবার মারা গেলেন ডুবে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়
এর আগেও সাগরে স্যুট করেছেন, এবার মারা গেলেন ডুবে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়

গত বছর ভারতের গায়ক জুবিন গর্গ আর সম্প্রতি ওপার বাংলার জনপ্রিয় অভিনেতা ও পডকাস্টার রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক মৃত্যু এই প্রশ্নকে আরও বেশি সামনে আনছে। কেন মানুষ পানিতে নামলে ডুবে যায়? সাঁতার জানলেও কি এই পানিতে ডোবা থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকা সম্ভব? কারণ এর আগে বহু দুর্ঘটনায় দেখা যায়, সমুদ্রে, নদীতে, পুকুরে এমনকি সুইমিং পুলের পানিতে নেমেও অনেক সাঁতার জানা মানুষের মৃত্যু ঘটে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞান বলছে, পানিতে ভেসে থাকার একটি প্রাকৃতিক ক্ষমতা আমাদের শরীরে জন্মগতভাবেই থাকে। মাতৃগর্ভে আমরা তরল পরিবেশে থাকি, তাই এই প্রবৃত্তি তৈরি হয়। কিন্তু জন্মের পর অনুশীলনের অভাবে এই স্বাভাবিক কৌশল ক্রমে কমে যায়। কেউ কেউ পরে সাঁতার শেখেন, আবার অনেকে ভয়, অনীহা বা সুযোগের অভাবে শেখেন না। তবুও, সাঁতার জানা থাকলেই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এমনটা ভাবা ভুল। কারণ ডুবে যাওয়ার পেছনে থাকে একাধিক জটিল ও জটিল কারণ।

সাঁতার জানা থাকলেই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এমনটা ভাবা ভুল
সাঁতার জানা থাকলেই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এমনটা ভাবা ভুল
নদী, খোলা সমুদ্র বা সৈকতে স্রোত সবসময় একই থাকে না
নদী, খোলা সমুদ্র বা সৈকতে স্রোত সবসময় একই থাকে না

পানির স্রোত

নদী, খোলা সমুদ্র বা সৈকতে স্রোত সবসময় একই থাকে না। হঠাৎ প্রবল স্রোত শরীরকে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে টেনে নিতে পারে, যেখানে অভিজ্ঞ সাঁতারুও দিশেহারা হয়ে পড়েন। বিশেষ করে সমুদ্রে রিপ কারেন্ট (Rip Current) অত্যন্ত বিপজ্জনক এটি তীর থেকে সোজা গভীর সমুদ্রে পানি টেনে নেয়। বাইরের চোখে পানির উপরিভাগ শান্ত মনে হলেও নিচে তীব্র টান কাজ করে। অনেকেই ভুল করে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে তীরে ফেরার চেষ্টা করেন, ফলে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অথচ স্রোতের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সাঁতার কেটে বের হওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

আতঙ্ক

দুর্ঘটনার মুহূর্তে ভয় শরীরের নিয়ন্ত্রণ এবং মস্তিষ্কের যুক্তি-ভিত্তিক ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় প্যানিক রেসপন্স বা acute stress response। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস অগভীর ও দ্রুত হয়ে যায়, পেশি শক্তি হারায় এবং ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাত-পা নড়াচড়া করতে থাকে। এটি কগনেটিভ ন্যারোইং (cognitive narrowing) তৈরি করে যাতে আতঙ্কের কারণে চিন্তার পরিধি সংকুচিত হয়। ফলে সাঁতার জানা থাকলেও তা প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না।

দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে বা অতিরিক্ত ক্লান্তির ফলে পেশিতে হঠাৎ টান ধরে যায়
দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে বা অতিরিক্ত ক্লান্তির ফলে পেশিতে হঠাৎ টান ধরে যায়

পেশিতে ক্র্যাম্প

দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে বা অতিরিক্ত ক্লান্তির ফলে পেশিতে হঠাৎ টান ধরে যায়। এটিকে বলা হয় মাসল ক্র্যাম্প। সাধারণত পায়ের পেছনের পেশি, পায়ের পাতা বা উরুতে এটি ঘটে। এর পেছনে থাকে শরীরের পানি কমে যাওয়া (dehydration), ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, ঠান্ডা পানি বা অতিরিক্ত ক্লান্তি। ক্র্যাম্প হলে পেশি শক্ত হয়ে যায়, তীব্র ব্যথা শুরু হয়, এবং হাত-পা ঠিকমতো নড়ে না। এই অবস্থায় সাঁতার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ক্র্যাম্প হলে আতঙ্কিত না হয়ে নিজেকে ভাসিয়ে রাখা, ধীরে ধীরে পা স্ট্রেচ করা এবং শক্তি বাঁচিয়ে রাখাই নিরাপদ।

ঠান্ডা পানির প্রভাব

ঠান্ডা পানিতে শরীর দ্রুত তাপ হারায়, যা হাইপোথার্মিয়া (Hypothermia) নামে পরিচিত। প্রথম ধাপে ঘটে cold shock response—হঠাৎ শ্বাস দ্রুত হয়ে যায়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, পেশির সমন্বয় কমে যায়। দীর্ঘ সময় থাকলে পেশির কার্যক্ষমতা কমে যায়, শরীর ঠিকমতো সাঁতার দিতে পারে না এটিকে বলা হয় cold incapacitation। ঠান্ডা পানিতে দীর্ঘ সময় থাকলে বিভ্রান্তি, সিদ্ধান্তহীনতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ঠান্ডা পানিতে নামার আগে সতর্ক থাকা, হঠাৎ ডুব না দেওয়া এবং সম্ভব হলে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা জরুরি। গায়ক জুবিন গর্গের ক্ষেত্রে লাইফ জ্যাকেট না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।

 ঠান্ডা পানিতে দীর্ঘ সময় থাকলে বিভ্রান্তি, সিদ্ধান্তহীনতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে
ঠান্ডা পানিতে দীর্ঘ সময় থাকলে বিভ্রান্তি, সিদ্ধান্তহীনতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে
সমুদ্রে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়
সমুদ্রে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়

নিরাপত্তা সরঞ্জাম

মানুষ স্বাভাবিকভাবে কিছুটা ভেসে থাকতে পারে, কিন্তু বিপদের মুহূর্তে শক্তি দ্রুত কমে যায়। লাইফ জ্যাকেট বা ভাসমান সরঞ্জাম না থাকলে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকা প্রায় অসম্ভব। লাইফ জ্যাকেট থাকলে অজ্ঞান হলেও মুখ পানির ওপর থাকে, শ্বাস নেওয়া সহজ হয় এবং পেশির চাপ কমে। তাই নৌভ্রমণ, ফেরি বা সমুদ্রে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় সাঁতার জানতেন কিনা তা স্পষ্টভাবে জানা যাচ্ছে না। জানা যায়, হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে স্রোতে টেনে নিয়ে যাওয়ায় ডুবে গিয়েছেন তিনি। পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় ফুসফুসে ঢুকে গিয়েছে বালি ও পানি। সঙ্গে নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলে ও তার সময়োপযোগী প্রয়োগ করলে হয়তো এই অকালমৃত্যু ঠেকানো যেত, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২৩ সালে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়া সাঁতারু আব্দুল ইলা
২০২৩ সালে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়া সাঁতারু আব্দুল ইলা

এই পুরো বিষয় নিয়ে কথা হলো ২০২৩ সালে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়া সাঁতারু আব্দুল ইলার সঙ্গে। তিনি বলেন, “সাঁতার জানা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু খোলা পানিতে বাঁচতে হলে মানসিক শক্তি, সহনশীলতা এবং পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা আরও জরুরি।” সব মিলিয়ে বলা যায় সাঁতার শেখা জীবন রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা, কিন্তু সচেতনতা, মানসিক স্থিরতা এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার ছাড়া তা একা যথেষ্ট নয়। পানি যেমন জীবন দেয়, তেমনি অসতর্কতায় তা কেড়ে নিতেও পারে সেই জীবন।

তথ্য: প্রথম আলো

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ০১: ৩৮
বিজ্ঞাপন