
সিডনির বৃহত্তর ক্যাম্বেলটাউন এলাকায় একদিকে যেমন আছে বাংলাদেশি মুদির দোকান এবং রেস্তোরাঁ, তেমনি আছে রিয়েল এস্টেট ও কনস্ট্রাকশন ফার্ম। এমনকি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি মালিকানাধীন বহু শ্যাডো এডুকেশন প্রতিষ্ঠান, যাদের আমরা সহজ ভাষায় বলি কোচিং সেন্টার। এসব সুবিধার কথা মাথায় রেখে অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেক বাংলাদেশি পরিবার এ এলাকার বিভিন্ন সাবার্বে বাড়ি কিনে স্থায়ী হয়েছেন।

এসব এলাকায় এখন সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলো মুখর হয়ে ওঠে বাঙালিদের উপস্থিতিতে। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস শুক্রবার বিকেল থেকেই রেস্তোরাঁগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। যাঁরা রেস্তোরাঁয় আসতে পারেন না, তাঁরাও টেক-অ্যাওয়ে নিয়ে বাসায় ফিরে সবাই একসঙ্গে বসে স্বাদ একটু বদলে নেন।
এ ছাড়া বছরব্যাপী চলে বিভিন্ন উৎসব। বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো ছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংগঠনের পাশাপাশি রেস্তোরাঁগুলোও বিভিন্ন উৎসব আয়োজন করে থাকে। বিশেষ করে রোজার সময় রেস্তোরাঁগুলোতে গেলে মনে হয় যেন আমরা পুরোনো ঢাকার চকবাজারে চলে এসেছি। এ ছাড়া বাংলাদেশের পঞ্জিকা অনুযায়ী যেসব উৎসব চলে, সেগুলোও আয়োজন করা হয়।

এখন এখানে শীতকাল। আর এই শীত উদ্যাপন করতে আয়োজন করা হচ্ছে পিঠা উৎসব বা পিঠা মেলার। নাম যেটাই হোক, বিভিন্ন ধরনের পিঠার স্বাদ নেওয়া যায় এসব উৎসবে। কিছুদিন আগের মিন্টোর খাদেম ডাইন এবং ক্যাটারিংয়ে আয়োজন করা হয় ‘বাঙালির পার্বণ’ নামে এমনই উৎসবের। এটা অন্য আর দশটা উৎসবকে ছাড়িয়ে যায় নান্দনিক সজ্জা এবং নানা মুখরোচক পদের কারণে। এই উৎসবের বিশেষত্ব ছিল, এমন অনেক পদ, যা প্রবাসে মেলা দুষ্কর কিংবা হারিয়ে যাওয়ার পথে। প্রচলিত খাবারের পাশাপাশি এসব ঐতিহ্যবাহী অপরিচিত খাবার প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্মৃতিমেদুর করে। ফিরিয়ে নেয় শিকড়ে।
তবে সবার নজর কাড়ে এই উৎসবের দৃষ্টিনন্দন অন্দরসজ্জা। সেখানে অবধারিতভাবে স্থান করে নেয় বাংলাদেশের পতাকা এবং বাংলাদেশের কৃষ্টির সব উপকরণ। একেবারে বাংলাদেশের রঙিন কাগজের ফুলেল সজ্জা এবং পাখিগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল বাংলাদেশের দোকানগুলোর হালখাতার সজ্জাকে।

এ ছাড়া ছিল বিভিন্ন রকমের নামাবলি অঙ্কিত চাদর। তিনটি ভিন্ন রঙের চাদরে ছিল শুধু খনার বচন, আর তিনটিতে ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন কবির কবিতা। আরও ছিল পটচিত্র। ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা। আরও ছিল কুলা, মাটির জগ, কাপ, প্লেট ও গ্লাস।

তবে কয়েকটি বিষয় এই আয়োজনকে পূর্ণতা ও স্বকীয়তা দেয়। এরই একটি চকলেট কর্নার। আর এটা করা হয়েছিল আমাদের খাবারের ভ্যানের আদলে। আরও ছিল হারিয়ে যেতে বসা মাটির টমটম গাড়ি। এই গাড়ির সামনে সুতা দিয়ে বেঁধে টানলে চাকা ঘোরে আর সেটার চাপে কাঠি দুটি মাটির বাটির ওপরের কাগজের ওপর পড়ে ঠিক ঢাকের মতো করে আর বেজে ওঠে। যে যত জোরে দৌড়াতে পারে, তারটা তত জোরে ও দ্রুত বাজে। এসব তো এখন বাংলাদেশের শিশুদের কাছেই স্বপ্নের, সেখানে প্রবাসে এই টমটমের দেখা পাওয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসার।
উৎসবের পুরোটা সময়ে বেজেছে বাংলা গান। সম্প্রতি জনপ্রিয় কোক স্টুডিওর গানও বাজানো হয়েছে। বাঙালির পার্বণ নামে প্রবাসের এই আয়োজনে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বাংলাদেশের চিরায়ত উৎসবের রূপকেই।
ছবি: লেখক