
ঠাকুরবাড়িতে ছোট–বড় সবারই পালোয়ানের কাছে কুস্তি লড়া ছিল বাধ্যতামূলক। ফলে ছোট রবিকেও কুস্তি লড়তে হতো। সেটা তাঁর মায়ের পছন্দ ছিল না। বাকিটা না হয় তাঁর মুখ থেকেই শোনা যাক, ‘সকালবেলায় রোজ এত করে মাটি ঘেঁটে আসা ভালো লাগত না মায়ের, তাঁর ভয় হতো ছেলের গায়ের রং মেটে হয়ে যায় পাছে। তার ফল হয়েছিল, ছুটির দিনে তিনি লেগে যেতেন শোধন করতে। শোধনক্রিয়ার সামগ্রী হিসেবে থাকত বাদাম-বাটা, সর, কমলালেবুর খোসা, আরও কত কী...।’

রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজৈবনিক রচনা ছেলেবেলায় এভাবেই মায়ের স্মৃতিকে ছুঁয়ে গেছেন। স্মৃতিটা খুব ছোট, খুব সাধারণ; অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর স্নেহের আবেশ। এই স্নেহ তিনি বেশিদিন পাননি। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে মাকে হারান রবীন্দ্রনাথ।
তবু তাঁর সাহিত্যভুবনে ‘মা’ যেন কখনো অনুপস্থিত নন। ব্যক্তিগত স্মৃতির গণ্ডি পেরিয়ে রবীন্দ্রভাবনায় মা হয়ে উঠেছেন আশ্রয়, মমতা, নির্ভরতা ও চিরন্তন স্নেহের প্রতীক। কখনও তিনি জন্মদাত্রী, কখনও দেশ, কখনও প্রকৃতি, কখনওবা এক আধ্যাত্মিক সত্তা। মনে হয়, শৈশবের অপূর্ণতাকে তিনি সৃষ্টির ভেতর দিয়েই বারবার পূর্ণ করতে চেয়েছেন।

রবীন্দ্রভাবনায় মা মূলত নিরাপত্তার নাম। তাই তাঁর গান ও কবিতায় মাতৃরূপ নানা প্রতীকে ফিরে এসেছে। “জননী” শব্দটির প্রতিও ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। আমার সোনার বাংলা গানে তিনি লিখলেন, “ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে”—এ যেন মাতৃভূমির প্রতি এক নিবিড় ভালোবাসার প্রকাশ। আবার “জননী, তোমার করুণ চরণখানি” পঙ্ক্তিতে মাতৃত্ব যেন ভক্তি ও নির্ভরতার এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
রবীন্দ্রনাথের গল্পেও মাতৃহীনতা এক গভীর অনুষঙ্গ। ছুটি গল্পের ফটিক কিংবা পোস্টমাস্টার–এর রতনের ভেতরে যে আকুলতা, তা যেন হারিয়ে যাওয়া আশ্রয়েরই আর্তি। তাঁর চরিত্ররা প্রায়ই কোনো মমতার কাছে ফিরে যেতে চায়। এই অনুভবের উৎস হয়তো তাঁর নিজের জীবনেই নিহিত।
অন্যদিকে প্রকৃতিকেও রবীন্দ্রনাথ বহুবার মাতৃরূপে কল্পনা করেছেন। শান্তিনিকেতনের প্রকৃতিনির্ভর শিক্ষাভাবনার মধ্যেও যেন সেই মমতাময় মাতৃত্বেরই ছায়া আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের বিকাশ ঘটে স্নেহ, সৌন্দর্য ও মুক্তির পরিবেশে—যে পরিবেশ এক মায়ের মতোই আগলে রাখে।
রবীন্দ্রনাথের শিশুতোষ কবিতাগুলোতে মা যেন এক স্বপ্নলোকের সঙ্গী। সেখানে ভয় আছে, কল্পনা আছে, দুষ্টুমি আছে, আবার গভীর নির্ভরতাও আছে। বীরপুরুষ–এর খোকা যেমন ভয় পাওয়া মাকে সাহস দেয়, তেমনি লুকোচুরি–র শিশুটি চায় মায়ের ভালোবাসার ভেতরেই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে। শিশুমনের এই কল্পনাগুলো আসলে এক অনন্ত নিরাপত্তাবোধের প্রকাশ। তাই আজও যখন খোকা বলে, “ভয় কোরো না মা গো”, তখন সেই ডাক বাঙালির হৃদয়ে একইরকম আবেগ জাগায়।
রবীন্দ্রনাথের দেশভাবনাতেও মাতৃত্ব এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। বঙ্গমাতা কবিতায় মাতৃভূমি যেন এক স্নেহশীল অথচ দৃঢ়চেতা জননী, যিনি সন্তানকে চিরশিশু করে রাখতে চান না; বরং মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। তাই তিনি লিখেছিলেন, “মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে।” আবার বাঙালির আত্মতুষ্টি ও মূল্যবোধহীনতার সমালোচনা করে উচ্চারণ করেছিলেন, “সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ কর নি।” আজও এই পঙ্ক্তিগুলো আশ্চর্য রকম প্রাসঙ্গিক।
বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের মাকে নিয়ে স্মৃতি খুব বেশি নেই, কিন্তু যেটুকু আছে, তা গভীরভাবে মানবিক। সেই স্মৃতির ভেতরে যেমন আছে কমলালেবুর খোসা দিয়ে ছেলের গায়ের রং রক্ষা করার সহজ উদ্বেগ, তেমনি আছে হারিয়ে যাওয়া এক আশ্রয়ের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। তাই রবীন্দ্রভাবনায় মা শুধু একজন মানুষ নন; তিনি অনুভব, নির্ভরতা ও চিরন্তন মমতার এক অনিবার্য প্রতীক।
ছবি: এআই ও উইকিপিডিয়া