
যেখানে অধিকাংশ দর্শক ম্যাচ শেষে স্ট্যান্ডে পড়ে থাকা আধখাওয়া খাবার, প্লাস্টিকের বোতল বা অন্যান্য আবর্জনা ফেলে রেখে চলে যান, সেখানে জাপানি সমর্থকেরা বিশ্বজুড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি উদাহরণ স্থাপন করেছেন। সেই চেনা চিত্র দেখা গেল এবারের বিশ্বকাপেও। নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে খেলা শেষে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করে তবেই ফিরলেন সেদেশের সমর্থকরা।

এজন্য তাঁরা কিছু ঢাউস সাইজের নীল প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করেন, যেগুলো ম্যাচের সময় হাতে উড়িয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করছিলেন তাঁরা।
জাপান প্রথমবারের মতো ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নেয়। তখনই তাদের সমর্থকদের স্টেডিয়াম ছাড়ার আগে আবর্জনা পরিষ্কার করতে দেখা যায়। এরপর থেকে বিশ্বকাপ, অলিম্পিক কিংবা জাপান অংশগ্রহণ করা অন্যান্য বড় ক্রীড়া আসরে এই দৃশ্যটি প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে।
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে জাপানের স্মরণীয় ২-১ গোলের জয়ের পরও ‘সামুরাই ব্লু’ সমর্থকেরা উদ্যাপন থামিয়ে দ্রুত খালিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের নিজেদের বসার স্থান পরিষ্কার করতে শুরু করেন।
এমনকি কাতার ও ইকুয়েডরের মধ্যকার টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচেও জাপানি সমর্থকদের স্টেডিয়াম পরিষ্কার করতে দেখা যায়, যদিও সেই ম্যাচে তাদের দল খেলেনি।
কেন জাপানের সমর্থকেরা বিশ্বকাপ ম্যাচ শেষে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেন?
১৯৯৮ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই জাপানি সমর্থকেরা এই অভ্যাস বজায় রেখে আসছেন। জাপানে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে:
“Tatsu tori ato wo nigosazu.”
এর আক্ষরিক ইংরেজি অনুবাদ হলো: “আ বার্ড দ্যাট ফ্লাইস নেভার লিভস আ ট্রেস”। আর এই বিষয়টি জাপানের সংস্কৃতির এক বড় অংশ।

২০১৮ সালে ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্কট নর্থ বিবিসিকে বলেন, “ফুটবল ম্যাচ শেষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করা আসলে সেই মৌলিক আচরণেরই একটি সম্প্রসারণ, যা জাপানি শিশুদের স্কুলে শেখানো হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ ও করিডর পরিষ্কার করে।” তিনি আরও বলেন, “শৈশবজুড়ে বারবার এই শিক্ষা পাওয়ার ফলে এসব আচরণ অধিকাংশ মানুষের জন্য অভ্যাসে পরিণত হয়।”
নর্থের মতে, “পরিচ্ছন্নতা ও পুনর্ব্যবহার সম্পর্কে তাদের উচ্চ সচেতনতার পাশাপাশি বিশ্বকাপের মতো আসরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করা জাপানি সমর্থকদের জন্য তাদের জীবনধারার প্রতি গর্ব প্রকাশের একটি উপায়, যা তারা বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান।” জাপানভিত্তিক সাংবাদিক স্কট ম্যাকইনটায়ারও বিবিসিকে বলেন, “এটি শুধু ফুটবল সংস্কৃতির অংশ নয়, বরং জাপানি সংস্কৃতিরই অংশ। প্রায়ই বলা হয় ফুটবল একটি দেশের সংস্কৃতির প্রতিফলন। জাপানি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, এবং এটি শুধু ফুটবলে নয়, সব ধরনের ক্রীড়া আয়োজনে দেখা যায়।”

এ নিয়ে জানতে চাইলে সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও ইতিহাসের অধ্যাপক কোইচি নাকানো অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন ক্রীড়া আসরে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করা জাপানি সমর্থকেরা ঠিক সেইভাবেই আচরণ করেন, যেভাবে তারা স্কুলজীবনে খেলাধুলা উপভোগ করতে শিখেছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “স্কুলে ফুটবল বা অন্য যেকোনো খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু শারীরিক শিক্ষা নয়, নৈতিক শিক্ষার ওপরও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।”
টোকিওভিত্তিক জার্মান ইনস্টিটিউট ফর জাপানিজ স্টাডিজের উপপরিচালক বারবারা হোলথাস অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “একাডেমিকভাবে বললে, জাপানের মানুষ ভিন্নভাবে সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। ছোটবেলা থেকে যদি আপনি কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা আচরণে অভ্যস্ত হন, তাহলে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করার ক্ষেত্রেও আপনি সেটিই অনুসরণ করবেন।” তিনি আরও বলেন, “জাপানিরা ছোটবেলা থেকেই শেখে যে অন্যের অসুবিধার কারণ হওয়া উচিত নয়। অন্যকে বিরক্ত করা যাবে না। জাপানের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই মূল্যবোধ কাজ করে। অন্যদিকে পশ্চিমা সমাজে আমরা বড় হই এই ধারণা নিয়ে যে জনসমাগমস্থল পরিষ্কার করার জন্য আলাদা জনসেবা বা কর্মী রয়েছে, তাই নিজেরা পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই।”

জাপানি সমর্থকদের এই অভ্যাস শুধু পরিচ্ছন্নতার উদাহরণ নয়; এটি তাদের সামাজিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং অন্যের প্রতি সম্মানেরও প্রতিফলন। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে তারা প্রমাণ করেছেন যে প্রকৃত ক্রীড়াসুলভ আচরণ শুধু মাঠের খেলায় নয়, মাঠের বাইরের কর্মকাণ্ডেও প্রকাশ পায়।
সূত্র: ইএসপিএন
ছবি: ইন্সটাগ্রাম