
গতকাল ২৮ এপ্রিল পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ। চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বসানো হলে তা থেকে তাপ তৈরি হয়। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘোরে আর সেখান থেকেই এই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

অন্তত ২০০টি ইউরেনিয়াম পেলেট সাজিয়ে ফুয়েল রডে ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি রূপে এই জ্বালানি লোড করা হয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে। এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে এই ইউরেনিয়াম জ্বালানি অন্যান্য প্রচলিত জ্বালানি যেমন তেল, গ্যাস বা কয়লার চেয়ে কতটা আলাদা আর কীভাবে তা জীবনযাপনের ধরন বদলে দিতে পারে।
ইউরেনিয়াম জ্বালানির বিশেষ দিকগুলো হলো:
পরিষ্কার জ্বালানির দিকে রূপান্তর
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিচালনার সময় প্রায় শূন্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে এবং বিশ্বে মোট বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ সরবরাহ করে এই ধরনের প্ল্যান্টগুলো।
দূষণ কমানো
কয়লার পরিবর্তে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করলে লক্ষ লক্ষ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার অক্সাইড এবং ক্ষুদ্র কণার নির্গমন এড়ানো যায়, ফলে বায়ুর মান উন্নত হয়।

জ্বালানি নিরাপত্তা
ইউরেনিয়ামের শক্তি ঘনত্ব অনেক বেশি হওয়ায় এটি সহজে মজুত করা যায়, যা জ্বালানি সংকট ও জীবাশ্ম জ্বালানির দামের ওঠানামার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
জায়গার সাশ্রয়
সমান পরিমাণ শক্তি উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গা লাগে বায়ু বা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় অনেক কম।
চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পারমাণবিক রিয়্যাক্টর থেকে তৈরি রেডিওআইসোটোপ ক্যান্সার চিকিৎসা, চিকিৎসা নির্ণয় (পশ্চিমা বিশ্বে প্রতি ২ জনে ১ জন ব্যবহার করে) এবং খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
ইউরেনিয়াম বনাম জীবাশ্ম জ্বালানি (তেল, গ্যাস ও কয়লা)
ইউরেনিয়ামের শক্তি-ঘনত্ব প্রচলিত জ্বালানির তুলনায় অসাধারণ।
১ কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫ ২.৭ মিলিয়ন কেজি (২,৭০০ টন) কয়লার সমান কাজ করতে পারে।
১ কেজি ইউরেনিয়াম-২৩৫ ২০ লাখ লিটার ডিজেলের সমান।

কার্যকারিতার দিক থেকে ১টি ইউরেনিয়াম পেলেট (২০ গ্রাম) ১ টন কয়লা বা ১২০ গ্যালন (৪৫৪ লিটার) তেল বা ১৭ হাজার ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের সমপরিমাণ।
৪–৫ কেজি ইউরেনিয়াম জ্বালানি দিয়ে একটি পারমাণবিক সাবমেরিন কয়েক দশক চালানো যায়।
ইউরেনিয়ামের শক্তির বাস্তব চিত্র
আঙুলের ডগার চেয়েও ছোট একটি ইউরেনিয়াম পেলেট কয়েক বছর ধরে একটি আধুনিক পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে পারে, তাও আবার প্রচলিত জ্বালানির মতো অবিরাম দূষণ ছাড়াই।
একটি ইউরেনিয়াম জ্বালানি পেলেট (আঙুলের ডগার মতো আকার) একটি আধুনিক বাড়িতে প্রায় ৩৫–৪০ দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।

যদিও অঞ্চলের ভেদে বিদ্যুৎ ব্যবহারে পার্থক্য থাকে, তবুও নিচের উদাহরণগুলো এই ছোট পেলেটের শক্তি দেখায়।
বার্ষিক ব্যবহার: একটি গড় আধুনিক পরিবারের এক বছরের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ১০টিরও কম পেলেট লাগে।
নির্দিষ্ট যন্ত্র: একটি পেলেট দিয়ে একটি ফ্রিজ ৪ বছর চলতে পারে অথবা ৬০ ওয়াটের একটি বাতি টানা ৩ বছর জ্বলতে পারে
বড় পরিসরে ভাবলে, ১ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ থেকে এত শক্তি পাওয়া যায় যা একটি গড় পরিবারের জন্য ৩ হাজারের বছরেরও বেশি সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
তথ্যসূত্র: অ্যালবার্টা এনার্জি, উইকিপিডিয়া, প্রথম আলো
ছবি: প্রথম আলোর ইন্সটাগ্রাম, উইকিমিডিয়া কমন্স, উইকিপিডিয়া ও ইন্সটাগ্রাম