
ত্রিশের দশকের কথা। রাজশাহীতে তখন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বিশুদ্ধ পানির অভাবে কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েডের মতো রোগে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছিল। এই সংকট থেকে শহরবাসীকে রক্ষা করতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছিল ঢোপকল।

ঢোপকল শব্দটাই যেন অচেনা আজকের প্রজন্মের কাছে। আধুনিক নগরায়ণের ছোঁয়ায় এখন আমরা পরিচিত ওয়াসা, ফিল্টার, ওয়াটার পিউরিফায়ারের সঙ্গে; কিন্তু সে সময় পরিশোধিত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হতো এই ঢোপকলের মাধ্যমে।
১৯৩৪ সালে তৎকালীন রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান রায় ডি এন দাশগুপ্ত (১৯৩৪-৩৯) নগরবাসীর জন্য সুপেয় পানি সরবরাহের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে পানির ঢোপকল স্থাপন করা হবে। এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ১৯৩৭ সালের আগস্ট মাসে মিনিস্ট্রি অব ক্যালকাটার অধীনে ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ নামে একটি পানি সরবরাহ ও পরিশোধন কেন্দ্র নির্মিত হয়।

পুরো প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় আড়াই লাখ টাকা। সে সময় এই কাজে সহযোগিতার জন্য নগরীর বিশিষ্টজনদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানানো হয়। দেখা যায় এই আবেদনে সাড়া দিয়ে পুঠিয়ার মহারানি হেমন্ত কুমারী এককভাবে ৬৫,০০০ টাকা অনুদান দেন। তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারণেই প্রকল্পের নামকরণ করা হয় তাঁর নামে, যা পরে ‘হেমন্ত কুমারী ঢোপকল’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাজশাহী শহরজুড়ে প্রায় শতাধিক ঢোপকল স্থাপন করা হয়।
ঢোপকলগুলো মূলত সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে তৈরি করা হতো। তবে নান্দনিকতা আনতে বাইরের কাঠামোয় ঢেউখেলানো টিন ব্যবহার করা হতো, যা এর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। প্রতিটি ঢোপকল ভূমি থেকে প্রায় ১২ ফুট উঁচু এবং প্রায় ৪ ফুট ব্যাসবিশিষ্ট ছিল। প্রতিটি ঢোপকলের পানি ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৪৭০ গ্যালন। পানি সরবরাহের মূল কেন্দ্র ছিল রাজশাহীর হেতম খাঁ নামক স্থানে অবস্থিত পানি শোধনকেন্দ্র, যা দৈনিক প্রায় ৭০০ ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি পরিশোধন করতে সক্ষম ছিল। এখানে আয়রন ও ক্ষারতা অপসারণ করে পানি জীবাণুমুক্ত করা হতো।

কয়েকটি প্রক্রিয়ায় পানিকে বিশুদ্ধকরণ করা হতো। শোধনপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে ব্যবহার করা হতো পাথরকুচির ফিল্টার, যার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে পানি ছেঁকে নেওয়া হতো। এ ছাড়া ঢোপকলগুলোর অভ্যন্তরে বসানো হয়েছিল বালি ও পাথরের স্তরযুক্ত রাফিং ফিল্টার, যা পানিকে আরও পরিশোধিত করে তুলত। এই বিশেষ ব্যবস্থার ফলে গ্রীষ্মকালে ঢোপকল থেকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা পানি পাওয়া যেত। পরবর্তী সময়ে বিশুদ্ধ পানি সিমেন্টের মোটা পাইপ বেয়ে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হতো। এ ছাড়া পানির গুণগত মান নিশ্চিত করতেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতো। প্রতিটি ঢোপকলের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে প্রতি দুই মাস অন্তর পৌরসভার কর্মীরা সেগুলোর ভেতরে প্রবেশ করে জীবাণুনাশক এবং অন্যান্য পরিষ্কারক দ্রব্য ব্যবহার করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিষ্করণ করত। এ ছাড়া পানির গুণগত মান ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষাগারে নিয়মিত যাচাই করা হতো।
ঢোপকল স্থাপনের ফলে রাজশাহীর মানুষ বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা ফিরে পায়, যা ছিল তৎকালীন সময়ের এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। এটি কলেরা, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে এবং বহু মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই চিরদিন মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না; ঢোপকলও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ১৯৬১ সালে নতুন নলকূপ স্থাপন এবং নগরজুড়ে বিরাটাকারের ওভারহেড পানির ট্যাঙ্ক তৈরির মাধ্যমে রাজশাহীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। এর ফলে নগরীতে সমান্তরাল আরেকটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
১৯৬৫ সালে মহারানি হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস বা হেমন্ত কুমারী ঢোপকলকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে এই ঘোষণার পরও ঢোপকলগুলোর গুরুত্ব তাৎক্ষণিকভাবে তেমন হ্রাস পায়নি। সেগুলোকে নবপ্রতিষ্ঠিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যা তাদের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ১৯৯৪ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের একটি যুগান্তকারী প্রকল্পের অধীনে যখন প্রতিটি বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি পানির সংযোগ দেওয়া শুরু হলো, ঠিক তখন থেকেই ঢোপকলগুলোর দীর্ঘদিনের অবিসংবাদিত গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।

বর্তমানে রাজশাহীতে ঢোপকল প্রায় বিলুপ্তির পথে। একসময় প্রায় শতাধিক ঢোপকল স্থাপন করা হলেও, বর্তমানে এর সংখ্যা কমে প্রায় ১৫-২০টিতে নেমে এসেছে। তথ্যসূত্রমতে, ২০১৬ সালে নগরীতে ৪৭টি ঢোপকল টিকে ছিল, যার মধ্যে ৩৩টিতে তখনো পানি সরবরাহ চালু ছিল। তবে এই কয়েক বছরে সংখ্যাটি আরও হ্রাস পেয়েছে।
কিছু ঢোপকল এখনো সচল থাকলেও, সেগুলোতে ওয়াসার পানি সরবরাহ হয়। সুতরাং বলাই বাহুল্য এগুলো আর পানি সরবরাহে ব্যবহার করা হয় না, বরং ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে নগরের শোভাবর্ধনের কাজে ব্যবহৃত হয়। বরেন্দ্র জাদুঘরে দুটি ঢোপকল স্থাপন করা হয়েছে। নগরীর সিঅ্যান্ডবি মোড় থেকে ডিআইজি অফিস পর্যন্ত প্রদর্শনীর জন্য তিনটি এবং কাজলায় মাহবুর রহমানের আর্কাইভে একটি রাখা হয়েছে। এগুলো রাজশাহীর ঐতিহ্য। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর যথাযথ সংরক্ষণ অত্যন্ত প্রয়োজন। যেন তারা জানতে পারে একটি স্থাপনা কীভাবে একসময়ে মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছিল এবং নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিল।
তথ্যসূত্র: জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম, অনলাইন পোর্টাল ও ঐতিহাসিক নথি
ছবি: লেখক