তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলেও খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা কম, ৭ ধরনের খাদ্যে স্বনির্ভর যে দেশ!
শেয়ার করুন
ফলো করুন

চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে মাছ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে আছে নানা কারণ। আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা মিলিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা এখন বিশ্বের বহু দেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। অর্থের সংস্থান থাকলেই যে সব সময় প্রয়োজনীয় খাবার পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তাও আর নেই। এই বাস্তবতার মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশ গায়ানা দেখাচ্ছে ভিন্ন এক পথ। তেলসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি দেশটি গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যে স্বনির্ভরতার ওপর। লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের মানুষের খাবারের জোগান নিজেরাই নিশ্চিত করা। আর এই উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের মিলও কম নয়। নদী, জলাভূমি, উর্বর জমি আর ভাত-মাছের খাদ্যসংস্কৃতি সব মিলিয়ে গায়ানার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্যও হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস।

সাত শ্রেণির খাবার উৎপাদনে স্বনির্ভর গায়ানা

খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় গায়ানার নাম উঠে আসার অন্যতম কারণ দেশটির কৃষি উৎপাদনের বৈচিত্র্য। ১৮৬টি দেশের খাদ্য উৎপাদন ও স্বনির্ভরতা নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গায়ানার অবস্থান বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। গবেষণাটির মূল বক্তব্য হলো, দেশটি খাদ্যের সাতটি প্রধান শ্রেণিতে নিজস্ব চাহিদা মেটানোর মতো উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করেছে। শুধু একটি বা দুটি কৃষিপণ্যে সাফল্য নয়, বরং মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট দেখা দিলে কিংবা আমদানির পথ ব্যাহত হলে এই সক্ষমতা দেশটিকে বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারে। তবে খাদ্যে স্বনির্ভরতা মানে সব ধরনের খাবারে শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণতা কিংবা আমদানির আর কোনো প্রয়োজন নেই বিষয়টি এমন নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, জরুরি খাদ্যপণ্যের জোগান যেন পুরোপুরি বিদেশি বাজারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল না থাকে।

আমদানিনির্ভরতা কমাতে ‘২৫ বাই ২০২৫’

ক্যারিবীয় অঞ্চলের বহু দেশ দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভর করে এসেছে। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থার সংকটের ঝুঁকিও তৈরি হয়। করোনা মহামারির পর সেই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বাজারকে নতুন করে অস্থির করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে গায়ানা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো কেবল কৃষি উন্নয়নের বিষয় ছিল না; এটি হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও অংশ। এই লক্ষ্য সামনে রেখে ক্যারিবীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক উদ্যোগ ‘২৫ বাই ২০২৫’ গ্রহণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে খাদ্য আমদানির ব্যয় ২৫ শতাংশ কমানো। গায়ানা এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং নিজস্ব কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়। এর পেছনে আছে একটি বাস্তব উপলব্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থ থাকলেও সংকটের সময় প্রয়োজনীয় খাদ্য পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই দেশের মানুষের খাবারের জোগান নিশ্চিত করতে স্থানীয় উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

বিজ্ঞাপন

তেলের সম্পদ কৃষিতে বিনিয়োগ

গায়ানার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গল্পে বড় মোড় আসে সমুদ্রসীমায় তেলের বিশাল মজুত আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। ২০১৫ সালে দেশটির সমুদ্রাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য তেলসম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে তেল উৎপাদন শুরু হলে অর্থনীতিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি আসে। তেলসম্পদ একটি দেশের অর্থনীতি বদলে দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তেলের দাম ওঠানামা করে, আন্তর্জাতিক বাজারও অনিশ্চিত। তাই তেল থেকে অর্জিত সম্পদের একটি অংশ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে কাজে লাগানো গায়ানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে ওঠে। কৃষিতে বিনিয়োগের অর্থ কেবল বেশি জমিতে ফসল ফলানো নয়। এর মধ্যে রয়েছে সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, কৃষি অবকাঠামো গড়ে তোলা, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সহজ করা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষকদের সহায়তা দেওয়া। এসব উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয় ও গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হতে পারে।

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, প্রকৃতিকে কাজে লাগানো

গায়ানার কৃষি কৌশলে ‘বায়োরিজিওনালিজম’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজভাবে বললে, কোনো অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, জলবায়ু, মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য বিবেচনায় নিয়ে সেই অঞ্চলের উপযোগী উন্নয়নব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর মূল ভাবনা। সব জায়গায় একই ধরনের কৃষি পদ্ধতি কার্যকর হয় না। কোথাও ধান ভালো হয়, কোথাও ফল বা সবজি, আবার কোথাও মাছ চাষের সম্ভাবনা বেশি। তাই প্রকৃতির সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে না গিয়ে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী উৎপাদনব্যবস্থা তৈরি করাই এই ধারণার গুরুত্বপূর্ণ দিক। গায়ানা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। দেশটির বিশাল বনাঞ্চল, নদীনির্ভর ভূপ্রকৃতি এবং উপকূলীয় নিম্নভূমি একদিকে যেমন কৃষির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, অন্যদিকে সঠিক পরিকল্পনায় এগুলোই হতে পারে উৎপাদনের সম্পদ।

নিচু উপকূলীয় জমি থেকেই খাদ্যের জোগান

গায়ানার উপকূলীয় অঞ্চলের বড় একটি অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের সমান বা তার নিচুতে অবস্থিত। ফলে সমুদ্রের পানি প্রবেশ, বন্যা এবং জলাবদ্ধতা মোকাবিলা করা দেশটির কৃষির জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনামলে নির্মিত বাঁধ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এই অঞ্চলের কৃষি ও বসতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে শুধু বাঁধ তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। পানি কখন জমিতে প্রবেশ করবে, কখন বের হবে এবং কীভাবে জমির আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা হবে এসব বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গায়ানার উপকূলীয় কৃষিতে বাঁধ, জলনিয়ন্ত্রণ ফটক ও পানি সংরক্ষণব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে জমিকে চাষের উপযোগী রাখার চেষ্টা করা হয়। এই অঞ্চলে ধান চাষের পাশাপাশি মাছ চাষও গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় কৃষি ও জলজ উৎপাদনের সমন্বয় জমির ব্যবহার বাড়াতে পারে এবং কৃষকের আয়ের একাধিক পথ তৈরি করতে পারে। ফলে একসময় যে উপকূলীয় নিম্নভূমি ছিল বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঝুঁকির এলাকা, সেটিই গায়ানার খাদ্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

খাদ্যনিরাপত্তার শক্তি স্থানীয় কৃষক ও জনগোষ্ঠী

কোনো দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য শুধু অর্থ বা প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্থানীয় কৃষকদের অংশগ্রহণ, উৎপাদনের উপকরণে সহজ প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। গায়ানার ক্ষেত্রেও স্থানীয় উৎপাদনকে গুরুত্ব দেওয়া, কৃষি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষকদের জন্য উৎপাদনব্যয় কমানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিযন্ত্রের ওপর কর বা ভ্যাট কমানো কিংবা কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা কৃষকদের জন্য সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত বীজ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পানির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং স্থানীয় জাত সংরক্ষণের মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই খাদ্যনিরাপত্তার পরিকল্পনায় বর্তমান উৎপাদনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। গায়ানার অভিজ্ঞতা দেখায়, কৃষিকে অর্থনীতির প্রান্তিক খাত হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গায়ানার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ হলেও গায়ানার সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যসংস্কৃতির কিছু উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। দুই দেশেই নদী ও পানিনির্ভর ভূপ্রকৃতি কৃষির ওপর প্রভাব ফেলে। ধান ও মাছ মানুষের খাদ্যাভ্যাসে গুরুত্বপূর্ণ। আবার বন্যা, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাও দুই দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের কৃষি ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবু ভোজ্যতেল, গম, ডালসহ বিভিন্ন খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।

এখানে গায়ানার অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যায়। প্রথমত, কোন কোন খাদ্যপণ্যে আমদানিনির্ভরতা সবচেয়ে বেশি, তা চিহ্নিত করে স্থানীয় উৎপাদনের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা। দ্বিতীয়ত, অঞ্চলভেদে মাটি, পানি ও জলবায়ুর উপযোগী কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। তৃতীয়ত, ধান চাষের পাশাপাশি মাছ, ডাল, তেলবীজ, ফল ও সবজির উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। চতুর্থত, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনের ঘাটতি কমিয়ে উৎপাদিত খাবারের অপচয় ঠেকানো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের নামে বনভূমি ধ্বংস বা পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না। গায়ানার মতো বাংলাদেশেরও প্রয়োজন এমন কৃষিব্যবস্থা, যা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করবে।

নিজের খাবারের জোগান নিজের হাতে

গায়ানার গল্প শুধু তেলসম্পদ কাজে লাগিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদনকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করার প্রচেষ্টা। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো, স্থানীয় কৃষকদের শক্তিশালী করা এবং প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য বুঝে উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যেই এই উদ্যোগের গুরুত্ব। বাংলাদেশের বাস্তবতা গায়ানার মতো নয়। জনসংখ্যা, জমির পরিমাণ, অর্থনীতি ও কৃষির চ্যালেঞ্জও আলাদা। তাই গায়ানার মডেল হুবহু অনুসরণ করার সুযোগ নেই। তবে একটি শিক্ষা স্পষ্ট, খাদ্যনিরাপত্তা কেবল বাজার থেকে খাবার কিনে নেওয়ার সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না। প্রয়োজন নিজের দেশে উৎপাদনের শক্ত ভিত গড়ে তোলা।

একটি দেশের প্রকৃত সক্ষমতা শুধু তার অর্থসম্পদের পরিমাণে নয়, সংকটের সময় নিজের মানুষের খাবারের জোগান কতটা নিশ্চিত করতে পারে, তার মধ্যেও প্রকাশ পায়। কাঁচাবাজারের বাড়তি দাম থেকে শুরু করে বৈশ্বিক খাদ্যসংকট সবকিছুর সঙ্গে এই প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে। আর সে কারণেই গায়ানার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: নেচার ফুড

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪: ৩৫
বিজ্ঞাপন