অগোছালো ঘরও হতে পারে সুখের ঠিকানা, ঘর গোছানোর ধারণা বদলে দিচ্ছে নতুন গবেষণা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ঘর গোছানোর জনপ্রিয় পদ্ধতির জন্য পরিচিত জাপানি সংগঠক ম্যারি কোন্দোর দর্শনে পরিপাটি ঘরের গুরুত্ব অনেক। তবে ঘরের প্রতিটি জিনিস নিয়ম মেনে সাজিয়ে রাখলেই যে জীবন সহজ হবে, এমনটা মনে করেন না গবেষকেরা। নিউজিল্যান্ডের ২২টি পরিবারের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের কিছুটা অগোছালো অবস্থা পরিবারের দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে পারে। কখনো কখনো তা পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অভ্যাসের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে।

অগোছালো ঘরও যখন কাজে লাগে

ঘরের সব জায়গা সব সময় একটিমাত্র কাজে ব্যবহার করা হয় না। বসার ঘর হয়ে ওঠে শিশুর খেলার জায়গা, শোবার ঘরের এক কোণে তৈরি হয় পড়ার টেবিল, আবার খাবার টেবিলেই চলে কাজের প্রস্তুতি। ফলে এসব জায়গায় প্রয়োজনীয় জিনিস জমে থাকা অস্বাভাবিক নয়।

গবেষণায় অংশ নেওয়া এক দম্পতি জানিয়েছেন, তাঁদের খাবার টেবিল দিনের বেলায় ব্যাগ, পানির বোতল ও নানা ব্যক্তিগত জিনিস রাখার জায়গা হয়ে ওঠে। সন্ধ্যায় তাঁরা সেগুলো সরিয়ে টেবিলটি খাবার জন্য ব্যবহার করেন। আরেকজন জানিয়েছেন, রান্নাঘরের তাকে কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস চোখের সামনে রাখলে বাইরে যাওয়ার সময় সেটি সঙ্গে নিতে ভুল হয় না।

দেখতে অগোছালো মনে হলেও এসব ব্যবস্থা তাঁদের দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করে। শুধু ঘরকে পরিপাটি দেখানোর জন্য সবকিছু সরিয়ে ফেললে বরং প্রয়োজনের সময় জিনিস খুঁজে পেতে সমস্যা হতে পারে।

মায়ের রান্নাঘরের কাউন্টারও খাবার টেবিল ও কাজের জায়গা, দুই কাজেই ব্যবহৃত হয়। সেখানে কলম, খেলনা ও অন্যান্য জিনিস জমে থাকে। তবে খাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা থাকলে তিনি সেগুলো নিয়ে খুব একটা চিন্তা করেন না।
অর্থাৎ, ঘরের কোথাও কিছু জিনিস পড়ে আছে মানেই তা অপ্রয়োজনীয় বা অসুবিধার কারণ, এমন নয়। কখনো কখনো ওই ব্যবস্থাই ঘরকে আরও কার্যকর করে তোলে।

বিজ্ঞাপন

জড়িয়ে থাকে সম্পর্কও

ঘর গোছানো শুধু জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের অভ্যাস, একে অপরের প্রতি সম্মান ও বোঝাপড়াও জড়িয়ে থাকে।

গবেষণায় এক বাবার কথা উঠে এসেছে, যিনি মেয়ের সোয়েটার সব সময় গুছিয়ে না রেখে চেয়ারের পেছনে ঝুলিয়ে রাখতেন। আগে মেয়েটি সোয়েটার মেঝেতে ফেলে রাখত। এখন সেটি অন্তত চেয়ারে রাখছে। বাবার কাছে এই পরিবর্তনটুকুই ছিল অগ্রগতি। তাই তিনি এটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখতেন।

আরেকজন জানিয়েছেন, সঙ্গীর কিছু অগোছালো অভ্যাস তিনি মেনে নেন। কারণ, ঘরটি শুধু তাঁর একার নয়; সঙ্গীরও। একজনের পছন্দ অনুযায়ী পুরো ঘর সাজানো হলে অন্যজনের অভ্যাস ও স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গাটি উপেক্ষিত হতে পারে।

এ থেকে বোঝা যায়, পরিবারের সদস্যদের অভ্যাস বদলাতে উৎসাহ দেওয়া এবং তাঁদের নিজস্বতা মেনে নেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। সবকিছু নিজের মতো করে গুছিয়ে রাখার চেয়ে কখনো কখনো অন্যের সুবিধা ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়াই বেশি বিবেচনাপ্রসূত।

বিজ্ঞাপন

তাহলে কি ঘর গোছানো বন্ধ করে দেবেন?

একেবারেই নয়। ঘরের অগোছালো অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে মানসিক চাপ, অস্বস্তি ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে না পাওয়া, ঘরের জায়গা ব্যবহার করতে না পারা কিংবা অন্য কাউকে বারবার পরিষ্কার করতে হলে অন্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তাই কোন জিনিস কোথায় রাখা উচিত, তা ঠিক করার আগে ভাবতে হবে। সেটি কি সত্যিই অসুবিধা তৈরি করছে, নাকি দৈনন্দিন কাজ সহজ করছে? গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারগুলো সাধারণত তিনভাবে ঘরের অগোছালো অবস্থা সামলায়। কেউ জিনিসপত্র সরিয়ে রাখেন, কেউ কিছুটা অগোছালোভাব মেনে নেন, আবার কেউ জিনিসগুলো চোখের আড়ালে রাখার ব্যবস্থা করেন। যেমন, একজন নারী তাঁর সঙ্গীর গলফ খেলার বল ও অন্যান্য জিনিস ক্যাবিনেটের নিচে সরিয়ে রাখতেন, যাতে সেগুলো চোখে না পড়ে। অন্যদিকে, আরেকজন প্রতিদিনের সাপ্লিমেন্ট রান্নাঘরের কাউন্টারে রাখতেন। কারণ, সেগুলো আলমারিতে তুলে রাখলে খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

অর্থাৎ, ঘর গোছানোর ক্ষেত্রে সবার জন্য একটিমাত্র নিয়ম কার্যকর হয় না। যে জিনিস একজনের কাছে অপ্রয়োজনীয়, সেটিই অন্যজনের দৈনন্দিন রুটিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

পরিপাটি ঘরের আসল মানে কী?

ঘর একবার গুছিয়ে রাখলেই তা চিরকাল পরিপাটি থাকবে না। ব্যবহার করতে করতে জিনিসপত্র ছড়িয়ে পড়বে, প্রয়োজন হলে আবার গুছিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি মুহূর্তে ঘর নিখুঁত রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি বারবার দরকারি জিনিস সরিয়ে রাখতে হয়, তাহলে সেই গোছানো ব্যবস্থাই একসময় বাড়তি কাজের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তাই ঘর গোছানোর সময় শুধু দেখতে কেমন লাগছে, সেটিই বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং পরিবারের সদস্যরা সেখানে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারছেন, প্রয়োজনীয় জিনিস সহজে পাচ্ছেন কি না এবং সবার অভ্যাসের সঙ্গে মানানসই কি না, এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘর সুন্দর ও পরিপাটি রাখা অবশ্যই ভালো। তবে সেই সৌন্দর্যের জন্য দৈনন্দিন জীবনকে অযথা কঠিন করে তোলার প্রয়োজন নেই। কোথাও কয়েকটি বই, টেবিলে রাখা পানির বোতল কিংবা চেয়ারের পেছনে ঝুলতে থাকা একটি পোশাক সব সময় অগোছালো জীবনের লক্ষণ নয়। কখনো কখনো এগুলোই বলে দেয়, ঘরটি তার বাসিন্দাদের প্রয়োজন মেনে ব্যবহার করা হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত, আদর্শ ঘর সেটিই নয়, যেখানে সবকিছু সব সময় নিখুঁতভাবে সাজানো থাকে। বরং যে ঘরে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন, নিজের অভ্যাস অনুযায়ী চলতে পারেন এবং একে অপরের জায়গাকে সম্মান করতে পারেন, সেই ঘরই সত্যিকারের গোছানো।

ছবি: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৫: ১৫
বিজ্ঞাপন