
২৭8 বছরের পুরনো ঢাকার আজিমপুর গোরস্থান শাহি মসজিদ। রাজধানীর নিউমার্কেট থেকে সোজা বিজিবি ৩ নম্বর গেটসংলগ্ন আজিমপুর পুরাতন কবরস্তানের সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে নতুন লাইনের সরু রাস্তা দিয়ে বেশ কিছদূর এগিয়ে গেলে প্রাচীন একটি মসজিদ। এলাকাবাসীর কাছে এটি আজিমপুর গোরস্তান শাহি মসজিদ হিসেবে পরিচিত।

মসজিদটিতে এতবার সংস্কার করা হয়েছে যে একে বাইরে থেকে একটি আধুনিক স্থাপত্যের মসজিদ বলে মনে হয়। এটি একটি দ্বিতল ইমারত, যার নিচের অংশ ভল্টেড প্লাটফর্ম। আজিমপুর মসজিদটি কাছাকাছি অবস্থিত খান মুহাম্মদ মৃধা মসজিদের স্থাপত্যের নকশার অনুরূপ করে তৈরি করা হয়েছে।
মসজিদটি একক গম্বুজ এবং একটি দ্বিতল কাঠামোবিশিষ্ট। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, গম্বুজটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। এতে পাঁচটি খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে এবং প্রতিটি দরজার ওপরে দুটি খিলানবিশিষ্ট একটি অর্ধগম্বুজবিশিষ্ট খিলান রয়েছে। মসজিদটি বাংলাদেশের একটি অনন্য স্থাপত্য; কারণ, এটিই অস্তিত্বের সর্বশেষ কাঠামো, যার ছাদে অর্ধগম্বুজবিশিষ্ট একটি একক গম্বুজ রয়েছে। ওপরে আগে প্রধান মসজিদ ভবন ছিল।

মসজিদের উত্তর দিকে একটি ইমারত ছিল, এটি আয়তাকার, দক্ষিণে এর পরিমাপ ১১.৫৮ মিটার, পূর্ব–পশ্চিমে ৭.৩২ মিটার। প্রধান গম্বুজটিকে সরাসরি একটি অষ্টভুজাকৃতি পিপার ওপর বসানো হয়েছে। এ ধরনের ইমারতকে আবাসিক মাদ্রাসা মসজিদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মসজিদের ওপরের ছাদ সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পূর্ব–বাংলার স্থাপত্যে অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে। আজিমপুর মসজিদটি টিকে থাকা সবচেয়ে বড় নিদর্শন এমন স্থাপত্যশৈলীর।
বাইরে থেকে খুব সাধারণ একটি মসজিদ মনে হলেও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, মসজিদটি প্রায় তিন শ বছরের পুরনো। এ মসজিদের গম্বুজের অনেকটা তুরস্কের অটোমান আমলের স্থাপত্যশৈলীর মিল রয়েছে। ১৭৪৬ সালে নবাব আলীবর্দী খাঁর আমলে নির্মিত প্রাচীন এ মসজিদটির কথা মহল্লাবাসীর অনেকেই জানতেন না। মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি মহসিন মৃধা জানান, ২০১৭ সালে মসজিদটির একাংশ ভেঙে ফেলার পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপে ভাঙার কাজ বন্ধ থাকায় মসজিদটি মহল্লাবাসীর কাছে নতুন করে পরিচিতি পায়।

এ মসজিদটি সম্প্রসারণের জন্য ছয়তলা ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে মসজিদ কমিটি ভাঙার কাজ শুরু করে। মসজিদদের উত্তরাংশের একাংশ তিন তলা পর্যন্ত ভাঙার পর বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীদের নজরে এলে বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ববিদদের নজরে আসে। তাঁদের অনুরোধে মসজিদটি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক মসজিদটির উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।
মসজিদটিতে প্রবেশের গেটে ছয়তলা ভবন পর্যন্ত ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদটির একটি অংশে একটি মাদ্রাসাও রয়েছে। এখন এখানে গেলে বাইরে থেকে আধুনিক আদল দেখে এটা যে মুগল স্থাপত্যে নির্মিত, সেটা বোঝার উপায় নেই।
মাদ্রাসার একজন শিক্ষার্থী সাইদুল আমিন জানান, মসজিদটি ওয়াকফ সম্পত্তি।

মসজিদটি পুরনো হওয়ায় বহু জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছিলো। সে কারণে মসজিদ পরিচালনা কমিটির বৈঠকে মসজিদটির একাংশ ভেঙে প্রথমে ছয়তলা ভবন স্থাপন ও পরবর্তী অপর অংশ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশে এটি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দেয়া হয় ।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজিমপুর পুরাতন কবরস্তানসংলগ্ন এ মসজিদে মহল্লাবাসী ছাড়াও কবর জিয়ারত করতে আসা মানুষ প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। এ ছাড়া জুমাবার, রোজার সময় তারাবিহ, শবে বরাত ও ঈদের নামাজ পড়েন।
ছবি: শিশির চৌধুরী