
৯ সেপ্টেম্বর জেন–জিদের বিক্ষোভের মুখে নেপালে ছড়িয়ে পড়ে গণ–অভ্যুথান। মুহূর্তেই আগুন লেগে যায় সরকারি ভবন থেকে শুরু করে শহরের নান্দনিক স্থাপনাগুলোয়। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় উঠে এসেছে কাঠমান্ডুর শতবর্ষী স্থাপনা সিংহ দরবার।

শক্তি, ঐশ্বর্য আর শিল্পকলার প্রতীক এই প্রাসাদ, যেটা এখন কেবলই ধ্বংসস্তূপ। আগুনে পোড়া সিংহ দরবারের ছবি আহত করেছে ইতিহাসপ্রেমী বা স্থাপত্যবিদদের তো বটেই, মন খারাপ হয়েছে সাধারণ ভ্রমণপ্রেমীদেরও। এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে খানিকটা নষ্টালজিক হয়ে পড়েছি। কারণ, ২০১৪ সালে এক ইয়ুথ সামিটে গিয়েছিলাম নেপালে। সেই সুবাদে ভ্রমণ করেছিলাম ভক্তপুর, বসন্তপুর, শম্ভুনাথ মন্দির আর সিংহ দরবারে। খবরে আগুনে পুড়ে যাওয়া সিংহ দরবারের ভিডিও ফুটেজ দেখে মনে হলো এটা শুধু নেপালের নয়, বিশ্ব ইতিহাসেরই ক্ষতি। একটি দেশের ঐতিহ্য ভেঙে পড়া মানে মানবজাতিরই এক টুকরো স্মৃতি মুছে যাওয়া। সিংহ দরবারে কী আছে, কেন তা এত মূল্যবান, সেটা নিয়ে লেখার ইচ্ছা সামলানো গেল না।
ভ্রমণপিপাসুদের কাছে কাঠমান্ডু মানেই মন্দির, পাহাড় আর সংস্কৃতির ভান্ডার। কিন্তু সিংহ দরবারের গল্পে মিশে আছে আভিজাত্য, রাজনীতি ও হারিয়ে যাওয়া স্থাপত্য মহিমার ছাপ। এক অর্থে, প্রাসাদটির বিলুপ্তি মানে নেপালের ইতিহাস থেকে নিজেদেরই এক টুকরো অতীতকে হারিয়ে ফেলা। কাঠমান্ডু ভ্রমণে গেলে সিংহ দরবারের স্থানীয় ইতিহাস খুঁজে দেখা মানে শুধু একটি প্রাসাদ নয়, বরং নেপালের আত্মার সঙ্গে পরিচিত হওয়া।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর হৃদয়ে দাঁড়িয়ে সিংহ দরবার, যা রানা বংশের ক্ষমতা, আভিজাত্য আর শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির এক অমূল্য নিদর্শন। বাবর মহল ও থাপাথালি দরবারের উত্তর দিকে ভদ্রকালীর পূর্ব প্রান্তে বিস্তৃত এই প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল ১৯০৮ সালের জুন মাসে। এর নকশা করেছিলেন কুমার নরসিংহ রানা ও কিশোর নরসিংহ রানা, আর নির্মাতা ছিলেন চন্দ্র শামসের জে.বি.আর।
পেলেডিয়ান, করিন্থিয়ান ও নব্য ধ্রুপদি শৈলীর মিশ্রণে সিংহ দরবার হয়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্থাপত্য সৌন্দর্য। অগ্নিকাণ্ডের আগে এখানে ছিল সাতটি আঙিনা ও প্রায় ১ হাজার ৭০০ কক্ষ। প্রতিটি কক্ষের মেঝেতে ছিল ইতালিয়ান মার্বেল, রুপালি আসবাবপত্র ও স্ফটিক ঝাড়বাতির ঝলকানি। রাজ্য সভাঘরটি ছিল সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে অলংকৃত স্থান, যেখানে মুড়ানো কাচ, ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি, বেলজিয়ান আয়না এবং দেয়াল-ছাদে খোদিত ফুলের নকশা মুগ্ধ করত আগন্তুকদের। এমনকি চন্দ্র শামসের একটি ব্যক্তিগত নাট্যশালাও নির্মাণ করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘গ্যালারি বৈঠক’।

প্রথমে ব্যক্তিগত বাসভবন হিসেবে শুরু হলেও অল্প দিনেই চন্দ্র শামসের এটি নেপাল সরকারের কাছে বিক্রি করে দেন। এর পর থেকে সিংহ দরবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৫১ সালে রানা শাসনের অবসান ঘটলেও মোহন শামসের ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এখানে বসবাস করেন। পরে প্রাসাদটিকে জাতীয় সম্পত্তি ঘোষণা করে সরকারি কার্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। সংসদের উভয় কক্ষ, প্রায় ২০টি মন্ত্রণালয় এবং এমনকি রেডিও নেপাল ও নেপাল টেলিভিশনের সদর দপ্তরও একসময় এই প্রাসাদেই ছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিংহ দরবার তার মহিমা হারাতে থাকে। এই ঐতিহাসিক নিদর্শন বারবার বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে—১৯৭৩ সালের অগ্নিকাণ্ড, ২০১৫ সালের ভূমিকম্প এবং সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের আন্দোলনে প্রধান ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

আজ সেখানে আর সেই প্রাসাদের জাঁকজমক নেই, আছে শুধু ইতিহাসের স্তূপ আর স্মৃতির ভার। কাঠমান্ডু ভ্রমণে গেলে সিংহ দরবারের ইতিহাস জানা মানে কেবল একটি প্রাসাদের কাহিনি নয়, বরং নেপালের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য–ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হবে—আমরা যেন হারিয়েছি শুধু একটি প্রাসাদ নয়, নিজেদের ইতিহাসেরই এক অমূল্য অংশ।
ছবি: লেখক