
ডক্টর সৈয়দ মাহমুদুল হাসানের ‘বাংলাদেশের মসজিদ’ বই অনুযায়ী ‘প্রাক–মোগল যুগে অর্থাৎ সুলতানি আমলে, ইমারত কিংবা মসজিদ নির্মাণে শক্ত পোড়ামাটির ইট ব্যবহার করা হতো। এসব ইট দারুণ টেকসই। আর সেটা আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকা মসজিদ ও ইমারতগুলো বলে দেয়। পোড়ামাটির ইটের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য দেওয়া হতো পাথরের আচ্ছাদন। কষ্টিপাথরগুলো বেশির ভাগ সময় বিহারের রাজমহল পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা হতো।

পাথরের গায়ে দেখা যেত খোদাই করা শিলালিপি, অপূর্ব সুন্দর লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশা। ভারত উপমহাদেশের মুলতান, গুজরাটের ঢোলকা এবং দাক্ষিণাত্যের বিদর ও গুলবার্গায় ইটের তৈরি মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজার দেখা যায়। একমাত্র বাংলাদেশেই সর্বজনীনভাবে ইটের ব্যবহার হয়েছে। গম্বুজ নির্মাণে বাংলাদেশের সেসময়ের নির্মিত মসজিদগুলো বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরাই প্রথম প্রকৃত খিলান প্রচলন করেন, যে খিলান পরপর পাশাপাশি ইট সাজিয়ে নির্মিত হতো।’
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতে, স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী বেরাইদ ভূঁইয়াপাড়া জামে মসজিদ প্রাক-মোগল আমলে নির্মিত। ১৫০৫ সালে সোনারগাঁয় প্রতিষ্ঠিত বাবা সালেহ মসজিদের সঙ্গে হুবহু মিলের কারণে এর সময়কাল ৫০০ বছরের অধিক বলে ধারণা করা হয়। বেরাইদ মসজিদের গ্রাম বলে পরিচিত। এই গ্রামে সুলতানি, মোগল, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর ১০টি মসজিদ আছে।

মসজিদে নামাজ পড়তে আসা বয়স্ক মুসল্লি জমির সিদ্দিকী ও রায়হান হায়দারের ভাষ্যে, বেরাইদ গ্রামে অতীত নিদর্শন হিসেবে আরও একাধিক মসজিদ ছিল। দুটি ভেঙে গেছে এবং দুটি সংস্কার করে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। একই গ্রামে একসঙ্গে প্রাচীন ঐতিহ্যের এত মসজিদের উপস্থিতি খুবই বিরল। বালু নদের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বেরাইদ গ্রামটি সুপ্রাচীন। তবে এখন লেগেছে নগরায়ণের ছোঁয়া। একসময় এই গ্রামের প্রবেশমুখে বড় করে লেখা ছিল, ‘মসজিদের গ্রামে আপনাকে স্বাগতম।’ এখন আর এটি লেখা নেই।
একসময় ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীর বাড়ি ছিল বেরাইদে। তাঁরা ঢাকার নবাব আবদুল গনি কিংবা ভুট্টো হাজির মতো ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চামড়া, লবণসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করতেন। তাঁদের মধ্যে হেদায়েতউল্লাহ মোল্লা, এলু ব্যাপারী, আবদুল গনি ব্যাপারী, শরীয়ত উল্লাহ তালুকদার অন্যতম। তাঁদের পূর্বপুরুষরা সুলতানি ও মোগল আমল থেকেই ব্যবসা–বাণিজ্যে সফল ছিলেন। মূলত তাঁদের হাতেই ১৫০৫ সালে মোগল আমলে বেরাইদ ভূঁইয়াপাড়ায় প্রাচীন মসজিদটি নির্মিত হয়।

বেরাইদ গ্রামের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এটি। উত্তর বাড্ডা থেকে বেরাইদের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার। বেরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গেই এই মসজিদের অবস্থান। উত্তর বাড্ডা থেকে সিএনজি অটোরিকশায় করে সরাসরি বেরাইদ বাজার যাওয়া যায়। ২০০২ সালে ভূঁইয়াপাড়া মসজিদকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। মসজিদটি বিভিন্ন সময়ে সংস্কার এবং উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পুরোনো স্থাপত্যের অবশেষ হিসেবে পশ্চিম দেয়াল এখনো অক্ষত আছে। গম্বুজটি আগের আদলেই আছে বলে জানা যায়। তাই মসজিদটি পুরাতত্ত্ব নিদর্শন হিসেবে প্রত্বতাত্ত্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
সেফ দ্য হেরিটেজ নামক অনলাইন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, এক গম্বুজের ভূঁইয়াপাড়া জামে মসজিদ বর্গাকার পরিকল্পনায় তৈরি। এর বাইরের পরিমাপ ২১ বর্গফুট এবং ভিত্তিভূমি থেকে প্যারাপেট (প্যারাপেট দেয়াল সাধারণ দেয়াল থেকে ভিন্ন, এর চারদিক থেকেই পরিবেশের স্পর্শ থাকে) পর্যন্ত উচ্চতা ১৭ ফুট ৬ ইঞ্চি। মসজিদের কিবলা দেয়াল এবং গম্বুজটি এখনো অক্ষত আছে। পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণের কারণে মসজিদের আদি বৈশিষ্ট্য অনেকটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। কিবলার দেয়ালে একটি মিহরাব আছে, যা বাইরের দিকে বের হয়ে আছে।

মিহরাবের উদ্গত অংশের উভয় পাশে দুটি অষ্টকোনাকার প্লাস্টার বা ক্ষুদ্রাকৃতির মিনার মসজিদের প্যারাপেট পর্যন্ত উঠে গেছে। তবে কিবলা দেয়ালে মোট চারটি মিনার আছে। কোনার দুটি বড় ও মাঝের দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট। কোনার মিনারের উচ্চতা দুই ফুট, আয়তন গোড়ার দিকে ১ ফুট ৬ ইঞ্চি ও ওপরের দিকে ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি। মাঝের মিনারের প্রতিটির উচ্চতা ১ ফুট, মিনারের শীর্ষের উচ্চতা ১ ফুট ৬ ইঞ্চি। প্রত্যেক মিনারের শীর্ষে কলস মোটিফ ফিনিয়াল (মিনারশীর্ষে বিশেষ নকশা) বসানো। বর্তমানে মসজিদের পশ্চিম দিক ছাড়া অন্য তিন দিকের আদি দেয়াল অবশিষ্ট নেই। সংগত কারণেই সেগুলোতে মিনারের অস্তিত্ব নেই। অষ্টভুজাকৃতির ড্রামের ওপর মিনার স্থাপিত এবং গম্বুজের ড্রাম বহু ফালিযুক্ত আন্ধখিলান দ্বারা সংযুক্ত। প্রকৃতপক্ষে মসজিদটি পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণের সময় দেয়াল কেটে উত্তর-দক্ষিণ কোনায় দুটি স্তম্ভে পরিণত করা হয়েছে। প্রতিটি স্তম্ভের আয়তন ১১ ফুট ৬ ইঞ্চি।
মসজিদের পুরোনো অংশের আয়তন ১৬ বাই ১৬ ফুট। এর মেঝে লাল রঙের। পরবর্তী সময়ে ৩ ইঞ্চি পুরু মোজাইক করা হয়। আদি অবস্থায় ভেতরে তিন সারিতে একসঙ্গে ৩৩ জন মুসল্লি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। মসজিদের পূর্ব দিকের মূল দেয়াল ভেঙে প্রথম মসজিদ সম্প্রসারণ করা হয় ১৩১৩ বঙ্গাব্দের ১৮ শ্রাবণ (১৯০৬ সাল)। এই তারিখটি একটি কাঠের খিলানে লেখা ছিল বলে জানান মহল্লার প্রবীণ মুসল্লি সাইদুর রহমান মির্জা। পূর্ব পাশের দেয়ালে মসজিদে প্রবেশের জন্য একটি মাত্র দরজা ছিল। প্রথম পর্যায়ে পূর্ব দিকে ১৬ বাই ১৬ ফুট বাড়ানো হয়। পরে পূর্ব দিকে ৫১ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪৪ ফুট প্রস্থের টিনশেড বারান্দা নির্মাণ করা হয়।

তৃতীয় পর্যায়ে ১৯৮২ সালে মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণের আদি দেয়াল ভেঙে উভয় দিকে বাড়ানো হয় এবং পূর্ব দিকের টিনশেড বারান্দা পাকা করা হয়। আদি দেয়ালের নিচে প্রাচীন আমলের ‘কড়ি’ পাওয়া গিয়েছিল বলে মসজিদের মুয়াজ্জিম ইকবাল কাদের জানান। তিনি আরও বলেন, ওই সময় মসজিদের মোতোওয়ালি ছিলেন আবদুর রব ভূঁইয়া। চতুর্থ পর্যায়ে ১৯৯৯ সালে পূর্ব দিকের বারান্দা দোতলা করা হয়। বারান্দার দোতলার আয়তন নিচের সমপরিমাণ। বেরাইদ ভূঁইয়াপাড়া জামে মসজিদের আদি অংশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত।
বেরাইদে সুলতানি আমলের মসজিদের অবস্থানের কারণে পুরাতত্ত্ববিদদের ধারণা, বেরাইদ অনেক পুরোনো জনপদ। বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম রাজত্বের সময়ে সেখানে অনেক মসজিদ, মন্দির, এমনকি বিহার পর্যন্ত গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। এ ব্যাপারে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালালে বেরাইদ এলাকায় পুরোনো নিদর্শন আবিষ্কৃত হতে পারে। শুধু বেরাইদ নয়, মিরপুর ও রায়েরবাজার এলাকায়ও প্রাক-মোগল আমলের নিদর্শন কিংবা মসজিদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। তাই ঢাকা শহরের লাগোয়া এসব এলাকায় পাওয়া যেতে পারে প্রাচীন ইমারত কিংবা ভবন।
তথ্যসূত্র: কিংবদন্তির ঢাকা (নাজির হোসেন)
ছবি: শিশির চৌধুরী