ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা: ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে ইতিহাসের এক অনন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মেসির পায়ে বল গড়ালেই পৃথিবীর কোটি কোটি চোখ একসঙ্গে থমকে যায়। কিন্তু আজকের গল্প শুধু মেসির নয়, তাঁকে ঘিরেও। কারণ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করেছে এই মুহূর্তের জন্য। লিওনেল মেসি প্রায় সব বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই খেলেছেন, জিতেছেন, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এই প্রথম মেসি প্র্রতিপক্ষ হবেন ইংল্যান্ডের
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এই প্রথম মেসি প্র্রতিপক্ষ হবেন ইংল্যান্ডের

অথচ আর্জেন্টিনার জার্সিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কখনোই মাঠে নামা হয়নি তাঁর। সেই অপূর্ণতাই এবার পূরণ হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মহামঞ্চে। আর প্রতিপক্ষ যদি হয় ইংল্যান্ড, তবে সেটি আর শুধু ফুটবল থাকে না; হয়ে ওঠে ইতিহাস, রাজনীতি, আবেগ আর উত্তরাধিকারের এক বিরল দ্বৈরথ।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসের অপেক্ষায় ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ডের জয় সেই একবারই ১৯৬৬ সালে
ইংল্যান্ডের জয় সেই একবারই ১৯৬৬ সালে

১৯৬৬ সালে ওয়েম্বলিতে নিজেদের একমাত্র বিশ্বকাপ জিতেছিল ইংল্যান্ড। এরপর কেটে গেছে কয়েক প্রজন্ম। অসংখ্য প্রতিভাবান ফুটবলার এসেছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু বিশ্বকাপের শিরোপা আর ধরা দেয়নি।
এবার সেই দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ করার সুযোগ তাদের সামনে। কোচ টমাস টুখেলের দল যদি আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারে, তাহলে শুধু ফাইনালেই উঠবে না; ছয় দশকের স্বপ্নও আবার হাতের নাগালে চলে আসবে।
গত এক দশকে ইংল্যান্ডের গল্পটা যেন একই রকম। ২০১৮ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল, ইউরোর দুটি ফাইনাল—প্রতিবারই শেষ মুহূর্তে এসে থেমে যাওয়া। ক্রোয়েশিয়ার কাছে সেমিফাইনাল হার, ইতালির কাছে টাইব্রেকারে ইউরো ফাইনাল, এরপর স্পেনের কাছে আরেকটি ফাইনালের পরাজয়—সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড যেন হয়ে উঠেছে ''প্রায় সফল'' একটি দল।
কিন্তু ফুটবলে ''প্রায়'' বলে কিছু নেই। টুখেলের ইংল্যান্ড এবার সেই পরিচয় বদলাতে চায়।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসের শিকড়

মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে আন্তোনিও রাতিনকে
মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে আন্তোনিও রাতিনকে

বিশ্ব ফুটবলে কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো কেবল নব্বই মিনিটের নয়। ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার দ্বৈরথ ঠিক তেমনই। এখানে স্কোরলাইনের চেয়ে বেশি আলোচিত হয় ইতিহাস, রাজনীতি, জাতীয় আবেগ আর অসমাপ্ত হিসাবের গল্প।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে। ওয়েম্বলির কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে ফাউলের দায়ে মাঠছাড়া করা হয়। মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি, দুই দলের উত্তেজনা এবং ম্যাচ-পরবর্তী ঘটনাগুলো সেই ম্যাচকে ইতিহাসের অংশ করে তোলে। সেই বিতর্কের জেরে ফুটবলে আসে লাল ও হলুদ কার্ড– ট্র্যাফিক লাইটের ধারণা থেকে। এই রাতিনই আর্জেনিন্টার এবারের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের দিন মারা যান; এজন্য গোটা দল কালো ব্যান্ড পরে খেলেন।

প্রতীকী ছবি: উভয় দলের মধ্যে জার্সি বদলে বাধা দেন ইংলিশ কোচ স্যার আলফ রামজি (মাঝে)
প্রতীকী ছবি: উভয় দলের মধ্যে জার্সি বদলে বাধা দেন ইংলিশ কোচ স্যার আলফ রামজি (মাঝে)


ইংল্যান্ডের কোচ স্যার আলফ র‍্যামজি নিজের খেলোয়াড়দের আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের সঙ্গে জার্সি বদল করতে দেননি। পরে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের "অ্যানিম্যালস" বলেও মন্তব্য করেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ফুটবলের অন্যতম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

হ্যান্ড অব গড থেকে বেকহ্যামের মুক্তি

সেই বিখ্যাত হ্যান্ড অব গড
সেই বিখ্যাত হ্যান্ড অব গড

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। চার বছর আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি তখনও তাজা। ফলে ম্যাচটি ছিল শুধু ফুটবল নয়, দুই দেশের জাতীয় আবেগেরও প্রতীক।

সেই ম্যাচে ম্যারাডোনার দ্বিতীয় গোল
সেই ম্যাচে ম্যারাডোনার দ্বিতীয় গোল

সেদিন দিয়েগো ম্যারাডোনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি গোল করেন। প্রথমটি ''হ্যান্ড অব গড'', যা আজও বিতর্কের প্রতীক। আর কয়েক মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে করা তাঁর দ্বিতীয় গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃত। আর্জেন্টিনা জেতে ২–১ ব্যবধানে এবং পরে বিশ্বকাপও নিজেদের করে নেয়।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখে বেকহ্যাম
১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখে বেকহ্যাম

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে আবারও দেখা হয় দুই দলের। মাত্র ১৮ বছর বয়সী মাইকেল ওয়েনের দুর্দান্ত একক গোল নতুন এক তারকার জন্ম ঘোষণা করে। কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ডে। দশজনের ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয়।

২০০২ সালে পেনাল্টি থেকে গোল করে শাপমোচন করেন বেকহ্যাম
২০০২ সালে পেনাল্টি থেকে গোল করে শাপমোচন করেন বেকহ্যাম

চার বছর পর, ২০০২ বিশ্বকাপে, বেকহ্যাম যেন নিজের অতীতের জবাব দেন। তাঁর পেনাল্টির একমাত্র গোলে জয় পায় ইংল্যান্ড। যদিও সেই পেনাল্টি নিয়েও বিতর্ক ছিল; আর্জেন্টিনার দাবি, মাইকেল ওয়েনকে অবৈধভাবে ফাউল করা হয়নি।
এভাবেই ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দুই দলের প্রতিটি বিশ্বকাপ লড়াই নতুন গল্প লিখেছে—কখনো বিতর্ক, কখনো প্রতিশোধ, কখনো কিংবদন্তির জন্ম।

মহারণ উভয় কোচেরও
মহারণ উভয় কোচেরও

বর্তমান ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলও স্বীকার করেছেন, এত ইতিহাস বহন করা একটি ম্যাচকে "আর দশটি ম্যাচের মতো" ভাবা যায় না। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির মতে, দুই দেশের মানুষই এই স্মৃতিগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে। তাই ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা কখনোই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়।

উত্তরাধিকার বনাম নতুন স্বপ্ন

এই ম্যাচের আবেগের কেন্দ্রে রয়েছে দুই প্রজন্মের দুই প্রতীক। একদিকে লিওনেল মেসি—যিনি নিজের অসাধারণ ক্যারিয়ারে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে জুড বেলিংহ্যাম—নতুন প্রজন্মের মুখ, যিনি নিজের উত্তরাধিকার লেখা শুরু করতে চান।
একজন নিজের কিংবদন্তিকে আরও উজ্জ্বল করতে চান, অন্যজন নিজের কিংবদন্তির প্রথম অধ্যায় লিখতে চান। ফুটবলের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই। এ কারণেই একে বলা হয় দ্য বিউটিফুল গেম।

শুধু একটি ম্যাচ নয়

উভয় দলের লড়াই বহুমাত্রিক
উভয় দলের লড়াই বহুমাত্রিক

টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড বদলেছে শুধু কৌশলে নয়, মানসিকতায়ও। বড় ম্যাচের চাপকে ভয় না পেয়ে উপভোগ করার শিক্ষা দিয়েছেন তিনি। দলের আত্মবিশ্বাস আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
অন্যদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা জানে, তাদের সামনে আরেকটি ইতিহাস লেখার সুযোগ। একদিকে হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যামের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের নতুন প্রজন্ম, অন্যদিকে মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনার শেষ আরেকটি বড় স্বপ্ন।
এই সেমিফাইনাল তাই শুধু দুটি দলের লড়াই নয়। এক দল ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান চায়, অন্য দল তাদের সোনালি অধ্যায়ে আরেকটি উজ্জ্বল পৃষ্ঠা যোগ করতে চায়।
নব্বই মিনিট শেষে একটি স্বপ্ন ভেঙে যাবে, আরেকটি স্বপ্ন আরও বড় হয়ে উঠবে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে নির্মম অথচ সবচেয়ে সুন্দর সত্য এটাই। কারণ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত শুধু ট্রফির গল্প নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।
তথ্যসূত্র: বিবিসি স্পোর্টস

ছবি: ইন্সটাগ্রাম, উইকপিডিয়া, এআই

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৮: ২২
বিজ্ঞাপন