
কথায় আছে, সকাল দেখলেই বোঝা যায় দিন কেমন যাবে। তাই সকালটা সুন্দর হওয়া জরুরি। কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই কী আর মন ভালো থাকে? যদি চোখ খুলতেই ঘিরে ফেলে ক্লান্তি, মাথায় ঘুরতে থাকে একরাশ দুশ্চিন্তা। সকাল তো নষ্টই, পুরো দিনের ওপরেও পড়ে একটি বাজে প্রভাব। আমরা অনেকেই মনে করি সকালের রুটিন ভালো হলেই সকাল সুন্দর হয়। কিন্তু এটি মোটেও কার্যকর কোনো পন্থা হয়। আগের রাতেই এমন কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত, যা আপনার সকালের মেজাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সকালের রুটিন ভালো রাখলেই হবে না—রাতের অভ্যাসগুলোও ঠিকঠাক হওয়া দরকার। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক, সকালে নিজের মেজাজ ঠিক রাখতে রাতে যা যা করতে হবে।
১. সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হোন
রাতের খাবারের পর কয়েক মিনিটের হাঁটা শরীর ও মন উভয়ের জন্য ভালো। দিনের শেষে ৩০ মিনিট ধীরে ধীরে হাঁটলে হজম ভালো হয়, একইসঙ্গে সারা দিনের ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে প্রস্তুত হয় মস্তিষ্ক।

যুক্তরাজ্যের মনোবিজ্ঞানী লি চেম্বারস বলেন, ''আমি নিজেই প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় হাঁটতে বের হই। এতে আমার মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং সারাদিনের সবগুলো চিন্তাভাবনা সুন্দরভাবে গুছিয়ে নেওয়া যায়। এর ফলে রাতে ঘুমানোর সময় মনটা শান্ত থাকে।'' এতে ঘুম ভালো হয়। আর রাতে একটি প্রশান্তির ঘুম মানেই একটি সুন্দর সকাল।
২.স্ক্রিন থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন
দিন শেষে বিছানায় শুয়ে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। অথচ এটি ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু।

ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লরি স্যান্টোস পরামর্শ দেন, ''ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আর চেষ্টা করা উচিত মোবাইল ফোনটিকেই একেবারে ঘরের বাইরে রাখা।'' অনেকেই অ্যালার্মের জন্য মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে ঘুমান। লরি স্যান্টোস পরামর্শ দেন মোবাইল ফোনের বিপরীতে অ্যালার্মের জন্য সাধারণ কোনো ঘড়ি বেছে নিতে।
৩. দিন শেষে উষ্ণ পানি দিয়ে গোসল করুন
সারাদিনের সব ক্লান্তি দূর করতে এটি বেশ কার্যকর। কারণ দিন শেষে উষ্ণ পানি দিয়ে গোসল শুধু শরীরকেই না, মনকেও প্রশান্তি দেয়। এটি আপনার শরীর ও মনের সারাদিনের সব ক্লান্তিই ধুয়ে ফেলার মতো কাজ করে।

মনোবিজ্ঞানী জাস্টিন গ্রোসো জানান, ''রাতের গোসল মেজাজ ভালো করে, ঘুম ভালো করতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে।'' যাঁরা একেবারেই গোসল করতে পারবেন না, তাঁরা অন্তত হালকা গরম পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে নিতে পারেন বা এক কাপ উষ্ণ পানীয় পান করে শরীরকে শ্রান্ত করে ঘুমাতে যেতে পারেন।
৪.বডি স্ক্যান অনুশীলন করুন
বডি স্ক্যান বলতে মূলত বোঝায় বিছানায় শুয়ে ধীরে ধীরে নিজের শরীরের প্রতি অংশে মনোযোগ দেওয়া। বডি স্ক্যান একটি সহজ অথচ কার্যকর মানসিক ব্যায়াম। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিজের শরীরের প্রতি অংশে মনোযোগ দিন—মাথা, ঘাড়, কাঁধ, বুক, পেট, পা ইত্যাদি। এই অনুভব যেন হয় গভীর মনোযোগের সঙ্গে, যেন আপনি নিজের অস্তিত্ব অনুভব করছেন। গবেষক কর্টল্যান্ড ডাল বলেন, ''বডি স্ক্যান আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে, স্ট্রেস কমায় এবং ঘুমকে গভীর করে তুলতে সাহায্য করে।'' ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে এটি করলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে প্রশান্তির দিকে প্রবেশ করে।

৫. দিনের পর্যালোচনা করুন, ছোট অর্জনগুলোকে স্বীকৃতি দিন
সারাদিন কী কী হলো—সে বিষয়ে একটু ভাবুন। কোন কাজটা শেষ করেছেন, কোন বাধা পেরিয়েছেন, কী শিখেছেন—সেগুলো লিখে রাখুন বা মনে মনে ভাবুন। গবেষকরা বলছেন, এভাবে প্রতিদিন নিজের অগ্রগতি সম্পর্কে সচেতন হলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে ও পরের দিনের কাজের জন্য অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনটি বিষয় লিখে ফেলুন—যে তিনটি কাজের কারণে আপনি কৃতজ্ঞ। হতে পারে সেটি কোনো প্রিয় মানুষের একটি ফোন কল, আপনার জন্য কারও হাসিমুখ, এমনকি এক কাপ চা। কৃতজ্ঞতার এই চর্চা মানসিক চাপ কমায় এবং জীবনে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
সূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড
ছবি: এআই