
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এত বড় পরিসরে ব্যবহার করা হবে। মাঠে হয়তো কোনো রোবটকে দৌড়াতে দেখা যাবে না, কিন্তু খেলার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অদৃশ্য সহকারী হিসেবে কাজ করবে এআই।

একসময় ফুটবলের বলের পরিবর্তন মানেই ছিল নতুন নকশা বা নতুন উপাদান। কিন্তু এবার বলের ভেতরেই লুকিয়ে থাকছে প্রযুক্তি।
অ্যাডিডাসের নতুন বিশ্বকাপ বলের ভেতরে যুক্ত করা হয়েছে বিশেষ সেন্সর। এই সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বলের গতি, অবস্থান, কোন খেলোয়াড় কখন বল স্পর্শ করেছেন এসব তথ্য মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
ফলে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রেফারিরা আরও নির্ভুল তথ্য পাবেন। ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম বল নিজেই হয়ে উঠছে তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো অফসাইড।
২০২৬ বিশ্বকাপে এই সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুল করতে ব্যবহার করা হবে উন্নত এআই প্রযুক্তি। প্রতিটি স্টেডিয়ামে থাকবে একাধিক উচ্চক্ষমতার ক্যামেরা, যা খেলোয়াড়দের শরীরের বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করে তাদের ত্রিমাত্রিক অবস্থান নির্ধারণ করবে।
বলের সেন্সর এবং ক্যামেরা থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অফসাইড শনাক্ত করতে পারবে সিস্টেম। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ভিএআর (VAR) রিভিউয়ের অপেক্ষাও কমে আসবে।

বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের বিশেষ স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হবে ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল প্রতিরূপ বা অ্যাভাটার।
এর ফলে টেলিভিশন সম্প্রচারে দর্শকরা বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর ব্যাখ্যা আরও বাস্তবসম্মতভাবে দেখতে পারবেন। কোনো সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, সেটি বোঝানোও হবে সহজ।

আধুনিক ফুটবলে শুধু প্রতিভা নয়, তথ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখন অনেক দলই প্রতিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করছে। কোন খেলোয়াড় চাপের মধ্যে ভুল বেশি করেন, কোন দিক দিয়ে আক্রমণ করলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বা কোন গোলরক্ষক পেনাল্টির সময় কোন দিকে ঝাঁপ দিতে পছন্দ করেন, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কোচরা।
ফলে মাঠের বাইরের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আজকের ফুটবলে একজন খেলোয়াড় শুধু খেলেন না, একই সঙ্গে তথ্যও তৈরি করেন।
তাঁর দৌড়, স্প্রিন্ট, পাস, শট, হৃদস্পন্দন থেকে শুরু করে শারীরিক চাপ—সবকিছুই বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোচ এবং চিকিৎসক দল বুঝতে পারছেন কার বিশ্রাম প্রয়োজন, কে চোটের ঝুঁকিতে আছেন এবং কার পারফরম্যান্স উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ফুটবলারদের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করতেও সাহায্য করতে পারে।

বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনসমাগমগুলোর একটি।
লাখো দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার ব্যবহার করা হবে এআইভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। স্টেডিয়ামের ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করে দর্শকদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হবে।
কোথাও অতিরিক্ত ভিড় হচ্ছে কি না, কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না এসব বিষয় আগেভাগেই শনাক্ত করতে পারবে প্রযুক্তি।
খেলার মাঠের বাইরেও এখন বড় লড়াই চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বিশ্বকাপ চলাকালে খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী, বিদ্বেষমূলক কিংবা অপমানজনক মন্তব্য শনাক্ত করতে বিশেষ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়দের জন্য আরও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে ফিফা।

ফুটবলের সৌন্দর্য সবসময়ই মানুষের আবেগে। শেষ মুহূর্তের গোলের আনন্দ কিংবা হারের বেদনা কোনো প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়।
তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ দেখিয়ে দেবে, আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তি আর কেবল সহায়ক নয়; এটি খেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। বলের ভেতর থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা পর্যন্ত সবখানেই থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়া।
হয়তো এটাই ফুটবলের নতুন যুগ, যেখানে মানবিক আবেগ এবং যন্ত্রের নির্ভুলতা একসঙ্গে লিখবে বিশ্বকাপের নতুন গল্প।
তথ্যসূত্র: FIFA Technology Reports, FIFA Innovation Programme, Adidas Connected Ball Technology, FIFA Semi-Automated Offside Technology (SAOT) documentation, FIFA Social Media Protection Service (SMPS), Associated Press (AP), Reuters এবং FIFA World Cup 2026 প্রযুক্তি বিষয়ক প্রকাশিত প্রতিবেদন।
ছবি: ফিফার ওয়েবসাইট ও ইনস্টাগ্রাম