
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আবারও বিক্ষোভে নামছেন তরুণেরা। দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এই আন্দোলনে সামনের সারিতে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন ২৯ বছর বয়সী এক পিএইচডি শিক্ষার্থী। তিনি নেহা বোরা।

থিয়েটারকর্মী ও ছাত্র আন্দোলনের এই সংগঠক সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন পুলিশের হাতে আটক হওয়ার সময় তাঁর প্রতিবাদী ভঙ্গি ও বিভিন্ন ভিডিও ভাইরাল হওয়ার কারণে। নেহা গত এক দশক ধরে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত। বামপন্থী এই ছাত্রসংগঠনটি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির জন্য পরিচিত। গত দুই বছর ধরে এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁকে রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি পুলিশের ব্যারিকেডের ওপর উঠে স্লোগান দিচ্ছেন এবং মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে প্রতিবাদ করছেন। আটক হওয়ার সময় তাঁর হাসিমুখের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

অনেকেই তাঁকে রাজপথের এই আন্দোলনের পোস্টার গার্ল বলে অভিহিত করছেন। চলুন তাঁর বিষয়ে ১০টি তথ্য জেনে নিই, যা তাঁকে ভালোভাবে চিনতে সাহায্য করবে আমাদেরকে আর সেই সঙ্গে দেবে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অনুপ্রেরণা।
২৯ বছর বয়সী পিএইচডি শিক্ষার্থী
নেহা বোরা ভারতের উত্তরাখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সেনা কর্মকর্তা হওয়ায় শৈশবে বাবার কর্মস্থল বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকেও বিভিন্ন শহরে থাকতে হয়েছে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।
থিয়েটারকর্মী থেকে রাজনৈতিক সংগঠক
নেহা শুধু ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, তিনি একজন থিয়েটারকর্মীও।

গত এক দশক ধরে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত। গত দুই বছর ধরে সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিবাদী ও সাহসী ইমেজ
পুলিশের বাধা, ব্যারিকেড টপকে প্রতিবাদ এবং আটক হওয়ার সময়ও স্লোগান দেওয়ার দৃশ্য তাঁর পরিচিতির অংশ হয়ে উঠেছে।

আন্দোলনের কর্মসূচীতে তাঁর বিভিন্ন কর্মকান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দৃশ্য তাঁকে প্রতিবাদী ও দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।
ক্যামেরার সামনে স্বচ্ছন্দ নেহা
নেহার আন্দোলনের ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ক্যামেরার সামনে থাকার কারণে তাঁর কাজ অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে হচ্ছে। তাঁর মতে, বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের অন্য কর্মীরাও একইভাবে প্রতিবাদ করেন।
শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে সক্রিয়
প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন নেহা। তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল শিক্ষাসংস্কারের দাবিতে সিজেপি-র আন্দোলনে অংশ নেওয়া।

অনশনে অংশ নিয়ে আলোচনায়: ২০২৬ সালের জুনে শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী সোনম ওয়াংচুকের অনশন কর্মসূচিতে যোগ দেন নেহা ও AISA-এর কয়েকজন কর্মী। আন্দোলনের একপর্যায়ে ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়া হলেও নেহা অনশন চালিয়ে যান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময় তাঁর আট কেজি ওজন কমে যায়।
রাজপথের আন্দোলনে বিশ্বাসী
নেহার রাজনৈতিক দর্শনে রাজপথের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, ভারতের সামাজিক পরিবর্তনগুলো কেবল সংসদের ভেতরে বসে থাকা মানুষের মাধ্যমে আসেনি; রাজপথের আন্দোলনও এসব পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।

এই বক্তব্য তাঁর আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানের পরিচয় দেয়। আর সেটাই এখন তাঁকে করে তুলেছে মেইন ক্যারেক্টার।
বাবা-মা কট্টর মোদি-সমর্থক
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপির নেতাদের সমালোচনা করেছেন নেহা।

তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে পরিবারেও মতবিরোধ রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বাবা-মা বিজেপির কট্টর সমর্থক হওয়ায় এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে অনেক মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
হুমকি, অভিযোগ ও হামলার মুখে
নেহার বিরুদ্ধে উত্তর প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে একাধিক পুলিশি অভিযোগ দায়েরের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুর হুমকির অভিযোগ তুলে তাঁর সংগঠন পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল। ঝাড়খন্ডে এক বিক্ষোভে তাঁর দিকে কালি ছুড়ে মারার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত পরিচয়ে নিজস্ব অবস্থান
নেহা ব্যক্তিগত সর্বনাম হিসেবে ইংরেজিতে লিঙ্গ নিরপেক্ষ ‘দে’ ও 'দেম’ ব্যবহার করেন। তাঁর পরিচিতির আরেকটি দিক হলো, তিনি নিজেকে শুধু ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শিক্ষার্থীদের অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে তিনি বৃহত্তর জনপরিসরে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
নেহা বোরার বর্তমান ইমেজ গড়ে উঠেছে ছাত্ররাজনীতি, রাজপথের প্রতিবাদ, গণমাধ্যমে দৃশ্যমানতা এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থানের সমন্বয়ে। তাঁকে সমর্থকেরা প্রতিবাদী তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে দেখতে পারেন, আবার তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিরোধিতাও রয়েছে। তাই তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কাজের মূল্যায়নে সংবাদমাধ্যমের তথ্য, তাঁর নিজের বক্তব্য এবং বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান আলাদা করে দেখা জরুরি।
তথ্য: বিবিসি, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, ফার্স্ট পোস্ট
ছবি: ইন্সটাগ্রাম