
রং,কাঠের আসবাব, কার্পেট, আঠা, বার্নিশ, পরিষ্কার করার বিভিন্ন উপকরণসহ ঘরের নানা জিনিস থেকে বাতাসে ছড়াতে পারে উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা ভিওসি। এর মধ্যে ফরমালডিহাইডের মতো রাসায়নিকও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অনেক উদ্বায়ী জৈব যৌগের মাত্রা বাইরের তুলনায় ঘরের ভেতরে বেশি থাকতে পারে এবং এসব যৌগের কিছু স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু রাসায়নিকই নয়, ঘরের বাতাসে থাকতে পারে ধুলা, পরাগকণা, ছত্রাকের স্পোর, ধূলিকীট ও অন্যান্য জৈব দূষকও।

বিশেষ করে ঘরের কোনো জায়গা দীর্ঘদিন স্যাঁতসেঁতে থাকলে সেখানে ছত্রাক জন্মানোর আশঙ্কা বাড়ে। রান্না, গোসল কিংবা ঘরে কাপড় শুকানোর মতো দৈনন্দিন কাজেও ঘরের আর্দ্রতা বেড়ে যেতে পারে। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না থাকলে এই আর্দ্র পরিবেশ ছত্রাক ও অন্যান্য জীবাণুর বৃদ্ধির অনুকূল হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই ঘরের সবুজ গাছ শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোর উপাদান নয়, ঘরের পরিবেশ নিয়েও ভাবার একটি সুন্দর উপলক্ষ হতে পারে।
তেমনই একটি পরিচিত ইনডোর প্ল্যান্ট হলো স্পাইডার প্ল্যান্ট। আমরা অনেকেই জানিনা, ঘরের এক কোণে যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠা এই গাছটি হতে পারে প্রাকৃতিক এয়ার পিউরিফায়ার।স্পাইডার প্ল্যান্ট দেখতে খুব সাধারণ। লম্বা সরু সবুজ পাতা, পাতার মাঝখানে সাদা বা হালকা রঙের রেখা এবং দ্রুত নতুন চারা তৈরির স্বভাব এই গাছটিকে ঘর সাজানোর জন্য জনপ্রিয় করেছে। ঝুলন্ত টবেও এটি বেশ সুন্দর দেখায়। খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না বলে ছোট অ্যাপার্টমেন্ট, বারান্দা কিংবা কাজের টেবিলের পাশেও রাখা যায় এর যত্নও তুলনামূলক সহজ।

খুব তীব্র সরাসরি রোদ না পেলেও এটি অনেকটা মানিয়ে নিতে পারে। অতিরিক্ত পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং টবের মাটি শুকিয়ে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি দেওয়াই ভালো। অর্থাৎ যারা গাছ ভালোবাসেন কিন্তু নিয়মিত পরিচর্যার জন্য খুব বেশি সময় দিতে পারেন না, তাদের জন্যও এটি সহজ একটি পছন্দ।
সৌন্দর্যের বাইরে এই পরিচিত গাছটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণা হয়েছে যেখানে দেখা গেছে বায়ু শোধনে এর আছে ভূমিকা। ঘরের বাতাসে থাকা কিছু রাসায়নিক শোষণে উদ্ভিদের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা নতুন নয়। নাসার ১৯৮০-এর দশকের গবেষণায় স্পাইডার প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন ইনডোর উদ্ভিদকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা করা হয়েছিল। গবেষণায় ফরমালডিহাইড, বেঞ্জিন ও ট্রাইক্লোরোইথিলিনের মতো কিছু উদ্বায়ী রাসায়নিক কমানোর ক্ষেত্রে উদ্ভিদের সম্ভাবনা দেখা হয়। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল শুধু গাছের পাতা নয়, গাছের শিকড়, মাটি এবং মাটির সঙ্গে থাকা অণুজীবের ভূমিকাও।

উদ্ভিদের পাতা বাতাস থেকে কিছু গ্যাসীয় পদার্থ গ্রহণ করতে পারে, আবার শিকড় ও মাটির অণুজীবও কিছু রাসায়নিক ভাঙতে ভূমিকা রাখতে পারে। নাসার গবেষণায় এই সম্মিলিত প্রক্রিয়াটিকে ঘরের বাতাসের কিছু দূষক কমানোর সম্ভাবনাময় পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। নাসার এই গবেষণাগুলো মূলত ছোট ও নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারে করা হয়েছিল। বাস্তব একটি বাসা বা অফিসে একই মাত্রায় বাতাস পরিশোধন হবে, এমন নিশ্চয়তা গবেষণাগুলো দেয় না।
পরবর্তী সময়ে এই বিষয়টি নিয়ে অতিরঞ্জিত নানা দাবি ছড়িয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো একটি নির্দিষ্ট আকারের ঘরে একটি গাছ ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ শতাংশ দূষণ সরিয়ে ফেলতে পারে। এমন নির্দিষ্ট দাবিকে বাস্তব ঘরের জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। স্পাইডার প্ল্যান্টকে ঘরের বাতাস পরিষ্কারের প্রধান ব্যবস্থা না ভেবে বরং একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সহায়ক হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত

ঘরে গাছ রাখার সবচেয়ে সহজ লাভটি চোখেই দেখা যায়। চারপাশে সবুজ থাকলে ঘর একটু প্রাণবন্ত লাগে। সাদা দেয়াল, কাঠের আসবাব আর কৃত্রিম সাজসজ্জার মাঝে একটি জীবন্ত গাছ ঘরের পরিবেশে আলাদা অনুভূতি তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা। সকালে জানালার পাশে নতুন পাতা দেখা, কয়েক দিন পর টব থেকে ছোট চারা বের হতে দেখা কিংবা শুকিয়ে যাওয়া একটি পাতা যত্ন করে সরিয়ে দেওয়া, এসব ছোট অভ্যাসও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এক ধরনের প্রশান্তি আনতে পারে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় ঘরে বসে কাজ করেন, তাদের কর্মস্থলের পাশে একটি ছোট সবুজ গাছ ঘরের দৃশ্যটিকে বদলে দিতে পারে। তবে গাছ রাখার জায়গা নির্বাচন করার সময় আলো, বাতাস চলাচল ও পানির প্রয়োজনের বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার
ঘরের বাতাস ভালো রাখতে একটি স্পাইডার প্ল্যান্টের ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়। বরং কয়েকটি অভ্যাস একসঙ্গে কাজে লাগানো বেশি কার্যকর। ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি। রান্নার সময় চুলার ধোঁয়া ও বাষ্প বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা ভালো। নতুন আসবাব, রং বা রাসায়নিকযুক্ত কোনো পণ্য ব্যবহারের পর ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা উচিত। পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থাও উদ্বায়ী জৈব যৌগের সংস্পর্শ কমাতে উৎস নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের পরামর্শ দেয়।

একইভাবে স্যাঁতসেঁতে জায়গা অবহেলা করা ঠিক নয়। দেয়ালে কালো বা সবুজ ছোপ দেখা দিলে শুধু গাছ এনে সমস্যাটি ঢেকে রাখার বদলে পানির উৎস বা আর্দ্রতার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। কারণ ছত্রাক নিয়ন্ত্রণের মূল বিষয় হলো আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা। ঘরের আর্দ্রতা খুব বেশি হলে ছত্রাক ও ধূলিকীটের বৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাড়ে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী জানালা খোলা, বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঠিক ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ
ঘরকে সুন্দর ও আরামদায়ক করে তোলার জন্য আমরা অনেক কিছুই করি। দামি আসবাব কিনি, দেয়ালে ছবি লাগাই, সুগন্ধি ব্যবহার করি, নতুন পর্দা বদলাই। সেই তালিকায় একটি ছোট সবুজ গাছ যোগ করা তাই নিছক সাজসজ্জা নয়। স্পাইডার প্ল্যান্ট ঘরের বাতাসের সব দূষণ দূর করে দেবে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে ঘরের একটি ছোট সংযোগ তৈরি করতে পারে এই গাছ।

আর ঘরের বাতাসকে সত্যিকার অর্থে ভালো রাখতে গাছের পাশাপাশি প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতা, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং দূষণের উৎস কমানোর অভ্যাস
সুস্থ ঘর তৈরি হয় একটি মাত্র উপাদানে নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতনতা অভ্যাস থেকে। জানালার পাশে রাখা একটি সবুজ স্পাইডার প্ল্যান্ট সেই সচেতনতারই সুন্দর শুরু হতে পারে।
দ্যা কনভার্সেশন ডট কম
ছবি পেক্সেলস ডট কম