
ব্রহ্মপুত্র ঘেঁষা এই গাইবান্ধা জেলায় বদলি হয়ে এসেছি এই ফেব্রুয়ারিতে ৩ বছর হলো। ছোট এ জেলা শহরে আসার পর বেশ মন খারাপই হয়েছিল বলা যায়। বড় শহরের সুবিধা এই শহরে পাব না এবং নিজ বাড়ি থেকে এই জেলা অনেক দূরে - মন খারাপ হওয়ার এই দুটিই কারণ। কিন্তু পাশাপাশি মন ভালো করার মতো যে বিষয়টি ছিল তা হচ্ছে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই ৪ মাস নদীতে বা নদীর চরে বার্ডিং করার সুবিধা। এই ৪ মাসে ছুটির দিনে কোন পারিবারিক বা অফিশিয়াল দায়িত্ব না থাকলে বের হয়ে যেতাম পাখির খোঁজে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় খুঁজে ফিরেছি আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি।

গাইবান্ধার এই ব্রহ্মপুত্র নদী আমাকে দিয়েছেও বেশ। অনেক দুষ্প্রাপ্য পাখির ছবি তুলেছি আমি এখানে (এখনো তুলে চলেছি)। এর মধ্যে কালো মানিকজোড়, সাইক্সের রাতচরা, লাল গলা তুলিকা, গাছ তুলিকা, বড় চিত্রা ইগল, নেপালি ইগল, কালো বুক বাবুই, ডোরা বুক বাবুই, দেশি মোটাহাটু উল্লেখযোগ্য। হাসের মধ্যে পেয়েছি পাতি তিলি হাস, উত্তুরে খুন্তে হাস, উত্তুরে লেঞ্জা হাস, লাল মাথা ভুতি হাস, মরচে রঙ ভুতি হাস, পিয়ং হাস, চখাচখি, শাহ চখা ও গিরিয়া হাস।

একইভাবে গত ফেব্রুয়ারিতে খুব সকালে বের হলাম দিদারকে নিয়ে। উদ্দেশ্য বালাসি ঘাটের কাছের চরটাতেই পাখি খুঁজব। যদি ভাগ্যে থাকে বিরল কিছু পেয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সকাল সকালই সূর্যের আলোয় সেদিন চারদিক ঝলমল করছিল। নৌকায় করে ওপারের চরে নেমেই সামনে পাওয়া বালি ভরত ও ধানি তুলিকার ছবি তুলে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে দেখছি। এসময় দূরে নদীর মাঝে জেগে ওঠা ছোট একটু বালিচরের দিকে আঙুল নির্দেশ করে হঠাৎ দিদার বলে উঠল, ‘স্যার দেখেন তো দুইটা কি বসে আছে’। উল্লেখ্য দিদারের চোখের ওপর আমার ভরসা রয়েছে ঢের।

যেখানে আমি ক্যামেরায় পাখি খুঁজে পাই না, সেখানে দিদার খালি চোখেই পাখি খুঁজে বের করে। তাই সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে ক্যামেরা তাক করে দুটি ক্লিক করেই ভিউ ফাইন্ডারে জুম করে দেখতে লাগলাম কোন প্রজাতির পাখি এগুলো। অনেক জুম করে আবছা আবছা যা বোঝা গেল তা দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ।
একরকম দৌড়ে পানির কিনারায় চলে গেলাম। মনের অজান্তে বলে ফেললাম দারুণ। এ তো ‘Bar-headed Goose’ - অর্থাৎ দাগি মাথা রাজহাঁস। ক্লিক করতেই থাকলাম। কিনারায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলে মন ভরছিল না। তাই পানিতে নেমে গেলাম। ওদেরকে বিরক্ত না করে যতটা কাছে যাওয়া যায় ততটা কাছে গিয়ে শাটার চাপতে থাকলাম। ততক্ষণে ওরা ওইটুকু চরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করে আবার বসে পড়ল। আমিও আর বিরক্ত না করে ৪০০ এর মতো ছবি তুলে ওদেরকে রেখে চলে আসলাম। অবশ্য একটু দূরে আসতেই দেখলাম পাশ দিয়ে ঘেঁষে চলা এক ইঞ্জিন চালিত নৌকার শব্দে ওরা উড়ে দূরের চরে চলে গেল।

দাগি মাথা রাজহাঁস প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। শীতকালে এরা মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিযায়ী হয়ে আসে। শীতের শেষে আবার সেখানে চলে যায় এবং সেখানকার পার্বত্য হ্রদসমূহে বিচরণ ও প্রজনন করে। যে কয়েকটি পাখি অনেক উঁচু দিয়ে উড়ে তার মধ্যে এটি একটি। এরা ১২০০০-১৪০০০ ফিট ওপর দিয়ে উড়তে পারে। সর্বোচ্চ ২৩০০০ ফিট ওপর দিয়ে উড়ারও রেকর্ড আছে। এরা যখন দক্ষিণ এশিয়ায় পরিযায়ন করে তখন এরা হিমালয়ের মাউন্ট মাকালুর ওপর দিয়ে উড়ে আসে। কীভাবে এরা এত ওপর দিয়ে উড়ে তা এক রহস্য।

দাগি মাথা রাজহাঁস এর বৈজ্ঞানিক নাম Anser indicus, যার Anser এর অর্থ দাঁড়ায় "মাঝারি আকৃতির রাজহাঁস" এবং Indicus এর অর্থ দাঁড়ায় "ভারতের"। এর আরেকটি বাংলা নাম "মরাল"। দাগি মাথা রাজহাঁস বড় আকারের জলচর পাখি। এর দৈর্ঘ্য কমবেশি ৭৩ সেন্টিমিটার ডানা ৪৫ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৫ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার, লেজ ১৪ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার, পা ৭ দশমিক ১ সেন্টিমিটার এবং ওজন দেড় কেজি থেকে সাড়ে ৩ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এদের মাথায় দুটো কালো দাগ থাকায় এদের চিনতে কোনো সমস্যা হয় না। ধূসর দেহের লেজের অংশটা কালচে, ঠোঁট এবং পা হলুদ। গলা ধূসর ও ঘাড় কালো। গলায় দুপাশে দুটি কালো দাগ কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে।
এরা মূলত তৃণভোজী। ঘাস লতা পাতার ডগা, জলজ উদ্ভিদ, শস্যবীজ যেমন ধান, ভুট্টা বা ঘাসের বীজ এদের প্রধান খাবার। এছাড়াও এরা শামুক, ঝিনুক, জলজ পোকামাকড়, লার্ভাও খেয়ে থাকে।