
ফিফা বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরই নয়, এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের মিলনমেলাও বটে। সেই কারণেই প্রতিটি বিশ্বকাপের মাসকট বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ফিফা উন্মোচন করেছে তিনটি অফিসিয়াল মাসকট। তারা হলো কানাডার ম্যাপল, মেক্সিকোর জায়ু ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাচ। এবারই প্রথম বিশ্বকাপ তিনটি দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে, তাই প্রথমবারের মতো একক মাসকটের পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে তিনটি ভিন্ন চরিত্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ দল।


আসলে বিশ্বকাপ মাসকটের ঐতিহ্য শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে, যখন ইউনিয়ন জ্যাক পরা সিংহ 'ওয়ার্ল্ড কাপ উইলি' মাঠে এসেছিল। সেই থেকে প্রতিটি আসরে একটি করে মাসকট আসে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের 'ফুটিক্স', ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার 'জাকুমি', ২০২২ সালে কাতারের 'লায়িব'।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি শহরে। ৪৮ দলের এই সম্প্রসারিত বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ফিফা এমন তিনটি মাসকট নির্বাচন করেছে, যা শুধু তিন দেশের প্রতিনিধিত্বই করে না, বরং তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বন্যপ্রাণীকেও তুলে ধরে। এই নিয়ে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেন, 'ম্যাপেল, জাইউ আর ক্লাচ — তারা আনন্দ, শক্তি আর ঐক্যের চেতনায় পূর্ণ, ঠিক যেমন ফিফা বিশ্বকাপ নিজেই।'
ম্যাপল

কানাডার মাসকট ম্যাপল একটি মুজ বা বড় হরিণজাতীয় প্রাণী। কানাডার বিস্তীর্ণ বনভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে মুজ একটি পরিচিত প্রাণী। ম্যাপলের নাম নেওয়া হয়েছে কানাডার জাতীয় প্রতীক ম্যাপল পাতার নাম থেকে। প্রাণবন্ত, সৃজনশীল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ এই চরিত্রটি ফুটবল মাঠে গোলরক্ষকের ভূমিকায় থাকে।

তার কাজ প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে দলকে নিরাপত্তা দেওয়া। এর মাধ্যমে কানাডার স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা ও সুরক্ষার মানসিকতাকে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে, স্ট্রিট আর্ট ও সংগীতপ্রেমী এই মুজ কানাডার সব প্রদেশ ঘুরে বেড়িয়েছে। সৃজনশীলতা আর অদম্য মানসিকতার প্রতীক ম্যাপল।
জায়ু

অন্যদিকে, মেক্সিকোর প্রতিনিধিত্ব করছে জায়ু জাগুয়ার। মধ্য ও দক্ষিণ মেক্সিকোর ঘন জঙ্গলে জাগুয়ার দীর্ঘদিন ধরে শক্তি ও সাহসের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রাচীন মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতায়ও এই প্রাণীর বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

জায়ুকে ফুটবল মাঠে একজন স্ট্রাইকার হিসেবে দেখানো হয়েছে, যে তার গতি, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে। চরিত্রটির মাধ্যমে মেক্সিকোর প্রাণবন্ত সংস্কৃতি, উৎসবমুখরতা এবং ফুটবলের প্রতি গভীর আবেগ প্রকাশ পেয়েছে। মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলের জঙ্গল থেকে আসা এই জাগুয়ার দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের বাহক। অসাধারণ দ্রুততা ও বুদ্ধিমত্তার প্রতীক বলা হচ্ছে জায়ুকে।
ক্লাচ

যুক্তরাষ্ট্রের মাসকট হলো একটি বল্ড ঈগল বা সাদা-মাথা ঈগল, যা দেশটির জাতীয় প্রতীক। স্বাধীনতা, শক্তি ও নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে এই পাখি আমেরিকান সংস্কৃতিতে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ক্লাচ একজন মিডফিল্ডার, যে মাঠে দলের বিভিন্ন অংশকে সংযুক্ত রাখে এবং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে।

বলা হচ্ছে, তার এই রোল যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী চিন্তা, নেতৃত্ব এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের ধারণাকে প্রতিফলিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশজুড়ে উড়ে বেড়ানো এই ঈগল এই মাল্টিকালচারাল দেশের প্রতিটি সংস্কৃতিকে ধারণ করে। ক্লাচ কৌতূহল ও আশাবাদের মূর্ত প্রকাশের প্রতীক।
বিশ্বকাপের এই তিন মাসকটের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তারা একসঙ্গে কাজ করে। একজন গোলরক্ষক, একজন স্ট্রাইকার এবং একজন মিডফিল্ডার হিসেবে তারা ফুটবল দলের পূর্ণাঙ্গ রূপ তৈরি করেছে। এটি তিন আয়োজক দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যেরও প্রতীক। ফিফার মতে, ম্যাপল, জায়ু ও ক্লাচ তরুণ প্রজন্মকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করবে এবং বিশ্বকাপের আনন্দকে আরও বিস্তৃত করবে।

ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই মাসকটগুলোকে বিভিন্ন অনলাইন গেম ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মেও যুক্ত করা হয়েছে, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভক্তরা তাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারেন। সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপের মাসকট ম্যাপল, জায়ু ও ক্লাচ শুধু কার্টুন চরিত্র নয়; তারা তিনটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক। তাদের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে একটি বড় বার্তা—ভাষা, সীমান্ত ও সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও ফুটবল মানুষকে এক সুতোয় গাঁথতে পারে।
সূত্র: ফুটবল হুইসপার্স, বিবিসি
ছবি: ইন্সটাগ্রাম