
কাল ভোট দিয়েছেন তো? আঙুলে কালির দাগের ছবিও দেওয়া শেষ সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু এখন এই কালি তো আর উঠছে না। অনেকের হাতে সুন্দর করে টেনে দাগ দিলেও কারও কারও হাতে একটু বেশিই কালি দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন পর এমনিতেও উঠে যাবে এই দাগ। আপাতত থাক না হয় একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের চিহ্ন হিসেবে। তবে এই অমোচনীয় কালি বা ইন্ডেলিবল ইঙ্কের ব্যাপারে কিছু তথ্য জেনে নিলে মন্দ হয় না।

নির্বাচনে ব্যবহার করা এই অমোচনীয় কালি বা ইন্ডেলিবল ইঙ্কের উদ্দেশ্য একটাই: একজন ভোটার যেন একাধিকবার ভোট দিতে না পারেন। প্রযুক্তির উন্নতি সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে এখনও এই সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতিই বহুল ব্যবহৃত হয়।
ইন্ডেলিবল ইঙ্কের শুরু
ভোটে অমোচনীয় কালি ব্যবহারের ধারণাটি প্রথম জনপ্রিয় হয় বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৬২ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে প্রথম বড় পরিসরে আমাদের পাশের দেশ ভারতে এই কালি ব্যবহার করা হয়। সেদেশের জাতীয় ভৌত গবেষণাগার এবং মাইসোর পেইন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড যৌথভাবে এ কালি তৈরি করে। এরপর ধীরে ধীরে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে এটি ছড়িয়ে পড়ে।

এই অমোচনীয় কালির মূল উপাদান সাধারণত সিলভার নাইট্রেট। এটি ত্বকের প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এবং আলোতে অক্সিডাইজ হয়ে গাঢ় রঙ ধারণ করে। ফলে কয়েক দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত দাগ স্পষ্ট থাকে। সাবান, পানি বা অ্যালকোহল দিয়েও সহজে এটি ওঠে না।
কেন প্রয়োজন হলো
বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে ভোটার তালিকা বা জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থা দীর্ঘদিন দুর্বল ছিল। বায়োমেট্রিক যাচাই বা ডিজিটাল ডাটাবেজ না থাকায় একই ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দেওয়ার ঝুঁকি ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ইন্ডেলিবল ইঙ্ক হয়ে ওঠে সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান। আজও অনেক দেশে ইলেকট্রনিক ভোটিং বা বায়োমেট্রিক সিস্টেম থাকলেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা হিসেবে এই কালি ব্যবহার করা হয়। কারণ প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা জালিয়াতির আশঙ্কা পুরোপুরি দূর করা যায় না।

বাংলাদেশে কবে শুরু
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অমোচনীয় কালি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। তখন নির্বাচন কমিশন ভোট জালিয়াতি ও পুনরায় ভোট দেওয়ার ঝুঁকি ঠেকাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই পদ্ধতি গ্রহণ করে।
পরবর্তীতে প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এটি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে কালি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রয়োগের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে তুলা বা ছোট কাঠি দিয়ে আঙুলে লাগানো হতো, পরে মার্কার বা ব্রাশজাতীয় বিশেষ অ্যাপ্লিকেটর ব্যবহার শুরু হয়,যাতে কালি অপচয় কমে এবং প্রয়োগে নির্ভুলতা বাড়ে।
কালি নিয়ে বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ
ইন্ডেলিবল ইঙ্ককে ঘিরে বিতর্কও কম হয়নি। কখনও অভিযোগ উঠেছে কালি যথেষ্ট গাঢ় নয়, দ্রুত উঠে যায় বা প্রয়োগ ঠিকমতো হয়নি। কিছু দেশে নকল কালি সরবরাহের অভিযোগও এসেছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্ধারিত মানের কালি ব্যবহৃত হলে সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত দাগ থাকে। আরেকটি বিষয় হলো,মানবাধিকার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন। যদিও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক মাত্রায় সিলভার নাইট্রেট ব্যবহার করলে তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়।

প্রযুক্তির যুগে কালি কি অপ্রাসঙ্গিক
এখন বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র, স্মার্ট কার্ড ও বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ রয়েছে। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, তাহলে ইন্ডেলিবল ইঙ্কের প্রয়োজন কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি “ভিজ্যুয়াল ডিটারেন্ট”—দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিরোধক। বুথের ভেতর প্রযুক্তিগত যাচাই থাকলেও বাইরে থেকে কেউ সহজেই দেখতে পারেন কে ভোট দিয়েছেন। এতে সামাজিক স্বচ্ছতা বাড়ে এবং জালিয়াতির মানসিক প্রবণতা কমে।

দাগের প্রতীকী শক্তি
একটি ছোট দাগ, কিন্তু তার প্রতীকী শক্তি বিশাল। মানুষ গর্বের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে আঙুলের দাগ দেখিয়ে ছবি পোস্ট করেন ভোট দেওয়ার চিহ্ন হিসেবে। বাংলাদেশেও তরুণ ভোটারদের মধ্যে এ প্রবণতা দেখা যায়। তর্জনীর দাগ যেন নাগরিক দায়িত্ব পালনের এক ক্ষুদ্র কিন্তু দৃশ্যমান স্মারক।

ইন্ডেলিবল ইঙ্কের ইতিহাস আসলে গণতন্ত্র রক্ষার ইতিহাস। প্রযুক্তি বদলেছে, ভোটপদ্ধতি আধুনিক হয়েছে, কিন্তু আঙুলের সেই ছোট দাগ এখনও গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু পুনরায় ভোট ঠেকানোর উপায় নয়, বরঞ্চ নাগরিক অংশগ্রহণের প্রতীক।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অমোচনীয় কালি এক নীরব প্রহরী হিসেবে কাজ করে চলেছে। যতদিন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রয়োজন থাকবে, ততদিন এই ছোট্ট দাগের গুরুত্বও অমোচনীয়ই থেকে যাবে।
তথ্য: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
ছবি: ফেসবুক