প্রেসিডেন্ট পুতিনসহ লাখো রাশিয়ান কেন -৪০ ডিগ্রিতে বরফপানিতে ডুব দিলেন? কী এই ঐতিহ্যবাহী এপিফানি
শেয়ার করুন
ফলো করুন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বয়স এখন ৭৩। এ বয়সেও তিনি গতকাল ১৯ জানুয়ারি অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের এপিফানি রিচুয়াল উপলক্ষে বরফঠান্ডা পানিতে ডুব দেওয়ার ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। আর সেই ভিডিও এখন পুরোপুরি ভাইরাল।

রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা তাস জানায়, প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রতিবছরের মতো এবারও রীতি অনুযায়ী বরফপানিতে ডুব দিয়েছেন। অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের উৎসব এপিফানি প্রতিবছর ১৯ জানুয়ারি পালিত হয়, যা শিশু যিশুর ব্যাপ্টিজম স্মরণে উদযাপিত হয়। রাশিয়ায় এই উপলক্ষে ১৮ জানুয়ারির রাত থেকে ১৯ জানুয়ারির ভোর পর্যন্ত নারী-পুরুষ সবাই বরফপানিতে ডুব দেওয়ার একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে। এ ঘটনাকে প্রবীণ প্রেসিডেন্ট পুতিনের শক্তিশালী শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রমাণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ২০১৮ সালে প্রথম প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট পুতিনের এপিফানি উপলক্ষে বরফপানিতে ডুব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রতিবছরের মতো এবারও রীতি অনুযায়ী বরফপানিতে ডুব দিয়েছেন
প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রতিবছরের মতো এবারও রীতি অনুযায়ী বরফপানিতে ডুব দিয়েছেন

সে সময় তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ সফরে ছিলেন এবং তভার অঞ্চলের নিলোভা মঠ পরিদর্শনের সময় সেলিগার হ্রদের বরফের গর্তে ডুব দেন। ২০২১ সালেও প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঠান্ডা পানিতে নামার একটি স্পষ্ট ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ভেড়ার লোমের কোট ও বুট পরে বরফের গর্তের কাছে যান, ক্রুশচিহ্ন আঁকেন এবং তারপর পানিতে ডুব দেন।তবে তিনি ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এবং ২০২২ সালে চিকিৎসক ও চার্চের পরামর্শ অনুযায়ী এতে অংশ নেননি।

বিজ্ঞাপন

আমাদের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও রাশিয়াযর এই বরফঠান্ডা পানিতে ডুব দেওয়ার ঐতিহ্য ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এপিফানি উৎসবের সঙ্গে। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়,সারা বছরই অনেক মানুষ স্বাস্থ্য ও সামাজিক যোগাযোগের জন্য এই অভ্যাস বজায় রাখেন। এপিফানি উপলক্ষে জমাটবাঁধা হ্রদ বা নদীর কিছু অংশ কেটে তৈরি করা একটি বরফের গর্তে নামেন সবাই, যাকে বলা হয় ইওর্দান। এই গর্তটি সাধারণত ক্রুশের আকৃতির হয়।

বিজ্ঞাপন

অংশগ্রহণকারীরা রীতি অনুযায়ী তিনবার সম্পূর্ণ শরীর পানিতে ডুবান এবং প্রতিবার নিজেকে ক্রুশচিহ্ন দেন। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ রাশিয়ান এতে অংশ নেন, যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

অংশগ্রহণকারীরা রীতি অনুযায়ী তিনবার সম্পূর্ণ শরীর পানিতে ডুবান
অংশগ্রহণকারীরা রীতি অনুযায়ী তিনবার সম্পূর্ণ শরীর পানিতে ডুবান
নারীরাও আসেন ডুব দিতে
নারীরাও আসেন ডুব দিতে

বড় আকারের অনুষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকর্মী, চিকিৎসাকর্মী এবং গরম চাসহ পোশাক বদলানোর মোবাইল ঘর সরবরাহ করে, যাতে শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

বরফের গর্ত নির্মাণ (ইওর্দান) কীভাবে তৈরি করতে হয়

এপিফানি উপলক্ষে বরফের গর্ত তৈরির একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। এটি সাধারণত ক্রুশের আকৃতিতে কাটা হয়, যা জর্দান নদীর প্রতীক।

জনসমাগমপূর্ণ অনুষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ কাঠের মঞ্চ ও পানির নিচে নামার সিঁড়ি বসায়, যাতে সাঁতারুরা বরফের নিচে স্রোতে ভেসে না যান।

আচার শুরুর আগে সাধারণত একজন পুরোহিত ক্রুশ ও প্রার্থনার মাধ্যমে পানিকে পবিত্র করেন।

 একজন পুরোহিত ক্রুশ ও প্রার্থনার মাধ্যমে পানিকে পবিত্র করেন
একজন পুরোহিত ক্রুশ ও প্রার্থনার মাধ্যমে পানিকে পবিত্র করেন
তাঁদের বিশ্বাস, নিয়মিত বরফঠান্ডা পানির সংস্পর্শ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে
তাঁদের বিশ্বাস, নিয়মিত বরফঠান্ডা পানির সংস্পর্শ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে

ধর্মীয় উৎসবের বাইরেও আবার অনেক রাশিয়ান শীতকালীন এই বরফপানিতে সাঁতার কাটাকে একটি যাপনরীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নিয়মিত শীতের পানিতে সাঁতারকাটা মানুষ নিজেদের ওয়ালরাস অর্থাৎ সিন্ধুঘোটক বা মোরঝি বলে ডাকেন। তাঁদের বিশ্বাস, নিয়মিত বরফঠান্ডা পানির সংস্পর্শ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে। রাশিয়ায় অনেক ওয়ালরাস ক্লাবও আছে। অনেকেই শীতকালজুড়ে একসঙ্গে সাঁতার কাটার জন্য স্থানীয় ক্লাবে যোগ দেন, যেখানে বরফ কেটে গর্ত তৈরি করা হয়।

আবার, রাশিয়ান 'বানিয়া' ঠান্ডা পানির ঐতিহ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে এক ধরনের কনট্রাস্ট থেরাপি ব্যবহার করা হয়। বানিয়ায় স্টিম বাথ নিয়ে প্রচণ্ড ঘাম ঝরানোর পর বাইরে গিয়ে বরফের স্তূপে ঝাঁপ দেওয়া বা বরফঠান্ডা পানিতে ডুব দেওয়া একটি প্রচলিত রীতি, যাতে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়।

বানিয়া বাথের স্থান। পাশেই বরফে ঝাঁপ দেওয়ার ব্যবস্থা
বানিয়া বাথের স্থান। পাশেই বরফে ঝাঁপ দেওয়ার ব্যবস্থা

রাশিয়ানরা মনে করে, এতে জাকালকা (শরীরকে দৃঢ় করা) লাভ করে তারা। এই ট্র্যাডিশনাল থেরাপি আসলে রাশিয়ানদের একটি ওয়েলবিইং কালচারের অংশ, যার লক্ষ্য সেখানকার কঠিন আবহাওয়া ও রোগের বিরুদ্ধে শরীরকে সহনশীল করে তোলা।
যেসব এলাকায় তাপমাত্রা –৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে –৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়, সেখানকার মানুষও এই আচার পালন করেন। এত চরম ঠান্ডায় ০° সেলসিয়াসের পানি বাতাসের তুলনায় অনেক সময় উষ্ণ মনে হয়।

ইতিহাস অনুযায়ী, স্কিথিয়ান ও পরে কিছু স্লাভিক গোষ্ঠী নবজাতক শিশুদের নিয়েও ঠান্ডা পানিতে এভাবে ডুব দিত , যাতে জন্ম থেকেই তারা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি, রাশিয়ানরা এই বরফঠান্ডা পানির ঐতিহ্যের সঙ্গে নানা শারীরিক ও মানসিক উপকারিতার কথাও বলে আসছেন। যেমন:

স্বাস্থ্য ও মানসিক উপকারিতা

এই অভ্যাস সহনশীলতা গড়ে তোলার একটি সামগ্রিক উপায়।

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

নিয়মিত ঠান্ডা পানির সংস্পর্শ সর্দি-কাশির মতো সাধারণ অসুখ প্রতিরোধে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।

ভালো থাকার জন্য আর রীতি হিসেবে এই কঠিন কাজটি করেন বছরে এবার রাশিয়ানরা
ভালো থাকার জন্য আর রীতি হিসেবে এই কঠিন কাজটি করেন বছরে এবার রাশিয়ানরা
রয়টার্সের ইন্সটাগ্রাম

হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য

ঠান্ডা পানিতে রক্তনালির দ্রুত সংকোচন ও প্রসারণ রক্তসঞ্চালন উন্নত করতে পারে এবং হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

বিপাকক্রিয়া সক্রিয়করণ

ঠান্ডা পানি শরীরের ব্রাউন ফ্যাট সক্রিয় করে, যা তাপ উৎপন্ন করে এবং বিপাকক্রিয়া বাড়াতে পারে।

আনন্দ ও মানসিক সতেজতা

হঠাৎ ঠান্ডার ধাক্কায় এন্ডরফিন নিঃসৃত হয়, যা এক ধরনের উচ্ছ্বাস বা মানসিক রিসেট অনুভূতি দেয়।

ত্বকের ওপর প্রভাব

কিছু অনুশীলনকারীর দাবি, এতে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ে এবং সেলুলাইটের উপস্থিতি কমতেও সাহায্য করে।

সূত্র: ট্র্যাভেল আর্থ, দ্য ইকোনমিক টাইমস

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪: ৪২
বিজ্ঞাপন