এপস্টেইনের বিকৃত যৌন অপরাধ ও নির্যাতনের ঘাটি প্রাইভেট আইল্যান্ড 'লিটল সেন্ট জেমস'কোথায়? কী কী আছে সেখানে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ক্যারিবীয় সাগরের পূর্বাঞ্চলে, ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের অন্তর্ভুক্ত সেন্ট থমাস দ্বীপের ঠিক দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ 'লিটল সেন্ট জেমস'।  এখন এই অভিশপ্ত দ্বীপটি নিয়ে পুরো বিশ্বে তোলপাড় চলছে। তার কারণ সারা দুনিয়া তোলপাড় করা কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের প্রাইভেট আইল্যান্ড।

জেফ্রি এপস্টেইনের প্রাইভেট আইল্যান্ড লিটল সেন্ট জেমস
জেফ্রি এপস্টেইনের প্রাইভেট আইল্যান্ড লিটল সেন্ট জেমস
দ্বীপটি দূর থেকে দেখলে নিখাদ এক নির্জন স্বর্গীয় স্থান বলেই মনে হয়
দ্বীপটি দূর থেকে দেখলে নিখাদ এক নির্জন স্বর্গীয় স্থান বলেই মনে হয়

আর এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিকে ঘিরে যেসব অকল্পনীয় ও ভয়াবহ ঘটনার আলামত মিলছে তা সভ্যতার শেকড় ধরে টান দেওয়ার মতো। অথচ আয়তনে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ একর, চারদিক ঘেরা স্বচ্ছ নীল জল আর পাহাড়ি ঢালে গড়া এই দ্বীপটি দূর থেকে দেখলে নিখাদ এক নির্জন স্বর্গীয় স্থান বলেই মনে হয়।

বিজ্ঞাপন

ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য

লিটল সেন্ট জেমস মূলত একটি হিলি আইল্যান্ড। দ্বীপটির মাঝখানে রয়েছে উঁচু টিলা ও ঢালু পাহাড়। এখান থেকে ক্যারিবীয় সাগরের বিস্তীর্ণ অংশ দেখা যায়। দ্বীপের চারপাশে রয়েছে কোরাল রিফ, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পানির রং এখানে নীল থেকে ফিরোজা, যা ভার্জিন আইল্যান্ডস অঞ্চলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।

পের চারপাশে রয়েছে কোরাল রিফ, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
পের চারপাশে রয়েছে কোরাল রিফ, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
উষ্ণ ও আর্দ্র ট্রপিক্যাল জলবায়ূ থাকে এখানে
উষ্ণ ও আর্দ্র ট্রপিক্যাল জলবায়ূ থাকে এখানে

উষ্ণ ও আর্দ্র ট্রপিক্যাল জলবায়ূ থাকে এখানে। সারা বছরই দেখা যায় রোদপ্রধান আবহাওয়া। বর্ষাকালে হালকা ঝড় ও হারিকেনের প্রভাব পড়ে, তবে বছরের বড় সময় দ্বীপটি শান্ত ও পর্যটনবান্ধব থাকে। ভাবতেই কষ্ট হয়, এই সুন্দর দ্বীপটিই একসময় গড়ে ওঠে জেফ্রি এপ্সটেইনের শিশু নির্যাতন ও বিকৃত যৌনাচারারের ঘাটি হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

দ্বীপটিতে যা যা আছে

প্রাকৃতিক সৈকত ও ছোট ছোট কোভ

পাথুরে উপকূলের পাশাপাশি সাদা বালির অংশ

ক্যারিবীয় গাছপালা যেমন নারকেল, পাম, ঝোপঝাড় ও শুষ্ক বনাঞ্চল

ক্যারিবীয় গাছপালায় ঘেরা এই দ্বীপ
ক্যারিবীয় গাছপালায় ঘেরা এই দ্বীপ

দ্বীপে জেফ্রির কী কী স্থাপনা ছিল

জেফ্রি এপস্টেইনের মালিকানায় থাকাকালে লিটল সেন্ট জেমস কার্যত একটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর প্রাইভেট রিসোর্টে পরিণত হয়। এখানে গড়ে তোলা হয় অনেক স্থাপনা। যেমন:

মেইন রেসিডেন্স : বিলাসবহুল প্রধান বাড়ি, যেখানে এপস্টেইনের ও তার ঘনিষ্ঠ অতিথিরা থাকতেন

লিটল সেন্ট জেমস কার্যত একটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর প্রাইভেট রিসোর্টে পরিণত হয়
লিটল সেন্ট জেমস কার্যত একটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর প্রাইভেট রিসোর্টে পরিণত হয়
মেইন হাউস, গেস্ট হাউস ও কটেজ আছে এখানে
মেইন হাউস, গেস্ট হাউস ও কটেজ আছে এখানে
অতিথিদের জন্য একাধিক আলাদা ভবনে এমন বিলাসবহুল আসবাব ছিল
অতিথিদের জন্য একাধিক আলাদা ভবনে এমন বিলাসবহুল আসবাব ছিল

গেস্ট হাউস ও কটেজ: অতিথিদের জন্য একাধিক আলাদা ভবন

হেলিপ্যাড: ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারে যাতায়াতের সুবিধা

ডক ও প্রাইভেট জেটি: ইয়ট ও নৌযানের জন্য

সুইমিং পুল ও সানডেক

জেনারেটর ও পানির ট্যাংক: দ্বীপের নিজস্ব বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থাপনা

তবে দ্বীপের সবচেয়ে আলোচিত স্থাপনাটি ছিল একটি গম্বুজ আকৃতির ভবন, যা অনেকটা মন্দিরের মতো দেখতে। সরকারি নথিতে এটিকে সাধারণ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র বা অফিস বলা হলেও, এর ব্যবহার নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়েছে। লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ডের এই কথিত মন্দিরটি আসলে এই দ্বীপকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি রহস্য, গুজব ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই স্থাপনাটি একটি গম্বুজ আকৃতির ভবন, রং হালকা নীল–সাদা। দূর থেকে দেখলে এটি প্রাচীন গ্রিক বা রোমান টেম্পল মনে হয়। আবার কারও চোখে মেসোনিক লজ বা পৌত্তলিক উপাসনালয়ের মতো মনে হয়।

দ্বীপের সবচেয়ে আলোচিত স্থাপনাটি ছিল একটি গম্বুজ আকৃতির ভবন, যা অনেকটা মন্দিরের মতো দেখতে
দ্বীপের সবচেয়ে আলোচিত স্থাপনাটি ছিল একটি গম্বুজ আকৃতির ভবন, যা অনেকটা মন্দিরের মতো দেখতে
এরকম দেখতে ওপর  থেকে এই রহস্যময় স্থাপনা
এরকম দেখতে ওপর থেকে এই রহস্যময় স্থাপনা

ভবনটির উপরে রয়েছে একটি বড় ডোম (গম্বুজ), সামনে স্তম্ভের মতো গঠন, যা দ্বীপের অন্য বিলাসবহুল ভবনগুলোর থেকে একেবারেই আলাদা। ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, এপ্সটেইনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল এটি মূলত দ্বীপের উঁচু জায়গা থেকে চারপাশ দেখার জন্য বানানো। এর ভেতরে কোনো ধর্মীয় কার্যক্রমের অনুমতি চাওয়া হয়নি।

এফবিআই ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্বীপে অভিযান চালালেও ভবনের ভেতরের বিস্তারিত কোনো ছবি বা পূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। কোনো সরকারি নথিতে এখানে ধর্মীয় প্রতীক, বলি বা গোপন আচার–এর প্রমাণ নেই, তারপরেও প্রশ্ন রয়েই যায়। বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনি ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

এমন গা শিরশির করা ছবি এই টেম্পলের ভেতরের বলে জানা যায়। এর ব্যাখ্যা কী!
এমন গা শিরশির করা ছবি এই টেম্পলের ভেতরের বলে জানা যায়। এর ব্যাখ্যা কী!
গুগল ম্যাপে অনেক রহস্যময় রিচুয়ালের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এই স্থানকে ঘিরে
গুগল ম্যাপে অনেক রহস্যময় রিচুয়ালের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এই স্থানকে ঘিরে

নিরাপত্তারক্ষী, নজরদারি ক্যামেরা এবং সীমিত প্রবেশাধিকার—সব মিলিয়ে এটি ছিল এমন এক স্থান, যেখানে বাইরের চোখ খুব কমই পৌঁছাত। তবে এখন এই স্থাপনার ভেতরের অনেক ইমেজ বেরিয়ে আসছে, প্রকাশ পাচ্ছে। আর যা যা দেখা যাচ্ছে, তা আসলে চিন্তারও বাইরে। বিশ্বের বহু বড় নেতা, বিখ্যাত ব্যক্তি ও তারকাদের এই বিতর্কিত স্থানে আগমনের বিষয়ে নানা তথ্য ও ছবি তাঁদের সম্পর্কে এক অত্যন্ত ডার্ক চ্যাপ্টার খুলে দিচ্ছে।

আজকের লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপ কেমন

এপস্টেইনের মৃত্যুর পর দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তত্ত্বাবধানে যায়। পরে এটি বিক্রি হলেও দ্বীপের ভৌগোলিক সৌন্দর্য আজও অক্ষুণ্ন, কিন্তু এর সামাজিক ও নৈতিক ভার এতটাই গভীর যে, পর্যটন মানচিত্রে জায়গা পাওয়ার আগেই এটি ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

একদিকে অপরূপ প্রকৃতি, অন্যদিকে মানব ইতিহাসের ভয়ংকর অপরাধ
একদিকে অপরূপ প্রকৃতি, অন্যদিকে মানব ইতিহাসের ভয়ংকর অপরাধ

লিটল সেন্ট জেমস আমাদের সামনে এক দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরে—একদিকে অপরূপ প্রকৃতি, অন্যদিকে মানব ইতিহাসের ভয়ংকর অপরাধ। এই দ্বীপ তাই শুধু একটি জায়গা নয়, বরং ক্ষমতা, নিঃসঙ্গতা ও নৈতিক পতনের এক নীরব প্রতীক।

এরকম সেলার পাওয়া গিয়েছে দ্বীপে
এরকম সেলার পাওয়া গিয়েছে দ্বীপে

১৯৯৮ সালে এপস্টেইন প্রায় ৭.৯ মিলিয়ন ডলার দিয়ে দ্বীপটি কিনে নেন। পরে পাশের আরেকটি দ্বীপ গ্রেট সেন্ট জেমসও তিনি অধিগ্রহণ করেন। জেফ্রি এপ্সটেইনের মালিকানাধীন লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ড আজ পরিচিত পেডোফাইল আইল্যান্ড নামে।

লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ড আজ পরিচিত পেডোফাইল আইল্যান্ড নামে। এখানকার অনেক ইমেজ সেই আলামত দিচ্ছে
লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ড আজ পরিচিত পেডোফাইল আইল্যান্ড নামে। এখানকার অনেক ইমেজ সেই আলামত দিচ্ছে

অভিযোগ অনুযায়ী, এই দ্বীপেই বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়। মার্কিন আদালতের নথি, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য এবং পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে—লিটল সেন্ট জেমস ছিল এপ্সটেইনের অপরাধচক্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানেই তিনি ক্ষমতাবান অতিথিদের জন্য কিশোরীদের পাচার ও নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ উঠে আসছে এপস্টেইন ফাইলসে।

২০১৯ সালে নিউইয়র্কে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে এপস্টেইনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তবে তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়নি লিটল সেন্ট জেমসকে ঘিরে প্রশ্ন। বরং আরও গভীর হয় রহস্য। দ্বীপে কারা যেতেন? কী ঘটত সেখানে? কেন এত বছর ধরে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি? এপস্টেইনের মৃত্যুর পর দ্বীপটি জব্দ করা হয় এবং ২০২৩ সালে এক বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী এটি কিনে নেন, যিনি দাবি করেন—এই দ্বীপকে তিনি নতুন পরিচয়ে ফিরিয়ে আনতে চান।

লিটল সেন্ট জেমসের সঙ্গে এপস্টেইনের নাম চিরতরে জড়িয়ে গিয়েছে
লিটল সেন্ট জেমসের সঙ্গে এপস্টেইনের নাম চিরতরে জড়িয়ে গিয়েছে

কিন্তু জনমনে লিটল সেন্ট জেমস আজও একটি ভয়ংকর প্রতীকের নাম। লিটল সেন্ট জেমস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা ও অর্থের আড়ালে কত বড় অপরাধ লুকিয়ে থাকতে পারে। স্বর্গের মতো দেখতে একটি দ্বীপ কীভাবে নরকের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে, এপস্টেইনের এই দ্বীপ তারই এক নির্মম উদাহরণ।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, সিবিএস, বিবিসি

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৫৭
বিজ্ঞাপন