
একটা সুন্দর দৃশ্য কল্পনা করা যাক। সারাদিন অফিস, যানজট আর ব্যস্ততা শেষে বাড়ি ফিরে স্ত্রী দেখেন, রান্নাঘর ঝকঝকে, খাবার প্রস্তুত আর স্বামী বলছেন, “আজকে আমি রান্না করেছি!” কল্পনা থেকে বাস্তবে আসি। এদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমন দৃশ্য কিছুটা বিরল হলেও ব্যতিক্রমও আছে। আজ 'মেন মেক ডিনার ডে"। আচ্ছা, আপনি কি এখনও রান্না করা নারীর কাজ মনে করেন?

আমাদের দেশের সামাজিক প্রথা অনুযায়ী রান্নাঘর কেবল নারীদের জন্য, এমনই আমরা ভেবে থাকি। আজকাল অবশ্য ব্যতিক্রমও দেখা যায়। নতুন প্রজন্মের পুরুষেরা নিজেরাই রান্না শিখছেন। বিশেষ পদ রেঁধে তাঁরা পরিবারকে সারপ্রাইজ যেমন দিচ্ছেন তেমন নিয়মিত রান্নাঘরে সাপোর্ট দেওয়াতেও এগিয়ে আছেন অনেক পুরুষ।
আজকের শহুরে জীবনে সংসার মানে দু’জনের দায়িত্ব। সিদ্ধান্তে, অর্থে, পরিশ্রমে দুজনেই অংশীদার। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটে তখনই, যখন একজন নারী সারাদিন অফিস করে এসে আবার রান্না-বান্না, বাজার, কাপড়, সন্তান সব সামলান; আর পুরুষ অফিস থেকে ফিরে শুধু অপেক্ষায় থাকেন কখন খাবারের টেবিলে ডাক পড়বে। এমন অভ্যাসগুলো একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের সামাজিক কাঠামোই এমন, যে একজন ছেলে বড় হতে হতে দেখে মা সারাদিন ঘরের কাজ করছেন আর বাবা বাইরে কাজ করলেও বাড়িতে কুটোটি নাড়েন না। সমাজের এই অলিখিত নিয়ম এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে কেউ যতই শিক্ষিত, আধুনিক, উদার হোন না কেন অবচেতনমনে এই অভ্যাসটা থেকেই যায় তাঁর মনে। এর জন্য ঘরের নারীরাই অনেকখানি দায়ী। অনেক সময় পুরুষরা ভুলেই যান—তাঁর স্ত্রীও ঠিক একই পরিশ্রম করে, একই ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে অফিসে সারাদিন কাটিয়ে এসেছেন।

এই পরিস্থিতি পাল্টানো শুরু করতে আসলে প্রথমেই খুব বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই। শুরু হতে পারে ছোট্ট একটি উদ্যোগ দিয়ে। আজ ‘'মেন মেক ডিনার ডে"’। অর্থাৎ আজকের দিনটিতে রান্নাঘরের দায়িত্ব পুরুষদের, একথাই বলছে এই দিবসের মূলমন্ত্র। বিশ্বের তাবড় তাবড় সব শেফ ও বাবুর্চি কিন্তু পুরুষই। আপনি তেমন পটু না হলেও হবে। হয়তো রান্না ঠিকঠাক হবে না, লবণ কম হতে পারে, ভাত কম সেদ্ধ হতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটা খাবারের স্বাদ নয় বরঞ্চ সম্মান, যত্ন এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আনন্দটাই মূল।
যুক্তরাষ্ট্রে এই দিবসের উৎপত্তি হলেও এর আবেদন সর্বজনীন। দিনটি পালিত হয় নভেম্বরের প্রথম বৃহস্পতিবার।এ দিনের প্রবর্তন করেছিলেন কানাডার অটোয়া শহরের স্যান্ডি শার্কি। গ্লোবাল নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রায় ১৪ বছর আগে শুধুমাত্র তাঁর স্বামী রব বেনেটের হাত দিয়ে একদিন রান্না করানোর উদ্দেশ্যেই তিনি এই দিবসের সূচনা করেছিলেন। শার্কির ভাষায়, “যেসব পুরুষ প্রতিদিন রান্না করেন—এ দিনটা তাদের জন্য নয়! এ দিনটা তাঁদের জন্য, যারা কখনোই রান্নাঘরের ভেতর পা রাখেন না।” প্রথম দিন যখন রব নিজেই রান্না করেছিলেন, খাবারের স্বাদ বেশি সুবিধের হয় নি।

তবু শার্কি হেসে বলেন, “সে চেষ্টা করেছে, এই জন্যই ওকে ভালোবাসি!” আসলে মজা করার মনোভাব থেকেই তৈরি হয়েছে ‘ম্যান মেইক ডিনার ডে’—যা পরিবারের হাসি, আনন্দ, দায়িত্ববণ্টন ও মানসিক প্রশান্তিকে আরও সুন্দরভাবে তুলে ধরে। শার্কি বলেন, “প্রতি বছরই এই দিনে সামাজক মাধ্যমে অসংখ্য মজার বার্তা পাই। ভালো লাগে। কারণ এখন তো পুরো বিশ্বের মানুষ এ দিবস উদযাপন করছে।”” এই দিনের মূল ধারণা খুবই সহজ—“ঘর মানেই একসঙ্গে থাকা, তাহলে দায়িত্বও একসঙ্গে ভাগ হওয়া উচিত।”
আমাদের সমাজে বেশিরভাগ পুরুষের রান্নাজ্ঞান মানেই ডিম ভাজা, নুডলস বা এক কাপ চা বানানোতে সীমাবদ্ধ। অনেকের কাছেই রান্নাঘর যেন কেবল নারীদেরই জায়গা। তাই দিবসের উসিলায় হলেও পুরুষেরা রান্না করুক। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এমন ছোট ছোট আচরণ বড় পরিবর্তনের বীজ বপন করে।

বাড়ির শিশুটি যখন দেখে তার বাবা সবার জন্য রান্না করছে, যত্ন নিয়ে খাবার পরিবেশন করছে—সে এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে। বড় হয়ে সেও শিখে নেয় দায়িত্ব ভাগাভাগি, পারস্পরিক সম্মান আর শ্রদ্ধা। এতে দাম্পত্য সম্পর্কে বাড়ে সমতা, কমে বিরোধ। আর হ্যাঁ, রেসিপির খোঁজে ইউটিউবে ঢুঁ মারতে পারেন কিংবা চোখ বোলাতে পারেন ‘হাল ফ্যাশনের হেঁসেলে’। শুরুটা হোক একদিনেই, অভ্যাসটাগড়েউঠুকধীরেধীরে। আপনারএইপ্রচেষ্টাদেখেআপনারপ্রিয়মানুষটি এতটাই খুশি হবেন যে আপনি কল্পনা করতে পারবেন না।