
মঞ্চের আলো নিভে যায়, করতালি থেমে যায়, কিন্তু কিছু শিল্পীর উপস্থিতি কখনো শেষ হয় না। তাঁরা থেকে যান মানুষের স্মৃতিতে, গানের সুরে, নাচের ভঙ্গিমায়, এমনকি একটি জ্যাকেট, একটি টুপি কিংবা একজোড়া গ্লাভসেও। সময়ের সঙ্গে তাঁদের শিল্প নতুন প্রজন্মের হাতে নতুন অর্থ খুঁজে নেয়। সেই কারণেই কিংবদন্তিরা শুধু ইতিহাসের অংশ নন; তাঁরা সব সময়েরই সমসাময়িক।

এবার সেই অনুভূতিকেই নতুন রূপ দিতে যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। বিশ্বের পপ সংগীতের সর্বকালের অন্যতম সেরা পারফরমার মাইকেল জ্যাকসনের উত্তরাধিকার আর বাংলাদেশের কিংবদন্তি রক ব্যান্ড ওয়ারফেজের চার দশকের সংগীতযাত্রা মিলিত হচ্ছে একই মঞ্চে। তবে এটি কেবল একটি কনসার্ট নয়; সংগীত, ফ্যাশন, আলো, প্রযুক্তি ও ভিজ্যুয়াল আর্ট মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা।
সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, বদলে যায় সংগীত শোনার মাধ্যমও। কিন্তু কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের উপস্থিতি সময়ের ক্যালেন্ডারে আটকে থাকে না। তাঁরা প্রতিবারই ফিরে আসেন নতুন করে—কখনো একটি গানের ভেতর, কখনো একটি মঞ্চে, কখনো আবার একটি পোশাকের ঝলকে।
মাইকেল জ্যাকসন সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তিনি শুধু পপ সংগীতের রাজা নন; তিনি ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক ভাষা। তাঁর গান, নাচ, মঞ্চনৈপুণ্য, মিউজিক ভিডিও, পোশাক এবং মানবিক বার্তা—সব মিলিয়ে তিনি বিশ্বসংস্কৃতির এমন এক আইকন, যার প্রভাব আজও সমান উজ্জ্বল।

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতেও রয়েছে এমন একটি নাম, যা কয়েক দশক ধরে মানুষের আবেগ, প্রতিবাদ, প্রেম আর স্বপ্নের সঙ্গী হয়ে আছে—ওয়ারফেজ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যান্ডটি কেবল গানই গায়নি; গড়ে তুলেছে একটি প্রজন্মের সংগীতবোধ।
একজন বিশ্ব পপ সংস্কৃতির কিংবদন্তি, অন্যজন বাংলাদেশের রক সংগীতের প্রতীক। ৩১ জুলাই এই দুই উত্তরাধিকার মিলিত হবে একই মঞ্চে। ঢাকার বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে ‘প্লেলিস্ট: ট্রিবিউট টু অরিজিনস—মাইকেল জ্যাকসন X ওয়ারফেজ’। বাংলাদেশের কনসার্ট ইতিহাসে এটিই প্রথম এমন থিমভিত্তিক আয়োজন, যেখানে বিশ্বের অন্যতম সেরা পপ আইকনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে দেশের কিংবদন্তি রক ব্যান্ড।
তবে এটি শুধু একটি ট্রিবিউট কনসার্ট নয়। সংগীত, ফ্যাশন, প্রযুক্তি, আলোকসজ্জা ও ভিজ্যুয়াল আর্ট মিলিয়ে দর্শকদের জন্য নির্মিত হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ ইমার্সিভ অভিজ্ঞতা।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ডমিথ কমিউনিকেশনসের হেড অব বিজনেস রাকিবুল আজম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মাইকেল জ্যাকসনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাঁর জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রজন্মের আলোচনা এবং তাঁর সৃষ্টিকে নতুনভাবে আবিষ্কারের প্রবণতাই এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা।
কিন্তু তাঁদের লক্ষ্য ছিল না আর দশটি ট্রিবিউট শোর মতো একটি অনুষ্ঠান করা।
তাঁরা এমন একটি অভিজ্ঞতা নির্মাণ করতে চেয়েছেন, যেখানে দর্শক শুধু গান শুনবেন না; অনুভব করবেন একজন শিল্পীর উত্তরাধিকার, তাঁর মঞ্চজাদু, তাঁর নান্দনিকতা এবং সেই উত্তরাধিকারকে নিজেদের ভাষায় ধারণ করা ওয়ারফেজের শিল্পীসত্তাকেও।
এই ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছে দীর্ঘ পরিকল্পনা।

এ আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে অনেক আগে। নতুন করে ডিজাইন করা হয়েছে পুরো মঞ্চ। বিশাল এলইডি ওয়াল, সিনেম্যাটিক ভিজ্যুয়াল, অত্যাধুনিক লাইটিং, বিশেষ ইফেক্ট, কোরিওগ্রাফি—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এমন এক পরিবেশ, যেখানে প্রতিটি গান হয়ে উঠবে একটি দৃশ্য, আর প্রতিটি মুহূর্ত বলবে নতুন একটি গল্প।
প্রায় দুই ঘণ্টাজুড়ে পরিবেশিত হবে মাইকেল জ্যাকসনের ১৫টি কালজয়ী গান। এরপর থাকবে এক ঘণ্টার ওয়ারফেজের নিজস্ব পরিবেশনা। তবে অভিজ্ঞতা সেদিনের দর্শকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো কনসার্টটি মাল্টিক্যামেরা সিনেম্যাটিক প্রযুক্তিতে ধারণ করা হবে। পরে সেটি মিউজিক্যাল ফিল্ম হিসেবে প্রকাশের পাশাপাশি লাইভ অডিও অ্যালবাম প্রকাশেরও পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

মাইকেল জ্যাকসনের গান গাওয়া মানেই তাঁর কণ্ঠস্বর নকল করা—এমন বিশ্বাসে আস্থা রাখে না ওয়ারফেজ।
ব্যান্ডের ভোকাল পলাশ নূর বলেন, বাইরে থেকে মাইকেলের গান যতটা সহজ মনে হয়, একজন শিল্পী যখন তা পরিবেশনের চেষ্টা করেন, তখনই বোঝা যায় প্রতিটি লাইনের ভেতরে কত সূক্ষ্ম সংগীতচর্চা লুকিয়ে আছে।
তাঁদের লক্ষ্য অনুকরণ নয়, সৃষ্টিকে সম্মান জানানো।
মাইকেলের সৃষ্টিকে ওয়ারফেজের নিজস্ব রক ঘরানায় নতুনভাবে তুলে ধরাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
পলাশের ভাষায়, ‘মাইকেল জ্যাকসন প্রতিদিনই আমাকে কিছু না কিছু শেখান। তাঁর পুরো ক্যারিয়ারই একজন সংগীতশিল্পীর জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়।’
সম্প্রতি একুশে পদকে ভূষিত হয়েছে ওয়ারফেজ। পলাশ মনে করেন, এই সম্মান দর্শকের প্রত্যাশাকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে।
‘মানুষ এখন আমাদের কাছ থেকে নতুন কিছু আশা করে। সেই কারণেই আমরা এমন একটি আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, এটি বাংলাদেশের কনসার্ট ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’

গিটারিস্ট সৌমেন দাস হাসতে হাসতে বলেন, স্কুলজীবনে তিনি মুনওয়াক শেখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছেন, মাইকেলের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো নাচের স্টেপ নয়; তাঁর সৃজনশীলতার গভীরতা।
একজন শিল্পী যখন সৃষ্টি করতে করতে সময়ের হিসাব ভুলে যান, সেই ‘ফ্লো স্টেট’-ই তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। মাইকেলের ডকুমেন্টারি দেখলেই সেই নিবিষ্ট শিল্পীসত্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে মনে করেন তিনি।

একজন শিল্পীকে দর্শক শুধু শোনেন না, দেখেনও।
ওয়ারফেজের ড্রামার ও দলনেতা শেখ মনিরুল আলম টিপু মনে করেন, একজন পারফরমারের পোশাকও তার শিল্পভাষার অংশ।
‘দর্শক শুধু গান শুনতে আসে না, তারা শিল্পীকেও দেখতে আসে। তাই পোশাক, স্টাইল আর উপস্থাপনা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।’
এই কনসার্টেও সেই ভাবনাই গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যান্ডের নিজস্ব পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেই মাইকেল জ্যাকসনের আইকনিক স্টেজ লুকের আবহ তুলে ধরা হবে কস্টিউমে।
কেন আজও অনুপ্রেরণা মাইকেলের ফ্যাশন?

মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মৌলিকতা অভিমত সংগীতশিল্পী ও ফিটনেস মডেল ওয়াহিদা হুসেনের।
তিনি কাউকে অনুসরণ করেননি; বরং নিজেই তৈরি করেছিলেন নতুন এক ভিজ্যুয়াল ভাষা। তাঁর প্রতিটি পোশাক ছিল একটি বক্তব্য। প্রতিটি মঞ্চ যেন একেকটি জীবন্ত শিল্পকর্ম।
এ কারণেই কয়েক দশক পরও নতুন প্রজন্ম তাঁর ফ্যাশন থেকে অনুপ্রেরণা নেয়।
মাইকেল জ্যাকসনের নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কয়েকটি চিরচেনা ছবি—কালো ফেডোরা হ্যাট, এক হাতে ঝলমলে সাদা গ্লাভস, সোনালি অলংকরণে সাজানো মিলিটারি জ্যাকেট, থ্রিলারের লাল জ্যাকেট কিংবা বিলি জিনের ঝলমলে স্টেজ লুক।
এসব কেবল পোশাক কিংবা অনুষঙ্গ নয়; বিশ্ব পপ সংস্কৃতির স্থায়ী প্রতীক।
সেই ভিজ্যুয়াল উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই এই কনসার্টের অফিশিয়াল কস্টিউম তৈরি করেছে দেশের শীর্ষ সারির ব্র্যান্ড টুয়েলভ ক্লোদিং।
প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি ম্যানেজার (ডিজাইন) শুভাগত ভট্টাচার্য্য শুভ জানান, একটি থিমভিত্তিক কনসার্টকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য স্টেজ বা সংগীত যথেষ্ট নয়; দর্শকের সামনে সেই সময়, সেই চরিত্র এবং সেই আবহকে জীবন্ত করে তুলতে পোশাকের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সেই লক্ষ্যেই টুয়েলভের ডিজাইন টিম আশি ও নব্বইয়ের দশকে মাইকেল জ্যাকসনের বিশ্বভ্রমণ, বিখ্যাত কনসার্ট এবং সিগনেচার স্টাইল নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছে।
তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না কোনো পোশাক হুবহু নকল করা; বরং মাইকেলের মঞ্চ-উপস্থিতি, শক্তি ও ব্যক্তিত্বকে সমকালীন ভাষায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা।
কাজটি অবশ্য সহজ ছিল না। কারণ, সেই সময়ের ব্যবহৃত অনেক কাপড়, অলংকরণ, ট্রিমস ও অ্যাকসেসরিজ এখন আর সহজে পাওয়া যায় না। ফলে বেশির ভাগ উপকরণই নতুন করে তৈরি করতে হয়েছে।
প্রতিটি পোশাকের কাট, সিলুয়েট, অলংকরণ ও ফিনিশিং এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে মাইকেলের আইকনিক আবহ অক্ষুণ্ন থাকে, আবার শিল্পীরাও মঞ্চে স্বাচ্ছন্দ্যে পারফর্ম করতে পারেন।
শুভাগত ভট্টাচার্য্য শুভ মনে করেন, আন্তর্জাতিক একজন সংগীত কিংবদন্তিকে ঘিরে পূর্ণাঙ্গ থিম্যাটিক কস্টিউম সংগ্রহ তৈরি বাংলাদেশের কনসার্ট কস্টিউম ডিজাইনের ইতিহাসেও এটি নতুন একটি মাইলফলক।
তাঁর বিশ্বাস, দর্শক যখন ওয়ারফেজকে এই পোশাকে মঞ্চে দেখবেন, তখন তাঁরা শুধু কস্টিউম দেখবেন না; অনুভব করবেন একটি কিংবদন্তির ভিজ্যুয়াল উত্তরাধিকার।

এত বড় আয়োজন শুধু শিল্পীদের আবেগে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন অংশীদার, যারা সংস্কৃতির শক্তিতে বিশ্বাস করে।
এ আয়োজনের টাইটেল স্পনসর সুজুকি বাংলাদেশ–র্যানকন মোটরবাইকস লিমিটেড।
মজার বিষয় হলো, আশির দশকের শুরুতে মাইকেল জ্যাকসন নিজেও সুজুকির ‘লাভ ইজ মাই মেসেজ’ প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন। জনপ্রিয় CL50 Love স্কুটারকে ঘিরে নির্মিত সেই প্রচারণা পপ সংস্কৃতির স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।
চার দশক পর সেই ঐতিহাসিক সংযোগ যেন নতুন অর্থে ফিরে আসছে বাংলাদেশের মঞ্চে।
বাংলাদেশে কনসার্ট হয়েছে, সামনে আরও হবে। কিন্তু খুব কম আয়োজনই সময়ের সাংস্কৃতিক দলিলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আসে।
‘প্লেলিস্ট: ট্রিবিউট টু অরিজিনস—মাইকেল জ্যাকসন Xওয়ারফেজ’ ঠিক তেমনই একটি আয়োজন।

এখানে মিলবে বিশ্বের অন্যতম সেরা পারফরমারের প্রতি শ্রদ্ধা, ওয়ারফেজের চার দশকের সংগীতযাত্রার পরিপক্বতা এবং আলো, শব্দ, ফ্যাশন, প্রযুক্তি ও ভিজ্যুয়াল শিল্পের অনন্য মেলবন্ধন। কিংবদন্তিরা আসলে হারিয়ে যান না। তাঁদের সৃষ্টি নতুন শিল্পীর কণ্ঠে, নতুন প্রজন্মের অনুভবে, নতুন মঞ্চের আলোয় বারবার ফিরে আসে।
৩১ জুলাই, ঢাকার মঞ্চে আলো জ্বলবে আবার। আর সেই আলোর মধ্যেই নতুন প্রজন্মের সামনে ফিরে আসবেন এক কিংবদন্তি—নতুন কণ্ঠে, নতুন মঞ্চে, নতুন ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের নান্দনিকতায়।
ছবি: হাল ফ্যাশন, উইকপিডিয়া