
আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এখন ওপেন এআইয়ের চ্যাটজিপিটি। সোজা কথায় এটি দারুণ একটা টুল। বিরক্তিকর ইমেইল লেখায়, পার্টির আইডিয়া বের করতে কিংবা আপনাকে একটু বেশি স্মার্ট প্রমাণ করতে এটি সত্যিই কার্যকর। চ্যাটজিপিটি ছাড়া আজকাল যেন জীবন অচল। কিন্তু কিছু বিষয়ে কোনোভাবেই এর সাহায্য নেওয়া উচিত নয়। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

সমস্যা হলো, চ্যাটজিপিটি অনেক সময় অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসীভাবে ভুল করে। এই টুল এমনভাবে ভুল তথ্য দেয়, যেন সেটা একদম সঠিক। এর উত্তর অনেক সময় পক্ষপাতদুষ্ট, পুরনো, এমনকি পুরোপুরি ভুলও হতে পারে। রচনা, প্রেমপত্র বা কবিতা লেখার সময় এটা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু টাকা-পয়সা, স্বাস্থ্য বা আইনি বিষয়ে এটা ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে। তাই বড় কোনো ভুল করার আগে জেনে নিন চ্যাটজিপিটি কোন কোন বিষয়ে একদমই নির্ভরযোগ্য নয়।
নিচে এমন ৯টি বিষয় ও পরিস্থিতির উদাহরণ দেওয়া হলো, যেখানে ভুলেও চ্যাটজিপিটির সাহায্য নেওয়া উচিত নয়।
শারীরিক অসুস্থতা নির্ণয়
অনেকে কৌতূহলবশত চ্যাটজিপিটিতে নিজের রোগের উপসর্গ লিখে দেখেন। কিন্তু উত্তরগুলো এমন ভয় ধরিয়ে দিতে পারে, যে আপনি অসুস্থ মানুষের থেকেও অসুস্থ বোধ করবেন।

অবশ্য এই এআই টুল চিকিৎসার প্রস্তুতিতে সাহায্য করতে পারে। যেমন ডাক্তারের কাছে করার মতো প্রশ্ন তৈরি করা বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত জটিল ভাষা সহজ করা। কিন্তু এটা পরীক্ষা করতে পারে না, প্রেসক্রিপশন দিতে পারে না, আর কোনো চিকিৎসাজনিত দায়ও নেয় না।
মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন
চ্যাটজিপিটি আপনাকে কিছু মানসিক শান্তির টিপস বা ব্যায়াম নিয়ে পরামর্শ দিতে পারে, কিন্তু আপনি যদি সত্যিই বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকেন, এটি আপনাকে ফোন করবে না বা ইমার্জেন্সি অবস্থায় সাড়া দেবে না।

অনেকেই একে “বিকল্প থেরাপিস্ট” মনে করেন, কিন্তু এআইয়ের সহানুভূতি আসলে কৃত্রিম। এটা আপনার শরীরের ভাষা, কণ্ঠস্বর বা বাস্তব অনুভূতি বুঝতে পারে না। একজন প্রশিক্ষিত থেরাপিস্ট আইনি নিয়ম মেনে কাজ করেন এবং আপনাকে সুরক্ষা দেন, যা চ্যাটজিপিটি পারে না। তাই মানসিক কষ্টের সময়, মানুষের কাছেই সাহায্য চান।
জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া
আপনার ঘরে যদি গ্যাস লিক হয় বা আগুন ধরে যায়, তখন চ্যাটজিপিটি খুলে জিজ্ঞেস করার মানে হয় না। তাৎক্ষণিকভাবে বাইরে বেরিয়ে যান। এআই গ্যাস বা ধোঁয়ার গন্ধ পায় না, সাহায্য পাঠাতে পারে না। বিপদের সময় টাইপ না করে দ্রুত কাজ করুন। চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করুন ঘটনার পরে বিশ্লেষণের জন্য, ঘটনার সময় নয়।

আর্থিক বা ট্যাক্স সংক্রান্ত পরিকল্পনা
চ্যাটজিপিটি আপনাকে রিটার্ন বা মিউচুয়াল ফান্ড কী তা বুঝিয়ে দিতে পারে, কিন্তু আপনার আয়, ট্যাক্স রেট, ঋণ বা বিনিয়োগ ঝুঁকি জানে না। এর তথ্য পুরোনো হতে পারে, তাই ট্যাক্স বা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে চ্যাটজিপিটিকে ভরসা করা বিপজ্জনক।
গোপন বা সংবেদনশীল তথ্য দেওয়া
কখনোই নিজের বা ক্লায়েন্টের চুক্তিপত্র, চিকিৎসা রিপোর্ট, ট্যাক্স ডকুমেন্ট, পাসপোর্ট বা ব্যক্তিগত তথ্য চ্যাটজিপিটিতে দেবেন না। এই তথ্যগুলো তৃতীয় পক্ষের সার্ভারে যায়, যেগুলো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। যদি কোনো তথ্য আপনি পাবলিকভাবে শেয়ার না করেন, তাহলে চ্যাটজিপিটিতেও সেটা দেবেন না। সোজা নিয়ম এটা।
বেআইনি কিছু করা
এর ব্যাখ্যার দরকার নেই। অপরাধে এআই ব্যবহার করা যেমন ভুল, তেমনই আইনি দিক দিয়ে শাস্তিযোগ্য।
পরীক্ষায় বা পড়াশোনায় নকল করা
এআই দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রবন্ধ লিখিয়ে নেওয়া এখন খুব সহজ, কিন্তু ধরা পড়লে ফল হতে পারে খারাপ। বহিষ্কার, সাসপেনশন, এমনকি সার্টিফিকেট বাতিল পর্যন্ত হতে পারে এমন অ্যাকাডেমিক মিসকন্ডাক্টের জন্য। চ্যাটজিপিটিকে ব্যবহার করুন পড়াশোনার সহকারী হিসেবে, নিজের কাজের বিকল্প হিসেবে নয়।

ব্রেকিং নিউজ বা লাইভ তথ্য জানা
চ্যাটজিপিটি এখন ওয়েব সার্চ করে সাম্প্রতিক তথ্য আনতে পারে, কিন্তু এটি লাইভ আপডেট দেয় না। তাই সাম্প্রতিকতম ব্রেকিং নিউজ বা চলমান পরিস্থিতির জন্য নির্ভর করুন অফিসিয়াল নিউজ সাইট, টিভি কভারেজ বা লাইভ আপডেটের ওপর।
উইল বা আইনি চুক্তি লেখা
চ্যাটজিপিটি দিয়ে আপনি আইনি বিষয়গুলো বুঝতে পারেন, কিন্তু কোনো বৈধ দলিল তৈরি করতে বলবেন না। আইনের নিয়ম দেশ ও পরিস্থিতিভেদে আলাদা, আর একটি ছোট ভুলেই দলিলটি অকার্যকর হতে পারে। বরংচ্যাটজিপিটি দিয়ে প্রশ্নের তালিকা তৈরি করুন, পরে সেটি নিয়ে আসল আইনজীবীর কাছে যান।

সত্যি বলতে, চ্যাটজিপিটি অসাধারণ সহকারী। ইমেইল লেখা, আইডিয়া বের করা বা তথ্য বোঝার জন্য দারুণ টুল এটি। কিন্তু মনে রাখবেন, এআই আপনার ডাক্তার, আইনজীবী, থেরাপিস্ট বা অর্থনৈতিক পরামর্শক নয়। তাই বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করুন একে। যেখানে সীমা টানতে হবে, সেখানে টানুন।
তথ্যসূত্র: মিডিয়াম, সিনেট, টেক ডট কো
ছবি: এআই, ইন্সটাগ্রাম, পেকজেলস