ফাইনালের আগেই জিতে গেছে অ্যাডিডাস
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বিশ্বকাপের ট্রফি মাত্র একটিই। সেটি হাতে তুলবে হয় আর্জেন্টিনা, নয় স্পেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজয়ী কে—এই প্রশ্নের উত্তর অনেক বিশ্লেষকের কাছেই পরিষ্কার। মাঠে কে জিতবে, তা এখনও অজানা। কিন্তু বাণিজ্যিক দিক থেকে বিজয়ীর নাম অনেকটাই নিশ্চিত—অ্যাডিডাস।

মাঠের ফল নির্ধারণ হবে মাত্র ৯০ কিংবা ১২০ মিনিটে। কিন্তু ব্যবসার ফলাফল অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেছে সেমিফাইনাল শেষ হওয়ার পরই।

বিজ্ঞাপন

কারণ, এবারের ফাইনালে মুখোমুখি দুটি দলই অ্যাডিডাসের জার্সি পরে খেলছে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেছে নাইকিরও বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা। অর্থাৎ বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গায়ে এবার নিশ্চিতভাবেই থাকবে অ্যাডিডাসের তিনটি স্ট্রাইপস। আর নাইকিকে সন্তুষ্ট থাকতে থাকবে তৃতীয় স্থানে থেকে। কারণ তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি ছিল নাইকি-স্পন্সরড দুটি দল।

যেই জিতুক জিতবে অ্যাডিডাস
যেই জিতুক জিতবে অ্যাডিডাস

শুনতে এটি নিছক একটি মার্কেটিং তথ্য মনে হতে পারে। বাস্তবে এর অর্থ অনেক গভীর। বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের টুর্নামেন্ট নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া বিপণন মঞ্চ। এখানে গোল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ একটি জার্সির বুকে থাকা লোগো, একজন ফুটবলারের বুট কিংবা ম্যাচ শেষে বিক্রি হওয়া কোটি কোটি ডলারের মার্চেন্ডাইজ।

বিজ্ঞাপন

সংখ্যার খেলায় এগিয়ে অ্যাডিডাস

কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে
কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে

৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ১৪টি জাতীয় দলকে স্পন্সর করেছে অ্যাডিডাস। নাইকির ছিল ১২টি দল। পিউমা স্পন্সর করেছে ৭টি। বাকি দলগুলোকে স্পন্সর করেছে উমব্রো, কেলমে, কাপ্পা, ম্যারাথন, SAETA, 7Saber, মাজিদসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড।
সংখ্যার এই লড়াইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ব্যবসার সম্ভাবনা। যত বেশি দল, তত বেশি টেলিভিশন এক্সপোজার। যত বেশি নকআউট ম্যাচ, তত বেশি দৃশ্যমানতা। আর ফাইনালে উঠতে পারলে তো কথাই নেই। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ সেই জার্সির ছবি, ভিডিও, পোস্টার, বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট দেখবে বছরের পর বছর।

ফাইনালই শেষ নয়, জেতার পরই শুরু হয় আসল খেলা

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ শেষ হতে না হতেই শুরু হয় আরেকটি উৎসব; আর সেটা বাজারের।
বিশ্বকাপের সময় একজন সমর্থক হয়তো শুধু একটি জার্সিই কেনেন না। সেই জার্সির সঙ্গে যুক্ত হয় একই ব্র্যান্ডের ট্র্যাকস্যুট, ক্যাপ, ফুটবল, এমনকি ফুটবল বুটও। বিজয়ী দলের জার্সি হয়ে ওঠে সংগ্রহের বস্তু। অনেক সমর্থক ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনলাইনে অর্ডার দেন নতুন ‘চ্যাম্পিয়ন’ সংস্করণের জার্সি। ফলে বিশ্বকাপের প্রতিটি সাফল্য শুধু ট্রফি জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি পরিণত হয় দীর্ঘমেয়াদি বিক্রি, ব্র্যান্ড-আনুগত্য এবং বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের শক্তিশালী হাতিয়ারে।

ফাইনালের পরই শুরু হবে আসল খেলা
ফাইনালের পরই শুরু হবে আসল খেলা

ফাইনালের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজারে আসে "World Champions" সংস্করণের জার্সি। নতুন তারকা-খচিত জার্সি, সীমিত সংস্করণের কালেক্টরস এডিশন, ক্যাপ, জ্যাকেট, ট্রেনিং কিট, স্কার্ফ, ব্যাকপ্যাক, স্মারক বল—সবকিছুর বিক্রি মুহূর্তেই শুরু হয়।
বিশ্বকাপের আসল অর্থনীতি তাই মাঠের শেষ বাঁশির পরে শুরু হয়।
অ্যাডিডাস জানে, একটি বিশ্বকাপ জয়ের ছবি আগামী চার বছর বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা যাবে। সেই একটি ছবি থেকেই তৈরি হবে অসংখ্য টেলিভিশন বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন এবং নতুন পণ্যের প্রচার।

ম্যাচ বলও তাদের, মঞ্চও তাদের

বল অ্যাডিডাসের
বল অ্যাডিডাসের

এবারের বিশ্বকাপে অ্যাডিডাসের আরেকটি বড় উপস্থিতি ছিল অফিসিয়াল ম্যাচ বলে।
টুর্নামেন্টের জন্য তারা তৈরি করেছে ‘ট্রিওন্ডা’, আর সেমিফাইনাল ও ফাইনালের জন্য এনেছে বিশেষ ‘ট্রিওন্ডা ফাইনাল’। এতে রয়েছে কানেক্টেড বল টেকনোলজি, যা বলের স্পর্শের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে রেফারি ও ভিএআর সিস্টেমে পাঠাতে সক্ষম।
অর্থাৎ মাঠে খেলোয়াড়রা যে বলে খেলছেন, গোল করছেন, সেটিও অ্যাডিডাসের।
একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি লঞ্চ করেছে নতুন প্রজন্মের ‘F50 Hyperfast Evo’ বুট। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই বুট পরে খেলেছেন কয়েকজন তারকা। অ্যাডিডাস এটিকে তাদের সবচেয়ে হালকা প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল বুটগুলোর একটি হিসেবে প্রচার করছে।
এছাড়া নতুন রঙে এসেছে ‘Predator’ সিরিজও। বিশ্বকাপকে ঘিরেই এসব পণ্যের বৈশ্বিক বিক্রি বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

নাইকি কি পিছিয়ে যাচ্ছে?

লড়াই ছাড়াছে না নাইকি
লড়াই ছাড়াছে না নাইকি

একেবারেই নয়।
বরং বিশ্বকাপে হেরে গেলেও ব্যবসার লড়াইয়ে নাইকি এখনও অ্যাডিডাসের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তিগত ক্রীড়া স্পন্সরশিপগুলোর বড় অংশই এখনও নাইকির হাতে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, আর্লিং হলান্ড, গাভি, কোবি মাইনু, জামাল মুসিয়ালা—নতুন প্রজন্মের বহু তারকা তাদের সঙ্গে যুক্ত।
নাইকি জানে, একটি বিশ্বকাপ সবকিছু নির্ধারণ করে না। আগামী চার বছরজুড়ে ক্লাব ফুটবল, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তৈরি হবে নতুন বাজার।

পিউমা কি পিছিয়ে যাচ্ছে?

পিউমা তার মতো করেই এগোচ্ছে
পিউমা তার মতো করেই এগোচ্ছে

অ্যাডিডাস ও নাইকির আলোচনার আড়ালে পিউমাও বসে নেই।
নেইমার এখনও তাদের সবচেয়ে বড় মুখ। পাশাপাশি তারা আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করছে। বিশ্ববাজারে তাদের অংশ তুলনামূলক ছোট হলেও নির্দিষ্ট অঞ্চলে পিউমার অবস্থান শক্তিশালী।

ফিফা কি অ্যাডিডাসকে বিদায় বলছে?

ফিফাকে বিদায় বলছে না অ্যাডিডাস
ফিফাকে বিদায় বলছে না অ্যাডিডাস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুঞ্জন রয়েছে—বিশ্বকাপের পর নাকি ফিফার সঙ্গে অ্যাডিডাসের দীর্ঘ সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে, জায়গা নেবে নাইকি।
বাস্তবে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেই।
১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল তৈরি করছে অ্যাডিডাস। ফিফার সবচেয়ে পুরোনো বাণিজ্যিক অংশীদারদের অন্যতমও তারা। ভবিষ্যতে নতুন দরপত্র হতে পারে, নতুন স্পন্সরও আসতে পারে, কিন্তু এখন পর্যন্ত নাইকি দায়িত্ব নিচ্ছে—এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা হয়নি।

মেসি কি এখনও অ্যাডিডাসের সবচেয়ে বড় সম্পদ?

এখনও অ্যাডিডাসের মূল হাতিয়ার মেসি
এখনও অ্যাডিডাসের মূল হাতিয়ার মেসি

বিশ্বকাপ ফাইনালের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিতে পারেন লিওনেল মেসি; তাবলে তাঁর বাজারমূল্য কমে যাবে, মনে হয় না।
অ্যাডিডাসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি ব্যক্তিগত চুক্তি রয়েছে। ইন্টার মিয়ামির সঙ্গে তাঁর আরও দুই বছরের চুক্তি আছে। ফলে ক্লাব ফুটবল, লাইফস্টাইল কালেকশন, সিগনেচার বুট, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম, ক্যাজুয়াল পোশাক—সবখানেই মেসি থাকবেন অ্যাডিডাসের অন্যতম প্রধান মুখ।
শুধু তাই নয়, শিশুদের জন্য Adidas Kids ক্যাম্পেইনেও মেসি গুরুত্বপূর্ণ ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। ফুটবল ছেড়ে দিলেও তিনি বিজ্ঞাপন, সামাজিক উদ্যোগ, তরুণ ফুটবলার উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইনে অ্যাডিডাসের সঙ্গে যুক্ত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

আগামী দশকের মুখ কারা?

কে আছে কোন দলে
কে আছে কোন দলে

ফুটবলের ব্যবসা সবসময় ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে।
অ্যাডিডাস ইতোমধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের বড় অংশ রেখেছে লামিনে ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম, ফ্লোরিয়ান ভিরৎস, পেদ্রি, আলেহান্দ্রো গারনাচোদের ওপর।
নাইকির ভরসা এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, হলান্ড, মুসিয়ালা, কোবি মাইনু, গাভিরা।
পিউমা চেষ্টা করছে পরবর্তী সুপারস্টারদের শুরুতেই নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে।
আজকের কিশোর ফুটবলারই আগামী দশকের বিলিয়ন ডলারের ব্র্যান্ড।

বিশ্বকাপের আসল শিক্ষা

বিশ্বকাপে আমরা গোল দেখি, ট্রফি দেখি, আবেগ দেখি।
কিন্তু প্রতিটি গোলের পেছনে থাকে গবেষণা। প্রতিটি জার্সির পেছনে থাকে ডিজাইন টিম। প্রতিটি বুটের পেছনে থাকে বছরের পর বছর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। আর প্রতিটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ছবির পেছনে থাকে বিপণনের এক বিশাল পরিকল্পনা।
এক সময় বিশ্বকাপের নায়ক ছিলেন শুধু খেলোয়াড়েরা। এখন নায়ক ব্র্যান্ডও। একটি গোল যেমন ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়, তেমনি একটি বিশ্বকাপ বদলে দিতে পারে একটি ক্রীড়া ব্র্যান্ডের বিক্রি, বাজারমূল্য ও বৈশ্বিক প্রভাবের হিসাব। তাই আধুনিক ফুটবলে প্রতিটি পাস, প্রতিটি উদযাপন এবং প্রতিটি ট্রফির সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে চলে আরেকটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা—ব্র্যান্ডের।

এই আবেগ রূপান্তরিত হয় বাণিজ্যে
এই আবেগ রূপান্তরিত হয় বাণিজ্যে

এই কারণেই বিশ্বকাপ শেষ হলেও ব্র্যান্ডের বিশ্বকাপ কখনও শেষ হয় না।
চার বছর পর আবার নতুন বিশ্বকাপ আসবে। নতুন নায়ক আসবে। নতুন বুট আসবে। নতুন জার্সি আসবে।
কাজেই অ্যাডিডাস, নাইকি আর পিউমার এই লড়াই চলতেই থাকবে।
কারণ ফুটবলে ট্রফি থাকে মাত্র একটি। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রকৃত বিজয়ীদের গল্প লেখা হয় কোটি কোটি মানুষের আলমারিতে ঝুলে থাকা জার্সি, পায়ে থাকা বুট এবং মনে গেঁথে থাকা একটি ব্র্যান্ডের পরিচয় দিয়েও।

ছবি: ইন্সটাগ্রাম, ইনফোগ্রাফ: এআই

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন