টর্পেডো, ব্যালিস্টিক মিসাইল, কামিকাজে ড্রোন: ইরান, ইসরায়েল আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্রগুলোর কোনটি কী করে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোর নাম এখন সংবাদে, সামাজিক মাধ্যমে আর মুখে মুখে। একদিকে মারাত্মক ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে, অন্যদিকে সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে। টর্পেডো, ক্রুজ মিসাইল, কামিকাজে ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতো এই অস্ত্রগুলো সম্পর্কে এখন সবার আগ্রহ অনেক বেশি। জেনে রাখা যাক এগুলো সম্পর্কে এক নজরে।

ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল

ব্যালিস্টিক মিসাইল এমন ক্ষেপণাস্ত্র যা মহাকাশের কাছাকাছি উচ্চতায় উঠে আবার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। ইরানের শাহাব, ফাত্তাহ, খোররামশাহ এবং সেজ্জিল সিরিজের মিসাইলের বোমার ওজন শতাধিক কেজি হতে পারে। একটি সফল হামলা সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর বা শহরের বড় অংশ ধ্বংস করতে পারে। এর গতি অত্যন্ত বেশি, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রায় অসফল করে তোলে।

ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ফাত্তাহ। এ্টি হাইপারসোনিক
ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ফাত্তাহ। এ্টি হাইপারসোনিক
সেজ্জিল নামের এই ব্যালিস্টিক মিসাইলও ইরানের
সেজ্জিল নামের এই ব্যালিস্টিক মিসাইলও ইরানের

ইরানের দীর্ঘ-দূরত্বের ব্যালিস্টিক মিসাইল ২,০০০–২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। তবে এরা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে না; বরং ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত করতে সক্ষম। ছোট ব্যালিস্টিক মিসাইল (১৫০–৮০০ কিমি) দ্রুত আঘাতের জন্য তৈরি এবং একাধিক মিসাইল একসঙ্গে নিক্ষেপ করা যায়, যা প্রতিরক্ষা কঠিন করে তোলে। মধ্য-দূরত্বের মিসাইল (১,৫০০–২,০০০ কিমি) ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাতের সুযোগ দেয়।

বিজ্ঞাপন

ইরানের ক্রুজ মিসাইল

ক্রুজ মিসাইল তুলনামূলকভাবে নিচু উচ্চতায় উড়ে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। জিপিএস ও উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থার কারণে এগুলো সামরিক স্থাপনা, তেল রিফাইনারি বা বিমানবন্দর ধ্বংসে অত্যন্ত কার্যকর। নির্ভুলতার কারণে এটিকে ‘স্মার্ট অস্ত্র’ বলা হয়। ক্রুজ মিসাইল নিচু উচ্চতায় উড়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে।

ক্রুজ মিসাইল ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক হামলার সঙ্গে একসঙ্গে ব্যবহার করলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জটিল হয়ে ওঠে
ক্রুজ মিসাইল ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক হামলার সঙ্গে একসঙ্গে ব্যবহার করলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জটিল হয়ে ওঠে

ইরানের সুমার, ইয়া আলি, কুদস এবং হোভেইজে ক্রুজ মিসাইল ২,৫০০ কিমি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এগুলোকে ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক হামলার সঙ্গে একসঙ্গে ব্যবহার করলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জটিল হয়ে ওঠে। এই আধুনিক অস্ত্রগুলো ব্যবহার করলে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, বিমানবন্দর এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মানবিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবও দ্রুত তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

ইরানের স্বল্প খরচের বিধ্বংসী ড্রোন

ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। ইরান স্বল্প ব্যয়বহুল আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করে, যা লক্ষ্যবস্তুতে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। ছয় দিন পার হওয়ার পর, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে লক্ষ্যবস্তুতে ২,০০০-এর বেশি কম খরচের ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

সারি সারি শাহেদ কামিকাজে ড্রোন
সারি সারি শাহেদ কামিকাজে ড্রোন

এই ড্রোন আক্রমণ মূলত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করে এবং অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এই “কামিকাজে” শাহেদ ড্রোনগুলো বিস্ফোরক   বহন করে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করলে তা বিস্ফোরণ হয়, ফলে বড় ধ্বংসক্ষতি ঘটতে পারে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে মারাত্মক আক্রমণটি ছিল কুয়েতের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন আঘাত, যেখানে ছয়জন মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছে।

মার্কিন টর্পেডো

টর্পেডো জাহাজ ও সাবমেরিনকে লক্ষ্য করে পানির নিচ দিয়ে ছুটে যায়। জানা যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার কাছে ভারত মহাসাগরে গত বুধবার মার্কিন হামলায় ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’তলিয়ে গেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছোড়া হলো
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছোড়া হলো

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে কোনো যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হলো। পেন্টাগন এখন পর্যন্ত হামলাকারী সাবমেরিনটির নাম প্রকাশ করেনি। ওই দিন সকালে প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় ইরানের যুদ্ধজাহাজটির পেছনের অংশে একটি টর্পেডো আঘাত হানছে এবং বিশাল জলরাশি আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। হামলায় যুদ্ধজাহাজটির মূল কাঠামো দ্বিখণ্ডিত হতে দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল

লকহিড মার্টিনের পি আর এস এম হলো একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল, যা  M-142 হাই মোবলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (HIMARS) এর সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। এটি প্রায় ২৫০ মাইল (৪০০ কিলোমিটার) দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম। HIMARS ট্রাক-ভিত্তিক হওয়ায় শুট-অ্যান্ড-স্কুট কৌশল প্রয়োগ করা যায় অর্থাৎ ফায়ার করে দ্রুত নতুন অবস্থানে সরানো যায়। HIMARS ৩০০ মাইলের বেশি দূরের লক্ষ্যও আঘাত করতে পারে।

এই মিসাইল শুট-অ্যান্ড-স্কুট কৌশল প্রয়োগ করা যায় অর্থাৎ ফায়ার করে দ্রুত নতুন অবস্থানে সরানো যায়
এই মিসাইল শুট-অ্যান্ড-স্কুট কৌশল প্রয়োগ করা যায় অর্থাৎ ফায়ার করে দ্রুত নতুন অবস্থানে সরানো যায়

মার্কিন লুকাস ড্রোন

যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ হাজার ডলার মূল্যের লুকাস ড্রোনগুলো কামিকাজে ধরণের, যা লক্ষ্যবস্তুতে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এগুলো মূলত ইরানের শাহেদ ড্রোনের নক-অফ মডেল।  এই ড্রোন ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত এবং কম খরচে আঘাত করতে সক্ষম। লুকাস ড্রোনগুলো প্রথমবারের মতো এই মার্কিন হামলা অপারেশন এপিক ফিউরিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ইরানের শাহেদ ড্রোনের  নক-অফ মডেল এই লুকাস ড্রোনগুলো
ইরানের শাহেদ ড্রোনের নক-অফ মডেল এই লুকাস ড্রোনগুলো

যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ নাইন রিপার ড্রোন

এম কিউ নাইন রিপার হলো একক ইঞ্জিনযুক্ত টার্বোপ্রপ ড্রোন, যা উচ্চ মূল্যের আর ক্ষণস্থায়ী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে ব্যবহার হয়। এগুলো হেলফায়ার মিসাইল এবং গাইডেড বোমা বহন করে এবং পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহেও ব্যবহার হয়।

ইসরায়েলি আয়রন ডোম

ইসরায়েলি এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত ছোট ও মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল, রকেট এবং আর্টিলারি শেল ঠেকানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
পরিসর: ৪–৭০ কিমি পর্যন্ত।
ক্ষমতা: লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানো আগে শত্রুর রকেট ধ্বংস করতে সক্ষম।
প্রভাব: নগর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করে।

আয়রন ডোম মিসাইলের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে অনেকটা
আয়রন ডোম মিসাইলের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে অনেকটা

ইসরায়েলি ডেভিডস স্লিং

মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ মিসাইলের জন্য। ইরানের কিছু মধ্য-দূরত্বের মিসাইল ঠেকানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
পরিসর: প্রায় ৪০–৩০০ কিমি।
ক্ষমতা: উচ্চ গতির ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলকে বাতাসে ধ্বংস করতে পারে।

ইসরায়েলের অ্যারো মিসাইল সিস্টেম

দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা এটি, যা ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যৌথ উন্নয়ন প্রজেক্ট
পরিসর: ৫০০–২,০০০ কিমি পর্যন্ত।
ক্ষমতা: বড়, উচ্চগতির ব্যালিস্টিক মিসাইল, বিশেষত ইরানের বড় মিসাইল ঠেকাতে সক্ষম।
প্রভাব: বড় শহর ও সামরিক ঘাঁটি রক্ষা করে

ইসরায়েলি আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র

ইসরায়েল শুধু প্রতিরক্ষা নয়, আক্রমণেও সক্ষম। তারা সাধারণত ব্যবহার করে:
হালকা ও মাঝারি ক্রুজ মিসাইল: নির্ভুল আঘাত, সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে।
ড্রোন ও অ্যানম্যান্ড এয়ারক্রাফট: নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, এবং ছোট আত্মঘাতী হামলা।

সূত্র: আল জাজিরা, সিএনএন, উইকিপিডিয়া

ছবি: ইন্সটাগ্রাম ও উইকিমিডিয়া কমন্স

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৯: ১০
বিজ্ঞাপন