
৫৫ বছর পর রেস্টোর্ড ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ গেল বছর স্ক্রিনিং হয় কান ক্ল্যাসিকস বিভাগে। কানের বুনুয়েল থিয়েটারের এই স্ক্রিনিংয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন শর্মিলা ঠাকুর ও সিমি গারেওয়াল। ‘বটল রকেট’, ‘রাশমোর’ খ্যাত আমেরিকান পরিচালক ওয়েস অ্যান্ডারসন উৎসবে প্রেজেন্ট করেছিলেন সিনেমাটি।

কানের বুনুয়েল থিয়েটারে ছবির প্রদর্শন শেষ হওয়ার পর দুই মিনিট ধরে শর্মিলা, সিমিকে দর্শক যে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ (দাঁড়িয়ে সম্মান) জানায়, এতে প্রমাণ হয়, সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য হয় সৃষ্টির নিয়মেই, দর্শকের অফুরান ভালোবাসায়। আর সেখানেই সৃষ্টির সার্থকতা। সেখানেই সৃষ্টি কালজয়ী হয়, পায় অমরত্ব।
১৯ মে ২০২৫। ১৫ মে টিকিট বুক করেছিলাম ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী কান চলচ্চিত্র উৎসবে যেকোনো সিনেমা দেখতে গেলে চার দিন আগে টিকিট বুক করতে হয়। রোজ সকাল সাতটায় উঠে ‘ফাস্টেস্ট ফিঙ্গারস ফার্স্ট’ খেলতে হয় কানের অনলাইন টিকিট সাইটে। প্রতিদিন সকাল ৬টা ৫৮ মিনিটে শুরু হয় কাউন্টডাউন। ৭টায় খোলে বুকিং সাইট। ঠিক ৭টার পর বড়জোর দুই মিনিট। তার মধ্যেই সব টিকিট শেষ।
ঘুমের এদিক–সেদিক হওয়াতে সেই সুযোগ মিস! কি আর করা! তবে এটাও সত্যি, সুযোগ একেবারেই শেষ হয়ে যায় না। প্রতিদিন কয়েকবার সাইটে ঘুরে আসি। যদি কেউ বুকিং টিকিট ক্যানসেল করে! ভাগ্য দেবী মুখ তুলে চাইলেন স্ক্রিনিংয়ের ঠিক আগের দিন। ১৮ মে সাইটে পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত টিকিট।
১৯ মে ২০২৫, সোমবার, পালে দ্য ফেস্টিভালের বুনুয়েল থিয়েটার। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিট। ধারণা ছিল, দর্শকের বড় অংশই উৎসবে আসা ভারতীয়রা হবেন। কিন্তু ধারণাটা প্রায় মিথ্যে করে বুনুয়েল থিয়েটারের সামনে ছিল ইউরোপের দর্শকেরই রাজত্ব। সবচেয়ে অবাক হয়েছি, এদের বেশির ভাগই তরুণ দর্শক।
তাদেরই সঙ্গে ৫৫ বছর আগে তৈরি এক বাংলা ছবি দেখতে হাজির আমি, এই প্রজন্মের এক বাঙালি সিনে সাংবাদিক। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ যখন তৈরি হয় তখন আমার জন্ম হয়নি। কিন্তু ছবিটা আমি দেখেছি একাধিকবার। সিনেমা বুঝতে শেখার আগেই দেখে ফেলেছি, বুঝতে শিখে আবার দেখেছি।
কানের প্রেক্ষাগৃহে তিলধারণের জায়গা ছিল না। দর্শকাসনে বিশ্ববন্দিত পরিচালক আলেহান্দ্র ইনারিতু আর প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক দারিয়াস খোন্দজি। রাত ৮টা নাগাদ ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ উপস্থাপন করতে মঞ্চে এলেন ‘ফিল্ম ফাউন্ডেশন’-এর বোর্ড সদস্য এবং স্বঘোষিত সত্যজিৎ-ভক্ত ওয়েস অ্যান্ডারসন। চার পাতার ভূমিকা লিখে এনেছিলেন, পড়ে শোনালেন। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’কে ‘সাইকোলজিক্যাল মিডসামার নাইট স্পেল’ বলে আখ্যা দিলেন তিনি। বললেন, ‘এই সিনেমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি আজ সিনেমার একজন ভক্ত হিসেবে কথা বলছি। এই ছবি আমি প্রথম দেখেছিলাম ২৫ বছর আগে, নিউ জার্সির এক বলিউড সিনেমার দোকান থেকে আনা ঝাপসা নকল ডিভিডিতে।’

ওয়েসের পাশে তখন অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর এবং সিমি গারেওয়াল। রয়েছেন ‘দ্য ফিল্ম ফাউন্ডেশন’-এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মার্গারেট বড্ডে।
ছবি দেখানো শুরু হলো স্থানীয় সময় রাত ৮টা ১৩ মিনিটে। তার পরের ১১৫ মিনিট শুধুই মুগ্ধতার, গর্বের, আনন্দের। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ শ্রেণি–সচেতনতা, বাঙালি পুরুষের স্বার্থপরতা, ষাটের দশকে নর–নারীর সম্পর্ক, আদিবাসীদের প্রতি শহুরে মানুষের উন্নাসিকতা— বিভিন্ন দিক উঠে আসে। রবি ঘোষের অনবদ্য হাস্যরসে মাঝেমাঝেই উদ্বেলিত প্রেক্ষাগৃহ।
চার বন্ধুর পারস্পরিক সম্পর্ক, শর্মিলা ঠাকুরের ব্যক্তিত্বের রহস্যময়তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন দর্শক। তাঁরা পেলেন ঝকঝকে ছবি, ৫.১ মিক্স, নতুন করে লেখা সাবটাইটেল—সবকিছু ঠিক তেমনই, যেমনটি বোধহয় চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়।

সে এক দারুণ স্ক্রিনিং। কানে সবুজ শাড়ি পরে রাজকীয় কায়দায় এলেন পতৌদি বেগম শর্মিলা। এলেন, দেখলেন আর জয় করে নিলেন সবার মন। সিমিও তাই। স্ক্রিনিংয়ে তিনি পরেছিলেন সাদা পোশাক। কানের স্যাল বুনুয়েল প্রেক্ষাগৃহে দাঁড়িয়ে শর্মিলা ঠাকুর মনে করলেন প্রিয় মানিক বাবুর শুটিংয়ের স্মৃতি। পালামৌর জঙ্গলে কি মুনশিয়ানায় তিনি বুনেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার সেলুলয়েডগাথা। কিছুটা দুঃখ মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি আর সিমিই শুধু বেঁচে আছি। বাকিরা প্রত্যেকেই মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুদর্শন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় স্টাইলের এক অনন্য দৃষ্টান্ত যিনি রেখে গেছেন।’
আর সিমি বললেন, ‘৫৬ বছর আগে মানবসভ্যতা থেকে দূরে একটি জঙ্গলে শুটিং করেছিলাম আমরা। শীতাতপ যন্ত্র তো দূর, সেখানে ইলেকট্রিসিটিও ছিল না। জল, বাথরুম, টিভি, ফোন— কিছুই ছিল না। তাতে কিছুই যায় আসেনি আমাদের। পৃথিবীর অন্যতম সেরা পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করেছিলাম আমরা। আমি বাংলা জানতাম না, ফলে, এই ছবিতে কাজ করা ছিল আমার জন্য বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার।’
স্ট্যান্ডিং ওভেশন শেষে থিয়েটার থেকে যখন বিদায় নিচ্ছিলেন অতিথিরা, আমি তখন ক্যামেরা হাতেই ছুটছিলাম পর্দার ‘অপর্ণা’র উদ্দেশে।
২০২৪–এর জানুয়ারিতে তাঁর ঢাকা সফরে আলাপ হয়েছিল কয়েকবার। সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম। মুখোমুখি হতেই চিনতে পারলেন। তবে আয়োজকদের অনুমতি নেই, তাই ক্যামেরায় কথা বলতে চাইলেন না। তবে হাসিমুখে ছবিটা তুললেন। আর জানালেন শুভ রাত্রি!
প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে হাঁটতে থাকলাম ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা ধরে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছিল তখন। ভাবছিলাম, ৫৫ বছরে কত কিছু পাল্টেছে। তবু ১১৫ মিনিটের সম্মোহন থেকে গেছে অবিকল। তাই আমি স্মৃতিতে তুলে রাখলাম। কান সৈকতে দিন পেরিয়ে তখন মাত্র রাত নেমেছে।
লেখক: সাংবাদিক ও গোল্ডেন গ্লোব ভোটার
ছবি: লেখক, উইকিপিডিয়া ও ভিডিও থেকে