
পৃথিবীর সবচেয়ে যুক্তিবাদী দেশের মানুষেরা ফুটবল নিয়ে এতই আবেগী যে এক্ষেত্রে তারা নিজেদের চরিত্র বদলে ফেলে। জার্মানদেরকে বিশ্ব চেনে শৃঙ্খলা, সময়নিষ্ঠতা আর যুক্তিবাদের জন্য। প্রকৌশল, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবখানেই তাদের নিখুঁত পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট।

কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, সেই আধুনিক জার্মানির ফুটবলার থেকে শুরু করে জার্মান ফ্যানদের মধ্যেও আছে মজার সব কুসংস্কার, ছোট ছোট বিশ্বাস আর ম্যাচডে রিচুয়াল, যেগুলো খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মানসিক শক্তির অংশ হয়ে গেছে।
ফুটবলে কুসংস্কার নতুন কিছু নয়। চাপ, উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার খেলায় মানুষ প্রায়ই এমন কিছু আঁকড়ে ধরে, যা তাকে নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়। জার্মানির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। চলুন দেখে নিই কী কী বিশ্বাস করে তারা।

একই জার্সি, একই ভাগ্য
অনেক জার্মান সমর্থকের বিশ্বাস, যে জার্সি পরে দল জিতেছে, সেটি না বদলানোই ভালো। বিশেষ করে জার্মান জাতীয় ফুটবল দল বড় টুর্নামেন্টে ভালো খেললে একই জার্সি, একই স্কার্ফ, এমনকি একই টুপি পরে খেলা দেখেন অনেকে। ২০১৪ র বিশ্বকাপে জার্মানি যখন চ্যাম্পিয়ন হয়, অনেক সমর্থক স্বীকার করেছিলেন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে তাঁরা একই ‘লাকি’ জার্সি পরে ছিলেন।
খেলোয়াড়দের ‘লাকি বুট’
পেশাদার ফুটবলারদের মধ্যেও কুসংস্কার কম নয়। সাবেক জার্মান গোলরক্ষক জেনস লেহমান ছিলেন এক্ষেত্রে খুবই নিষ্ঠাবান। ম্যাচের আগে তাঁর নির্দিষ্ট রুটিন ছিল। বাম মোজা আগে, তারপর ডান পায়ের। ছোট্ট এই ক্রম ভেঙে গেলে তাঁর ভীষণ অস্বস্তি হতো।


কিংবদন্তি জার্মান ফুটবলার মিরোস্লাভ ক্লোস সম্পর্কেও শোনা যায়, বড় ম্যাচের আগে তিনি নির্দিষ্ট এক জোড়া বুটই বেছে নিতে পছন্দ করতেন, বিশেষ করে যদি আগের ম্যাচে এই বুট পরে গোল করে থাকেন। অনেক খেলোয়াড় বিশ্বাস করেন যে বুটে গোল এসেছে, সেই বুটেই সৌভাগ্য লুকিয়ে আছে।
মাঠে পা রাখার বিশেষ নিয়ম
জার্মান খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ কেউ মাঠে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট নিয়ম মানেন। কেউ ডান পা আগে রাখেন, কেউ ক্রস চিহ্ন আঁকেন, কেউ ঘাস ছুঁয়ে কপালে হাত দেন। মিরোস্লাভ ক্লোস এবং লুকাস পডোলস্কির মতো অনেক খেলোয়াড় ম্যাচের আগে প্রার্থনা বা ব্যক্তিগত রিচুয়াল পালন করতেন, যা তাঁদের মানসিকভাবে স্থির হতে সাহায্য করত।

পেনাল্টির সময় নিঃশ্বাস বন্ধ
জার্মান সমর্থকদের আরেক বিখ্যাত কুসংস্কার পেনাল্টির সময় আসন পরিবর্তন না করা। স্টেডিয়ামে কিংবা বাড়িতে, যদি গোল হয়, তবে অনেকে বিশ্বাস করেন সেই অবস্থান বদলানো যাবে না। কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে দাঁড়িয়েই থাকেন, কেউ সোফার কোণায় বসে থাকলে শেষ পর্যন্ত সেখানেই।অনেক নিশ্বাস বিন্ধ করে থাকেন শট নেবার আগ পর্যন্ত। শুনতে মজার হলেও বড় ম্যাচে এই বিশ্বাস ভয়ানক সিরিয়াস হয়ে ওঠে।

লাকি খাবার
ম্যাচডে খাবার নিয়েও কুসংস্কার আছে। অনেক পরিবার বড় ম্যাচে একই খাবার খায়—বিশেষ করে সসেজ, প্রেটজেল বা আলু দিয়ে তৈরি নানা পদ। তাদের ধারণা, আগের জয়ের দিনে যা খাওয়া হয়েছিল, সেটাই আবার খেতে হবে। খাবার যেন সৌভাগ্যের অংশ।
টেলিভিশনের সামনে ‘নড়াচড়া নিষেধ’
এই কুসংস্কার সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয়। টিভির সামনে বসে খেলা দেখার সময় অনেক জার্মান সমর্থক বিশ্বাস করেন দল ভালো খেললে অবস্থান বদলানো যাবে না। কেউ পানি খেতে উঠতে চান না, কেউ ওয়াশরুমেও যান না, কারণ “আমি উঠলেই দল গোল খেয়ে যাবে!” এই বিশ্বাস শুধু জার্মানিতে নয়, বিশ্বজুড়েই পরিচিত কিন্তু জার্মান সমর্থকদের মধ্যে এটি বিশেষভাবে প্রচলিত।

যুক্তির আড়ালে আবেগ
বাইরে থেকে দেখলে এসব নিছক কুসংস্কার। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলে, চাপের মুহূর্তে মানুষ এমন আচরণে স্বস্তি খুঁজে পায়। এগুলো খেলোয়াড়দের ফোকাস বাড়াতে এবং সমর্থকদের উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। তাই জার্মান ফুটবলের কুসংস্কার আসলে অযৌক্তিক বিশ্বাসের গল্প নয়; বরং এটি আবেগ, আশা আর মানসিক প্রস্তুতির গল্প। কারণ শেষ পর্যন্ত ফুটবল শুধু কৌশলের খেলা নয়। এটি বিশ্বাসেরও খেলা। হয়তো সেই কারণেই যুক্তির দেশ জার্মানিতেও, ম্যাচের আগে কেউ একই মোজা পরে, কেউ একই চেয়ারে বসে, কেউ একই প্রার্থনা করে। কারন একটাই প্রিয় দলের জয়।
সূত্র: দ্য স্ট্রেইট টাইমস, সোফাস্কোর
ছবি: ইন্সটাগ্রাম