সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দিন ধরে ভাইরাল এই 'রংধনু মেঘ' আসলে কী?
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মেঘ দেখলে নানা রকম ভাবনা মাথায় আসে। কখনো মনে হয় নজরুলের ঝাঁকড়া চুল, কখনো রবীন্দ্রনাথের দাড়ি। গোধূলিতে কিংবা সূর্যোদয়ের সময় সোনালি আভায় মেঘ হয়ে ওঠে কোনো রূপবতী রাজকুমারী। আবার কখনো সাদা, নীল, গোলাপি, হলুদ কিংবা বেগুনি রঙের মিহি আভা মেঘের কিনারায় বা কোনো একটি অংশে এমনভাবে ফুটে ওঠে যে কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশটাকে বাস্তবের চেয়েও বেশি সুন্দর মনে হয়।

কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশটাকে বাস্তবের চেয়েও বেশি সুন্দর মনে হয়
কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশটাকে বাস্তবের চেয়েও বেশি সুন্দর মনে হয়

বৃষ্টির পর রংধনু দেখে আমরা মুগ্ধ হই, কিন্তু ইরেডেসেন্ট ক্লাউড এক অন্য রকম সৌন্দর্য। পুরোপুরি রংধনু নয়, অথচ মেঘের গায়ে রংধনুর মতোই ছড়িয়ে থাকে নানা রঙের কোমল আভা। আকাশের এই বিরল অথচ অপূর্ব দৃশ্যের নাম ইরেডেসেন্ট ক্লাউড বা রংধনু মেঘ, যা মেঘের ইরেডেসেন্সের কারণে হয়।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার জাঙ্গালের আকাশে দেখা গিয়েছিল এমনই এক বিরল দৃশ্য। গত ১ মে নীল আকাশের বুকে ভেসে থাকা একটি মেঘ হঠাৎ যেন রঙের ক্যানভাসে পরিণত হয়। গোলাপি, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজসহ রংধনুর নানা রঙে ঝলমল করছিল মেঘটি। দৃশ্যটি দেখে স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময় ও আনন্দ। মুহূর্তেই সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ একে ‘জাদুকরি’ দৃশ্য বলেছেন, আবার কারও কাছে এতটাই অবিশ্বাস্য লেগেছে যে কৃত্রিম ছবি বলেও মনে হয়েছে। অথচ এটি পুরোপুরিই স্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা।

গোলাপি, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজসহ রংধনুর নানা রঙে ঝলমল করছে মেঘ
গোলাপি, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজসহ রংধনুর নানা রঙে ঝলমল করছে মেঘ
এটি আলো, মেঘ আর প্রকৃতির নিজস্ব খেলা
এটি আলো, মেঘ আর প্রকৃতির নিজস্ব খেলা

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার আকাশেও এমন অপরূপ মেঘের দেখা মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন ভিত্তিহীন কৃত্রিম কনটেন্টের ছড়াছড়ি, তখন প্রকৃতির তৈরি এমন দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই মানুষের নজর কাড়ে। কারণ, ইরেডেসেন্ট ক্লাউড এমন এক সৌন্দর্য, যার কোনো কারিগরি নির্মাণ নেই, কোনো সাজানো পটভূমি নেই, আছে শুধু আলো, মেঘ আর প্রকৃতির নিজস্ব খেলা।

বিজ্ঞাপন

মেঘে এমন অদ্ভুত সুন্দর রং আসে কীভাবে?

বিষয়টি আসলে আলোর সঙ্গে মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণার এক সুন্দর সম্পর্কের ফল। সূর্যের আলো দেখতে সাদা হলেও এর মধ্যে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো রয়েছে। সূর্যের আলো যখন মেঘের খুব ছোট এবং প্রায় একই আকারের জলকণা বা বরফকণার স্তরের মধ্য দিয়ে যায়, তখন আলো ছড়িয়ে পড়ে এবং একে অন্যের ওপর পড়ে। এর ফলে মেঘের গায়ে দেখা দিতে পারে নানা রঙের কোমল আভা।

বিষয়টি আসলে আলোর সঙ্গে মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণার এক সুন্দর সম্পর্কের ফল
বিষয়টি আসলে আলোর সঙ্গে মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণার এক সুন্দর সম্পর্কের ফল
আলো এমনভাবে বিচ্ছুরিত হয় যে মেঘের গায়ে তৈরি হয় রঙিন আভা
আলো এমনভাবে বিচ্ছুরিত হয় যে মেঘের গায়ে তৈরি হয় রঙিন আভা

অনেকটা তেলের ওপর পানির পাতলা স্তরে যে রঙিন ঝিলিক দেখা যায়, ইরেডেসেন্ট ক্লাউডের রঙের সঙ্গে তার কিছুটা মিল রয়েছে। সাধারণত পাতলা মেঘের আশপাশে এই দৃশ্য বেশি দেখা যায়। সূর্য যখন মেঘের পেছনে বা কাছাকাছি অবস্থানে থাকে এবং মেঘের কণাগুলোর আকার তুলনামূলকভাবে সমান হয়, তখন আলো এমনভাবে বিচ্ছুরিত হতে পারে যে মেঘের গায়ে তৈরি হয় রঙিন আভা।

রংধনু নয়, তবু রংধনুর মতো

দেখতে কাছাকাছি মনে হলেও ইরেডেসেন্ট ক্লাউড আর রংধনু এক ধরনের ঘটনা নয়। রংধনু সাধারণত বৃষ্টির জলকণার মধ্য দিয়ে সূর্যের আলোর প্রতিসরণ, অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ও বিচ্ছুরণের মাধ্যমে তৈরি হয়। অন্যদিকে মেঘের ইরেডেসেন্স মূলত মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণার কারণে আলোর ওভারল্যাপিংয়ের ফল।
রংধনুর রং সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধনুকের আকৃতিতে দেখা যায়। ইরিডিসেন্ট ক্লাউডে রংগুলো অনেক বেশি কোমল এবং অনিয়মিতভাবে মেঘের গায়ে ছড়িয়ে থাকে। মেঘের একটি ছোট অংশে গোলাপি ও নীলের আভা দেখা যেতে পারে, আবার কখনো সবুজ, হলুদ ও বেগুনির মিশ্রণেও মেঘ সেজে ওঠে।

কয়েক মুহূর্তের সৌন্দর্য

ইরেডেসেন্ট ক্লাউডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক তার ক্ষণস্থায়িত্ব। এটি কোনো সাজানো দৃশ্য নয়, কখন দেখা যাবে বা কতক্ষণ থাকবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। মেঘের আকৃতি ও অবস্থান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে রংও বদলে যেতে পারে, এমনকি কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো দৃশ্যটি মিলিয়ে যেতে পারে।

ধরুন, অফিস থেকে ফেরার পথে রিকশায় বসে আছেন। হঠাৎ পাশের কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘ওই দেখুন!’ মাথা তুলে দেখলেন ধূসর মেঘের গায়ে গোলাপি আর নীলের আলো। ফোন বের করে ছবি তুলতে তুলতেই দৃশ্যটি বদলে গেল। এই ক্ষণস্থায়িত্বই সৌন্দর্যটাকে আরও গভীর করে।

আমাদের জীবনের অনেক সুন্দর মুহূর্তের মতো ইরেডেসেন্ট ক্লাউডও স্থায়ী নয়। তাকে ধরে রাখা যায় না, নিজের ইচ্ছেমতো ফিরিয়ে আনা যায় না। শুধু দেখা যায়, অনুভব করা যায়, আর কখনো একটি ছবিতে স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়া যায়।

আমাদের জীবনের অনেক সুন্দর মুহূর্তের মতো ইরেডেসেন্ট ক্লাউডও স্থায়ী নয়
আমাদের জীবনের অনেক সুন্দর মুহূর্তের মতো ইরেডেসেন্ট ক্লাউডও স্থায়ী নয়

শহরের আকাশেও দেখা মিলতে পারে

এমন দৃশ্য দেখতে শহর ছেড়ে দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অনুকূল আবহাওয়ায় শহরের আকাশেও মেঘের ইরেডেসেন্স দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে পাতলা মেঘ সূর্যের কাছাকাছি অবস্থান করলে মেঘের গায়ে এই রঙিন আভা ফুটে উঠতে পারে। তবে সূর্যের দিকে সরাসরি খালি চোখে তাকানো নিরাপদ নয়। তাই এমন দৃশ্য দেখার সময় চোখের নিরাপত্তার বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি।

আকাশের দিকে তাকানোর অভ্যাসের সঙ্গে আমাদের অনুভূতির গভীর সম্পর্ক আছে। সারা দিন একই চার দেয়ালের মধ্যে কাজ করার পর কয়েক মিনিট খোলা আকাশ দেখা মনকে কিছুটা বিরতি দিতে পারে। মেঘের চলাচল, আলোর পরিবর্তন কিংবা বিকেলের রং বদলে যাওয়া আমাদের মনোযোগকে কিছুক্ষণের জন্য দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে আনে।

ইরেডেসেন্ট ক্লাউড যেন সেই পুরোনো অভ্যাসটাকেই আবার মনে করিয়ে দেয়
ইরেডেসেন্ট ক্লাউড যেন সেই পুরোনো অভ্যাসটাকেই আবার মনে করিয়ে দেয়

ছোটবেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেঘ দেখা কত ভালো লাগত। মেঘের মধ্যে কখনো হাতি, কখনো পাহাড়, কখনো কোনো মানুষের মুখ খুঁজে পাওয়া যেত। বড় হতে হতে সেই শিশুসুলভ অভ্যাসটা হারিয়ে গেছে। অথচ আকাশ এখনো প্রতিদিন নতুন নতুন ছবি আঁকে। ইরেডেসেন্ট ক্লাউড যেন সেই পুরোনো অভ্যাসটাকেই আবার মনে করিয়ে দেয়। জীবন সব সময় বড় কোনো ঘটনার জন্য অপেক্ষা করে না। কখনো একটি সুন্দর গান, বৃষ্টির গন্ধ, জানালায় এসে পড়া বিকেলের আলো কিংবা মেঘের গায়ে হঠাৎ ফুটে ওঠা কয়েকটি রংই মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ইরেডেসেন্ট ক্লাউডের সৌন্দর্য তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক বিষয়, আলৌকিক কোনো ঘটনা নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, চারপাশের পৃথিবীকে সুন্দরভাবে দেখার জন্য সব সময় বিশেষ কোনো জায়গায় যেতে হয় না। কখনো শুধু একটু থামতে হয়, মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাতে হয়। সেই মুহূর্তে মেঘের গায়ে রং না–ও থাকতে পারে, ধূসর আকাশই দেখা যেতে পারে, তবু তাকিয়ে থাকা যায়। কারণ, আকাশ বদলাতে খুব বেশি সময় নেয় না।যাপিত জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে প্রকৃতির এমন ছোট ছোট চমকই তো মনকে বাঁচিয়ে রাখার খোরাক জোগায়।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, স্কাইব্রেরি, দ্য গার্ডিয়ান

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন