
দেবী দুর্গার আগমন মানেই অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভর প্রতিষ্ঠা আর শান্তির বার্তা। তবে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের পূজামণ্ডপে এবার দেবী যেন এসেছেন আরও একটি বার্তা নিয়ে—সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সংবাদ ও যোগাযোগের ইতিহাসের কথা বলতে। এখানে পা রাখলেই মনে হবে, আপনি প্রবেশ করেছেন খবরের এক অন্য জগতে। যে জগতের দেয়ালে দেয়ালে ছাপা অক্ষরের গল্প, সংবাদপত্রের ঘ্রাণ, হকারের সাইকেল আর মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা।

নগরের কাঠগড় মোড় এলাকার এই পূজামণ্ডপ এবার সাজানো হয়েছে ‘যুগান্তরের বার্তা বহন’ থিমে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্র দিয়ে তৈরি হয়েছে মণ্ডপের সাজসজ্জা। ডিজিটাল মাধ্যমের দ্রুতগতির সময়ে ছাপা সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও সংবাদ পরিবেশনের বিবর্তনকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছে এ আয়োজন। ব্যতিক্রমী ভাবনার টানে ভিড় করছেন নানা বয়সী দর্শনার্থীও।
মণ্ডপের প্রধান ফটক পেরোতেই চোখে পড়ে ঝুড়িভর্তি সংবাদপত্র হাতে এক হকার। পাশে কাগজ দিয়ে তৈরি সাইকেল। সাইকেলের সামনের খাঁচায় সাজানো পত্রিকা, পেছনের ক্যারিয়ারেও বাঁধা রয়েছে খবরের কাগজের বান্ডেল। দৃশ্যটি যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সময়ে, যখন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকা হাতে ছুটে চলতেন হকাররা। তাঁদের হাত ধরেই খবর পৌঁছে যেত শহর থেকে অলিগলি, এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে।

মণ্ডপের ভেতরে রয়েছে সংবাদপত্রের দোকান। সেখানে পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানি। আগ্রহী পাঠকেরা আসছেন, পত্রিকা দেখছেন, পছন্দের সংবাদ খুঁজছেন। সব মিলিয়ে মনে হয়, এটি যেন কোনো পূজামণ্ডপ নয়, বরং সংবাদপত্রের ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘর।
চারপাশের দেয়ালজুড়ে সংবাদপত্রের ব্যবহার, পুরোনো কাগজে গ্রাফিতি আর নানা চিত্রকল্প। কোথাও কবুতরের ডানায় বার্তা পাঠানোর দৃশ্য, কোথাও ঢোল বাজিয়ে খবর জানানো ঢুলি, আবার কোথাও খবর পৌঁছে দিতে ছুটে চলেছেন রানার। এক কোণে রয়েছে ছাপাখানার প্রতিকৃতি। সংবাদপত্র প্রকাশের পেছনে যে শ্রম, প্রযুক্তি ও মানুষের দীর্ঘ যাত্রা, তারই নানা অধ্যায় যেন একে একে ধরা দিয়েছে মণ্ডপের সাজে।

এই আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ দেবী দুর্গার প্রতিমা। তাঁর শাড়িও তৈরি হয়েছে কাগজ দিয়ে। সংবাদপত্রের অক্ষরে বোনা এই শাড়ি যেন প্রতীকী অর্থে ধারণ করেছে সময়ের বার্তা। দেবী এখানে কেবল অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক নন; তিনি যেন সত্য তথ্য ও শান্তির বার্তাবাহকও।
প্রতিমা নির্মাণ করেছেন সূর্য দাশ। মণ্ডপের সৃজনশৈলী ও চিত্রকল্প নির্মাণে কাজ করেছেন তন্ময় দাশ ও জুয়েল দত্ত।
চিত্রকল্পকার তন্ময় দাশের ভাষায়, যুগ বদলায়, কিন্তু মানুষের কাছে সত্য ও তথ্য পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব কমে না। বার্তা হারিয়ে গেলেও বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বাহনের ইতিহাস থেকে যায়। সেই ভাবনা থেকেই দেবী দুর্গাকে কাগজের শাড়িতে বার্তাবাহক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের সভাপতি পিকলু দেব বলেন, ‘এবারের শারদ উৎসবে “যুগান্তরের বার্তা বহন” শিরোনামে আমরা যে থিম করেছি, তাতে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য—বার্তা হারিয়ে যায়, বাহনের ইতিহাস থেকে যায়।’
মণ্ডপের বিভিন্ন স্থানে লেখা বাণীগুলোও থিমের ভাবনাকে আরও গভীর করেছে। কোথাও লেখা, ‘খবরের পথ বদলেছে, বদলেছে তার বাহন, মানুষের হাতে আজও চলে যুগান্তরের বার্তা বহন।’ অন্য একটি পঙ্ক্তি মনে করিয়ে দেয় সংবাদপত্রের জন্ম ও বিস্তারের গল্প—‘কালির অক্ষর কাগজ পেল, ছাপা হলো খবর, এক পাতাতেই ছড়িয়ে গেল কত মুহূর্তের খবর।’
একসময় খবর পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম ছিল ডাকব্যবস্থা। রানার ছুটে চলতেন দূর-দূরান্তে, ডাকঘর থেকে ডাকঘরে। তারও আগে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হতো, ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হতো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। সময়ের সঙ্গে এসেছে ছাপাখানা, সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন। আর এখন মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে সংবাদপত্রের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, খবরের মাধ্যম বদলালেও সত্য ও নির্ভুল তথ্যের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বরং তথ্যের বিপুল প্রবাহে সঠিক সংবাদ চেনার গুরুত্ব বেড়েছে আরও বেশি।
মণ্ডপ দেখতে আসা এক দর্শনার্থীও মনে করেন, এই থিম তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। সঠিক তথ্য গ্রহণ, সংবাদ যাচাই এবং সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে অনুপ্রাণিত করতে পারে এমন আয়োজন।
পতেঙ্গা শ্যামা সংঘের এই পূজামণ্ডপ তাই শুধু উৎসবের সৌন্দর্য প্রদর্শনের জায়গা নয়। এটি একই সঙ্গে সংবাদ ও যোগাযোগের ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ছাপা অক্ষরের প্রতি ভালোবাসা এবং নীরবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া বার্তাবাহকদের স্মরণ করার প্রয়াস।

আজ যখন একটি খবরের জন্য আর হকারের অপেক্ষায় থাকতে হয় না, যখন হাতের মুঠোয় থাকা পর্দায় মুহূর্তেই ভেসে ওঠে দেশ-বিদেশের সংবাদ, তখন এই মণ্ডপ মনে করিয়ে দেয়—খবরের পথ বদলেছে, বাহন বদলেছে, বদলেছে মানুষের অভ্যাসও। কিন্তু সত্য জানার আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। আর সেই সত্য ও শান্তির বার্তাই যেন এবারের দুর্গোৎসবে নতুন করে পৌঁছে দিচ্ছেন দেবী দুর্গা।
ছবি: লেখক