
ফ্লোরিডার সমুদ্রতীরবর্তী বাড়ি, ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি আর ইয়টে ভেসে বেড়ানোর অবকাশ—জ্যারেড কুশনার ও ইভাঙ্কা ট্রাম্পের জীবনযাপনের ছবিটা অনেকটা আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনের পাতার মতো।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা কুশনার একাধারে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং ট্রাম্পের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তাঁর স্ত্রী ইভাঙ্কাও একসময়ের ফ্যাশন ব্যবসা ও লাইফস্টাইল জগতের পরিচিত মুখ।
২০২৬ সালের আগস্টে ইতালির সিসিলি দ্বীপের তাওরমিনায় ছুটি কাটাতে দেখা যায় এই দম্পতিকে। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁরা ইয়টে করে সেখানে পৌঁছান। ইভাঙ্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের অবকাশযাপনের ছবি প্রকাশ করেন। সমুদ্রভ্রমণ, ঐতিহাসিক শহরের রাস্তায় হাঁটা আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর যে ছবি আমরা দেখি তাতে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে বিলাসিতা সম্পর্ক ষ্পষ্ট হয়।

কুশনার ও ইভাঙ্কার জীবনযাপনের সবচেয়ে আলোচিত ঠিকানাগুলোর একটি ফ্লোরিডার ইন্ডিয়ান ক্রিক দ্বীপ। ‘বিলিয়নিয়ার্স বাঙ্কার’ নামে পরিচিত এই সুরক্ষিত আবাসিক এলাকায় তাঁদের বাড়ি আছে। ২০২০ সালে বাড়িটি কেনার সময় এর দাম ছিল প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০২৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের অনুমান, এর মূল্য অন্তত ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার; যদিও এটি বাজারমূল্যের হিসাব, বিক্রয়মূল্য নয়; বন্ধকসহ অন্যান্য দায়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

ইন্ডিয়ান ক্রিকের বিশেষত্ব শুধু বাড়ির আকার বা দাম নয়। নিরাপত্তাবেষ্টিত প্রবেশপথ, ব্যক্তিগত পরিসর, গলফ ক্লাব এবং আশপাশে ধনকুবেরদের বসবাস—সব মিলিয়ে এটি এমন এক আবাসিক জগৎ, যেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও বিলাসের অংশ। কুশনার ও ইভাঙ্কা দ্বীপটির অভিজাত ইন্ডিয়ান ক্রিক কান্ট্রি ক্লাবের সদস্যপদ পেয়েছেন বলে ২০২৬ সালের অক্টোবরে একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায় পেজ সিক্স। এই ক্লাবের সদস্য হওয়া অবশ্য সহজ নয়; সেখানে সামাজিক যোগাযোগ ও পরিচিতিও গুরুত্বপূর্ণ।

ইভাঙ্কার ফ্যাশনজগতের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তাঁর নিজস্ব পোশাক, জুতা ও গয়নার ব্র্যান্ড ছিল, যা ২০১৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তাঁর বর্তমান পরিচয়কে শুধু একজন ফ্যাশন উদ্যোক্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তিনি এখন মূলত জনপরিসরে পরিচিত একজন ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে।

কুশনারের ব্যক্তিগত স্টাইল তুলনামূলকভাবে সংযত—সাধারণত স্যুট, শার্ট এবং আনুষ্ঠানিক পোশাকেই তাঁকে দেখা যায়। তবে তাঁদের বর্তমান গাড়ির সংখ্যা, সব গাড়ির ব্র্যান্ড কিংবা ব্যক্তিগত বিমানের মালিকানা নিয়ে নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ্যে নেই। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি বা পুরোনো প্রতিবেদন থেকে অনুমান করে গাড়ির সংখ্যা কিংবা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের তালিকা তৈরি করা ঠিক হবে না।

কুশনারের সম্পদের ভিত্তি পারিবারিক রিয়েল এস্টেট ব্যবসা কুশনার অ্যান্ড কোম্পানিজের সঙ্গে যুক্ত। পরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি পার্টনার্স। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ ১০০ কোটি ডলারের সামান্য বেশি বলে অনুমান করে। একই প্রতিবেদনে তাঁর ফ্লোরিডার বাড়ি, পারিবারিক ব্যবসায় মালিকানার অংশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের বিষয়ও উঠে আসে।

এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের সংগৃহীত অর্থ, তার ব্যবস্থাপনাধীন সম্পদ এবং প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত সম্পদ এক বিষয় নয়। কুশনারের সম্পদ বোঝার জন্য তাঁর রিয়েল এস্টেট, বিনিয়োগ এবং ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব আলাদা করে দেখতে হয়।

এই বিলাসী জীবনযাপনের বর্ণনার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভ্যানিটি ফেয়ারের ২২ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন। সাংবাদিক ম্যাথু কোলের আসন্ন বই প্রিন্সেস অ্যান্ড থিভস থেকে নেওয়া লেখাটিতে কুশনারের ফোনে ডাচ গোয়েন্দাদের প্রবেশাধিকার এবং মধ্যপ্রাচ্য-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের একটি অ্যাকাউন্টে কুশনারের লেনদেনের অনুমতি থাকার দাবি করা হয়েছে। আরও প্রায় ১০০ কোটি ডলার অন্য একটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের কথাও এসেছে। তবে ওই অর্থ কুশনারের ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল, কিংবা তা তাঁর বাড়ি, গাড়ি বা অবকাশযাপনে ব্যয় হয়েছে—এমন প্রমাণ প্রতিবেদনটি দেয় না। কুশনার ও তাঁর আইনজীবীরা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
কুশনারের জীবন তাই একদিকে বিলাসবহুল বাড়ি, ইয়ট ভ্রমণ, অভিজাত সামাজিক পরিসর এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের গল্প। অন্যদিকে, তাঁর ব্যবসা ও রাজনৈতিক যোগাযোগের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্নও সামনে এসেছে। তাঁর জীবনযাপনের দৃশ্যমান চাকচিক্য এক বিষয়, আর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উত্থাপিত অর্থের উৎস ও গন্তব্য আরেক বিষয়। এই দুইয়ের মধ্যে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য ও নথি।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম