
ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল। নামটি জড়িয়ে আছে আলোচিত এপস্টেইন ফাইলসের মূল চরিত্র জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে। তিনি শুধু এপস্টেইনের সকল কুকর্মের সহযোগীই ছিলেন না, বরং ঘিসলাইনকে বলা যায় এপস্টেইন নেটওয়ার্কের মূল চরিত্র। একদিকে তিনি ছিলেন ধনী ও প্রভাবশালী সমাজের পরিচিত মুখ। বহু নেতা, বিখ্যাত ব্যক্তি ও তারকার সঙ্গে তাঁর ছিল সখ্য। এপস্টেইন ফাইলসে প্রকাশিত বিভিন্ন ইমেইল ও ছবি তার প্রমাণ। একজন নারী হয়ে কীভাবে বিশ্বের এত এত কন্যাশিশু আর কিশোরীর সঙ্গে এমন নৃশংসতার মূল বাস্তবায়ক হয়ে উঠলেন তিনি, সেটিই অবাক করে সবাইকে।

তাঁর জীবনের অন্ধকার অধ্যায় জুড়ে আছে শিশু পাচার, যৌন নির্যাতন ও জঘন্যতম অপরাধ জগত। তাঁর বিরুদ্ধে এক সাহসী ভিক্টিমের মামলার সূত্র ধরেই এপস্টেইনকে ধরা হয়। আর ঘিসলাইনও প্রমাণিত সেক্স ট্রাফিক অফেন্ডার। ২০ বছরের সাজা ভোগ করছেন এই ভয়ংকর নারী।
ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল জন্মেছিলেন ১৯৬১ সালে ফ্রান্সে, চেক-ব্রিটিশ পরিবারে। ঘিসলাইনের বাবা রবার্ট ম্যাক্সওয়েল ব্রিটিশ মিডিয়ার সম্রাট ছিলেন। কিন্তু তিনি শুধু ব্যবসায়ীই ছিলেন না; অনেক সংবাদ সূত্রে বলা হয়, তিনি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। রবার্টের সঙ্গে বড় হওয়ায় ঘিসলাইন জড়িয়ে যান ক্ষমতা, অর্থসম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাবের দুনিয়ায়।


রবার্টের মৃত্যুও ছিল রহস্যময়। ১৯৯১ সালে তিনি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের কাছে নিজের ইয়ট থেকে পড়ে মারা যান। সরকারি রিপোর্ট এটিকে দুর্ঘটনা বললেও অনেকেই মনে করেন এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। ঘিসলাইন ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং সমাজে নিজেকে সহজেই প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। ধনী এবং প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায়, তিনি বিশ্বের অভিজাত মহলে সহজে মিশতে পারতেন. এটি পরবর্তীতে তার নেটওয়ার্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এপস্টেইনের সঙ্গে পরিচয়
নব্বই-এর দশকে ঘিসলাইনের পরিচয় হয় জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে। এপস্টেইন তখন ছিলেন ধনকুবের, আর ঘিসলাইন ছিলেন মানুষের সঙ্গে সহজে সম্পর্ক তৈরি করতে পারা এক মিশুক, সমাজমুখী নারী।

তাঁরা একসঙ্গে এমন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যেখানে এই বিকৃত মানসিকতার লোভী ও উচ্চাভিলাষী জুটি নাবালিকা মেয়েদের খুঁজে বের করে যৌন অপরাধ আর নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা আর ক্যানিবালিজমের মতো অপরাধে লিপ্ত হতেন। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ঘিসলাইন এই শিশু-কিশোরীদের বিশ্বাস অর্জন ও বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। তারপর তাদের জীবনে নেমে আসত ভয়াবহ বিপর্যয় ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।

অপরাধ ও আইনি তদন্ত
ঘিসলাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল অনেক। যেমন:
মানব পাচার: নাবালিকা মেয়েদের বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া
যৌন নির্যাতন সহযোগিতা: মেয়েদের এপস্টেইনের হাতে তুলে দেওয়া
সাজানো কাগজপত্র বানানো ও সাক্ষ্য লোপ করা
২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বিচার ২০২১-২২ সালে নিউইয়র্কে শুরু হয়। অনেক নারী সাক্ষ্য দেন, যেখানে তারা ঘিসলাইনের সরাসরি ভূমিকা তুলে ধরেন।
ঘিসলাইনের বিরুদ্ধে যত রায়
৫টি গুরুতর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত
২০ বছরের কারাদণ্ড
আজীবন যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধন

ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল এখন কোথায়
ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত ফেডারেল মেডিক্যাল সেন্টার, কার্সওয়েল-এ বন্দি আছেন। এটি একটি উচ্চ-নিরাপত্তার ফেডারেল কারাগার, যেখানে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত নারী বন্দিদের রাখা হয়।
সাজা ঘোষণা: ২০২২ সালের জুন
মোট সাজা: ২০ বছর কারাদণ্ড

আর কত বছর বাকি
২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী তিনি প্রায় ৪ বছর সাজা ভোগ করেছেন। এখনও প্রায় ১৬ বছর কারাদণ্ড বাকি।
রহস্য ও বিতর্ক
ঘিসলাইন আজও অনেক প্রশ্নের উত্তর দেননি। কী কারণে তিনি অনেক বড় নাম প্রকাশ করেননি? কারা সত্যিকারভাবে দায়ী ছিল? কারা রেহাই পেয়েছে অন্তরালে থেকে? ঘিসলাইনের নীরবতা নিয়ে অনেকে বলেন, এটি হয়তো আত্মরক্ষার কৌশল, আবার কেউ মনে করেন এটি বিশ্বের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ইশারাতেই হচ্ছে।
২০১৯ সালের আগস্টে জেফ্রি এপস্টেইনের কারাগারে মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—এত বড় অপরাধচক্রে কি তিনি একাই ছিলেন? খুব দ্রুত তদন্তকারীদের নজর পড়ে তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের দিকে। কিন্তু এপস্টেইনের মৃত্যুর ঠিক পরপরই ঘিসলাইন জনসমক্ষে আর দেখা দিচ্ছিলেন না। ফোন, সামাজিক যোগাযোগ, পরিচিত মহল—সবকিছু থেকে তিনি যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান।

এই আত্মগোপনই তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে। মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটররা তখন তার বিরুদ্ধে নাবালিকা মানব পাচার ও যৌন নির্যাতনে সহায়তার অভিযোগ প্রস্তুত করছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত ঘিসলাইন এপস্টেইনের হয়ে নাবালিকা মেয়েদের খুঁজে বের করতেন, তাদের বিশ্বাস অর্জন করতেন এবং পরে এপস্টেইনের হাতে তুলে দিতেন। এপস্টেইনের মৃত্যু তদন্তকে থামায়নি; বরং ঘিসলাইন হয়ে ওঠেন মামলার কেন্দ্রীয় চরিত্র।
২০১৯ থেকে ২০২০—এই সময়টুকুতে ঘিসলাইন কার্যত পলাতক জীবন কাটান। তিনি বিভিন্ন নামে কোম্পানি ও ট্রাস্ট ব্যবহার করতেন, যোগাযোগ সীমিত রাখতেন এবং এমন জায়গায় থাকতেন, যেখানে সহজে নজরে পড়া যায় না। এফবিআই তার আর্থিক লেনদেন, সম্পত্তির নথি এবং পরিচিত ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। ধীরে ধীরে তারা নিশ্চিত হয়, ঘিসলাইন নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের একটি নিরিবিলি এলাকায় আত্মগোপন করে আছেন।

অবশেষে ২০২০ সালের ২ জুলাই ভোরবেলা নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরের একটি বিলাসবহুল বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। বাড়িটি ছিল নির্জন, নিরাপত্তাবেষ্টিত ও বিলাসবহুল;যেন আত্মগোপনের জন্যই তৈরি। কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই সেখান থেকে ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি পালানোর চেষ্টা করেননি, প্রতিরোধও দেখাননি। তদন্তকারীদের ভাষায়, তিনি জানতেন ধরা পড়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।
গ্রেপ্তারের পর নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগের তালিকায় ছিল নাবালিকা মানব পাচারের ষড়যন্ত্র, যৌন নির্যাতনে সহায়তা এবং ভুক্তভোগীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা। গিসালিন একাধিকবার জামিনের আবেদন করলেও আদালত তা নাকচ করে দেয়। বিচারকের মতে, তার বিপুল অর্থ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থাকায় পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল অত্যন্ত বেশি।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া। ২০২১ সালে আদালতে একের পর এক নারী সাক্ষ্য দেন। তাদের শৈশবের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও ঘিসলাইনের সরাসরি ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। এই সাক্ষ্যগুলোই শেষ পর্যন্ত মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০২২ সালের জুনে আদালত ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।


একসময় ঘিসলাইন ছিলেন সমাজের বিলাসবহুল পার্টি ও আন্তর্জাতিক অভিজাত মহলের পরিচিত মুখ। আজ তিনি এক ফেডারেল কারাগারের বন্দি, এবং তাঁর গল্প হয়ে গেছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারহীনতার প্রতীক। তাঁর জীবন যেন এক প্রাচীন থ্রিলার গল্প, যেখানে ধনসম্পদ, প্রভাব, বিপদ ও অন্ধকার জগত মিশে আছে।
সূত্র: সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, উইকিপিডিয়া
ছবি: ইন্সটাগ্রাম